মমতার তৃণমূল কি এ বার প্রতীক হারানোর পথে? ঋতব্রত না কাকলি, কার বাগানে ফুটতে পারে জোড়াফুল?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে তৃণমূলের নতুন কমিটি ঘোষণা করলেন বিদ্রোহী বিধায়ক তথা রাজ্যের স্বীকৃত বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দিকে জোড়াফুল প্রতীকের ‘দখল’ নিতে আইনি লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এনসিপিআইতে মিশে যাওয়া তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ।
বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর ভেঙে খানখান তৃণমূল কংগ্রেস। এ বার দলের ‘দখল’ নিতে বড় পদক্ষেপ করল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী গোষ্ঠী। জোড়াফুলের চেয়ারপার্সন পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই সরিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। সাসপেন্ড করা হয়েছে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এ বার কি প্রতীক কব্জা হবে তাঁদের? বাড়ছে সেই জল্পনা।
সোমবার, ২২ জুন নিউ টাউনের একটি হোটেলে বিশেষ অধিবেশনে শামিল হন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কেরা। সেখানেই দলের নতুন কমিটি ঠিক করে ফেলেন ঋতব্রতেরা। সেখানে জায়গা হয়নি প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারপার্সন মমতার। সরানো হয়েছে অভিষেককেও। সেই জায়গায় সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ঋতব্রত-সহ মোট চার জন। বাকিরা হলেন জাভেদ খান, বিপ্লব মিত্র এবং সন্দীপন সাহা।
এই ঘটনার পর কালীঘাটপন্থী তৃণমূল অবশ্য বিদ্রোহীদের ‘বেইমান’ বলতে ছাড়েনি। আট নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিস ধরিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু, এতে দলের প্রতীক হাতছাড়া হওয়া আটকানো যাবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ, নির্বাচন কমিশনকে নতুন কমিটির কথা জানানো হবে বলে ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন ঋতব্রত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, কমিশনকে নতুন কমিটির কথা জানালে জোড়াফুলের ‘দখল’ পাওয়া বিদ্রোহীদের পক্ষে খুব একটা কঠিন হবে না। আর তাই চুপ করে বসে নেই তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা। ইতিমধ্যেই ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) মিশে গিয়েছেন তাঁরা। সূত্রের খবর, তা সত্ত্বেও ঘাসফুল প্রতীকের জন্য সর্বশক্তিতে ঝাঁপাতে দেখা যাবে তাঁদের।
অতীতে ত্রিপুরার ভোটে কলমের নিব চিহ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এনসিপিআই। কিন্তু, সেই প্রতীক একেবারেই পছন্দ নয় তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের। তাই গত ১৮ জুন এই গোষ্ঠীর নেত্রী শতাব্দী রায়ের কলকাতার বাড়িতে বৈঠক করেন তাঁরা। সূত্রের খবর, জোড়াফুল কব্জা করতে আদালতের দ্বারস্থ কী ভাবে হওয়া যায়, তাই নিয়ে সেখানে হয়েছে আলোচনা।
আরও পড়ুন:
জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে ঘাসফুল প্রতীক। এর স্রষ্টা হিসাবে বরাবর নিজেকে তুলে ধরেছেন মমতা। যদিও এই নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর ঘাসফুল ছবিটি তৃণমূল সুপ্রিমোর আঁকা নয় বলে বিস্ফোরক দাবি করে বসেন সোমনাথ চৌধুরী নামের এক চিত্রশিল্পী। একসময় কংগ্রেসের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে মমতাকে বহিষ্কার করে কংগ্রেস। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের নাম আগেই নথিভুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে সেটা ছিল, পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস। পরে পাল্টে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নাম রাখেন মমতা। বিজেপির সঙ্গে জোট করে জোড়াফুল প্রতীকে সেই বছর লোকসভা ভোটে নামে তাঁর দল।
তৃণমূলের দলীয় সংবিধান অনুযায়ী, ঘাসফুল প্রতীকটির একটি বিশেষ অর্থ আছে। এর মাধ্যমে সমাজের নিচুতলা থেকে শুরু করে আমজনতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফুটিয়ে তুলেছেন মমতা। যদিও চিত্রশিল্পী সোমনাথ চৌধুরীর দাবি, প্রয়াত সাংসদ অজিত পাঁজার নির্দেশে ওই লোগো তৈরি করেন তিনি। আনুষ্ঠানিক ভাবে তখনও তৃণমূলের জন্ম হয়নি।
সোমনাথ জানিয়েছেন, কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত মমতা যে নতুন দল তৈরি করতে চলেছেন, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি। তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার দিনই তাঁর আঁকা লোগোকে নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করা হয়। এই নকশা তৈরির ষোলো আনা কৃতিত্ব দাবি করে বসেন মমতা। ফলে রাতারাতি মুছে যায় সোমনাথের নাম। এ ভাবে তাঁর শিল্পসত্তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে দেখেও ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
আরও পড়ুন:
২০০৪ সালে বিজেপির সঙ্গে জোটে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভরাডুবি হয় তৃণমূলের। মমতা নিজে ছাড়া আর কেউই ভোটে জিততে পারেননি। পরের বছর (২০০৫ সাল) কলকাতা পুরসভাও হাতছাড়া হয় তাঁর। ২০০৬ সালের ভোটে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মাত্র ৩০টি আসন জেতে জোড়াফুল শিবির। কোনও মতে বিরোধী দলের তকমা পায় তৃণমূল। তবে অটুট ছিল দল। প্রতীক নিয়েও টানাহেঁচড়া হয়নি।
২০১১ সালে কংগ্রেস এবং এসইউসিআইয়ের সঙ্গে জোট বেঁধে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে জাতীয় দল হয়ে উঠতে গোয়া, ত্রিপুরা, অসম, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ এবং কেরলে শাখা খোলেন দলনেত্রী। ফলে তাঁর দখলে আসে বেশ কয়েকটা বিধানসভা আসন। রাজ্যসভাতেও প্রতিনিধি বাড়াতে সক্ষম হয় জোড়াফুল শিবির।
কিন্তু, এই পর্বে ২০১৬ সালে কেরল বিধানসভা ভোটে ঘাসফুল প্রতীক ছাড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় মমতার সৈনিকদের। সেখানকার রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানায়, তৃণমূল কংগ্রেস স্বীকৃত জাতীয় রাজনৈতিক দল নয়। অতএব, জোড়াফুল চিহ্নে লড়তে পারবেন না তাদের কোনও প্রার্থী। ফলে অস্বস্তিতে পড়েন কেরল তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। শুধু তা-ই নয়, পড়ে যায় মনোনয়ন প্রত্যাহারের হিড়িক।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভোটের প্রচারে ঝড় তুলতে দক্ষিণী রাজ্যটির বিভিন্ন জায়গায় ফ্লেক্স-ব্যানার লাগায় তৃণমূল। সেখানে মমতার ছবির পাশে জ্বলজ্বল করছিল ঘাসফুল প্রতীক। সেই চিহ্নে নির্বাচন লড়া যাবে না বুঝতে পেরে কোচিতে দ্রুত রাজ্য কমিটির বৈঠক ডাকেন কেরল তৃণমূলের সভাপতি মনোজ শঙ্করানেল্লুর। তাতে ফুলকপির ছবিতে জোড়াফুল প্রতীক ঢেকে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি ও বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত শিবসেনার জোট। কিন্তু, ভোটের পর মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে শুরু হয় কোন্দল। আচমকা সবাইকে চমকে দিয়ে এনসিপির অজিত পাওয়ারের সমর্থনে সরকার গঠন করে পদ্ম শিবির। মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির দেবেন্দ্র ফডণবীস। এর জেরে বিজেপির সঙ্গে ২৫ বছরের জোট ভেঙে দেয় ‘ক্ষুব্ধ’ শিবসেনা।
জোট ভাঙতেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শুরু হয় মহানাটক। এর পর সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড় করতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মহাবিকাশ আঘাড়িতে যোগ দেয় শিবসেনা। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কুর্সি হারান ফডণবীস। অন্য দিকে অজিতকেও ঘরে ফেরান তাঁর কাকা তথা এনসিপি প্রধান শরদ পাওয়ার। এ ভাবে ঘর গুছিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেন বালাসাহেব পুত্র উদ্ধব ঠাকরে।
কিন্তু, ক্ষমতা পেলেও মতাদর্শগত কারণে শিবসেনার অন্দরে বাড়তে থাকে ফাটল। উদ্ধবের এ ভাবে মহাবিকাশ আঘাড়িতে চলে যাওয়া একেবারেই মেনে নিতে পারেননি একনাথ শিন্ডে। শুধু তা-ই নয়, এই সিদ্ধান্তের জেরে বালাসাহেবের ‘হিন্দুত্ববাদী’ আদর্শের বিচ্যুতি ঘটছে বলেও সোচ্চার হন তিনি। ২০২২ সালে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন নিয়ে শিবসেনা ভেঙে বেরিয়ে আসেন শিন্ডে। তাঁর সমর্থন পায় পুরনো ‘বন্ধু’ বিজেপি।
২০২২ সালে একনাথকেই মুখ্যমন্ত্রী করে পদ্ম শিবির। এর পর তাঁরাই আসল শিবসেনা বলে দাবি করে বসেন শিন্ডে। তাঁকেই ‘তির ও ধনুক’ দলীয় প্রতীকটি বরাদ্দ করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন উদ্ধব। যদিও তাতে কোনও লাভ হয়নি। কমিশনের সিদ্ধান্তকেই স্বীকৃতি দেয় দেশের শীর্ষ আদালত।
এর ঠিক পরের বছর একই কাণ্ড ঘটান অজিত পাওয়ার। ফের এনসিপি ভেঙে বেরিয়ে যান তিনি। গোড়া থেকেই দলের বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছিলেন তিনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন থাকায় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের থেকে দলীয় প্রতীক ‘ঘড়ি’ আদায় করে নিতে তাঁর বিশেষ সমস্যা হয়নি। শিন্ডে সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ পান বর্ষীয়ান শরদের ভ্রাতুষ্পুত্র।
২০২৪ সালের জোটে লড়ে মহারাষ্ট্র বিধানসভার ২৮৮-র মধ্যে ২৩৫ আসন জেতে বিজেপি, শিন্ডে-সেনা ও এনসিপি-অজিত। ফের মুখ্যমন্ত্রী হন দেবেন্দ্র ফডণবীস। ওই নির্বাচনে জ্বলন্ত মশাল প্রতীক বেছে নেয় শিবসেনার উদ্ধব গোষ্ঠী। অন্য দিকে শিঙা বাজানোর ব্যক্তি চিহ্নে লড়েন শরদ পাওয়ার সমর্থিত এনসিপির নেতা-নেত্রীরা। দু’টি দলেরই ভরাডুবি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, শিবসেনা বা এনসিপির সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের একটা জায়গায় ফারাক রয়েছে। মরাঠাভূমিতে বিদ্রোহীরা একটা জায়গায় জোটবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু, ঘাসফুলের ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের দু’টি গোষ্ঠী রয়েছে। একটি হল বিধানসভার ঋতব্রতদের তৃণমূল। অপরটি শতাব্দী রায় ও কাকলি ঘোষদস্তিদারের নেতৃত্বাধীন এনসিপিআই।
এই পরিস্থিতিতে দলের নতুন কর্মসমিতির তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠিয়েছেন মমতাও। সেখানে নিজেকে চেয়ারপার্সন বলে দাবি করেছেন তিনি। কালীঘাট তৃণমূল সূত্রে খবর, দলের রাশ যে তাঁর হাতেই রয়েছে সেটা প্রমাণ করতেই এই পদক্ষেপ করছেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। মমতার এই পদক্ষেপকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নতুন তৃণমূলের ‘কান্ডারি’ ঋতব্রত বলেন, “এই বিষয়ে কোনও বক্তব্য নেই। ওঁদের ভাল হোক।”
এই পরিস্থিতিতে কমিশন ঘাসফুল প্রতীকের জন্য কোনও একটি গোষ্ঠীকে বেছে নিলেই মামলা যে আদালত পর্যন্ত গড়াবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, মমতা বা অভিষেকের পক্ষে জোড়াফুলের দখল রাখা কঠিন। কারণ, বিদ্রোহী হয়েছে দুই তৃতীয়াংশ সাংসদ ও বিধায়ক। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার।