Advertisement
E-Paper

শহরে কেনা যাবে না বাড়ি, নেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সুবিধা, বিশাল অট্টালিকার পাশে হতদরিদ্র বস্তি! চিনে বিতর্কের কেন্দ্রে ‘হুকোউ’ ব্যবস্থা

কমিউনিস্টশাসিত চিনে চালু রয়েছে ‘হুকোউ’ নামের একটি ব্যবস্থা। একে বর্ণ বা জাতি ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করে সমাজমাধ্যমে দেদার ট্রোলিং চালাচ্ছেন ভারতীয় নেটাগরিকদের একাংশ। সত্যিই কি ড্রাগনভূমিতে চালু আছে জাতিভেদের কুপ্রথা?

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ০৭:২৭
Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০১ / ২০

২১ শতকে কমিউনিস্টশাসিত চিনে নাকি দিব্যি চলছে বর্ণপ্রথা! এই নিয়ে সমাজমাধ্যমে ঝড় তুলেছেন ভারতীয় নেটাগরিকদের একাংশ। বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসে বেজিং। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাদের সরকারি গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস। সেখানে ইচ্ছাকৃত ভাবে ড্রাগনভূমির ছবি কালিমালিপ্ত করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০২ / ২০

কমিউনিস্টশাসিত চিনে দীর্ঘ দিন ধরেই চালু আছে ‘হুকোউ’ নামের একটি ব্যবস্থা। একে বর্ণপ্রথা বলে উল্লেখ করে বেজিংকে নিয়ে ট্রোলিং চালিয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। তাঁদের দাবি, এর মাধ্যমে সমাজে আর্থিক বিভাজন জিইয়ে রেখেছে ড্রাগনভূমির সরকার। ফলে বেজিং বা সাংহাইয়ের মতো ঝাঁ চকচকে শহরগুলিতে থাকতেই পারেন না সেখানকার অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৩ / ২০

কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না বা সিপিসির তৈরি করা এ-হেন ‘হুকোউ’কে বর্ণ ব্যবস্থা বলা যাবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে একমত তাঁরা। সেটা হল, প্রাচীন কালে মান্দারিনভাষীদের সমাজে চালু ছিল বর্ণপ্রথা। সেখানে চারটি স্তরবিন্যাসের প্রমাণ পেয়েছেন ইতিহাসবিদেরা।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৪ / ২০

প্রাচীন চিনের বর্ণপ্রথার ওই চারটি স্তর হল শি, নং, গং, শাং। মূলত পেশার উপর ভিত্তি করে ড্রাগনভূমিতে এই সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে। একেবারে উপরের স্তরে ছিলেন শি-রা। এটিকে শিক্ষিত এবং সমাজের জ্ঞানীগুণী শ্রেণি বলা যেতে পারে। অন্য বর্ণের কাউকে সাধারণ ভাবে বিয়েও করতেন না তাঁরা।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৫ / ২০

নং ছিল প্রাচীন চিনের কৃষক সমাজ। গংদের কারিগর ও শিল্প শ্রমিক বলা যেতে পারে। আর সমাজের একেবারে শেষ স্তরে শাং বা ব্যবসায়ী শ্রেণিকে রাখা হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের দাবি, ঝাউ রাজবংশের শেষের দিকে ড্রাগনভূমিতে চালু হয় এই বর্ণ ব্যবস্থা। পরবর্তী কালে হান রাজবংশের ইতিহাস লেখক বান গু তাঁর ‘বুক অফ হান’-এ বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর লেখা বই প্রকাশের সময়কাল ছিল ১১১ খ্রিস্টাব্দ।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৬ / ২০

প্রাচীন চিনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কনফুসিয়াসের মতাদর্শ। ইতিহাসবিদদের দাবি, তার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে এই বর্ণ ব্যবস্থা। সেখানে শি-রা জ্ঞানীগুণী হওয়ায় তাঁদের শাসনের রক্ষক হিসাবে দেখা হত। অন্য দিকে সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কৃষিকাজ ছিল অপরিহার্য। সেই কারণে নংদের দ্বিতীয় স্থান দেওয়া হয়েছিল।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৭ / ২০

সমাজের তৃতীয় স্থানে থাকা গংরা ছিলেন দক্ষ শ্রমিক। বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সরঞ্জাম তৈরি করতেন তাঁরা। চতুর্থ স্থানে থাকা শাং বা বণিকরা বিত্তবান হলেও সমাজে তাঁদের উচ্চ স্থান দেওয়া হয়নি। কারণ, কনফুসিয়ান মতাদর্শে অতিরিক্ত মুনাফাকে সন্দেহের চোখে দেখা হত।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৮ / ২০

তবে চিনা ইতিহাসবিদদের বড় অংশই প্রাচীন সমাজের শি-নং-গং-শাংকে কঠোর বর্ণ ব্যবস্থা হিসাবে দেখতে নারাজ। তাঁদের দাবি, এটা কখনওই বংশানুক্রমিক ছিল না। বরং পেশা ও আদর্শগত জায়গা থেকে এই সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করা হয়েছিল। আর তাই ওই সময় একজন বণিক-পুত্র উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রশাসনিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনায়াসেই রাজকাজে যোগ দিতে পারতেন।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
০৯ / ২০

এই ব্যবস্থার একেবারে নীচের শ্রেণিতে থাকা শাংদের সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির এটা ছিল সবচেয়ে সহজ উপায়। ফলে পড়াশোনায় জোর দিতেন তাঁরা। আর তাই অনেকেই এর সঙ্গে ভারতীয় বর্ণ ব্যবস্থার মিল খুঁজে পেয়েছেন। প্রাচীন যুগে এ দেশেও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস একেবারেই বংশানুক্রমিক ছিল না। ড্রাগনভূমির মতো সেখানেও চারটি স্তরভেদের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১০ / ২০

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫) পর জাপানি শাসন থেকে মুক্তি পায় চিন। ড্রাগনভূমিতে একটি একদলীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে সিপিসি। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ‘হুকোউ’ ব্যবস্থাটি চালু করে তারা। এটি একটি বংশানুক্রমিক ব্যবস্থা। যেখানে গ্রাম ও শহরের বাসিন্দাদের আলাদা ভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১১ / ২০

‘হুকোউ’কে চিনের অভ্যন্তরস্থ একটি পাসপোর্ট পরিষেবা বলা যেতে পারে। গ্রামের বাসিন্দারা শহরে এসে বাস করুক, তা একেবারেই চায় না সিপিসি। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাটিকে চালু রেখেছে তারা। এর মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও সরকারি পরিষেবার কে কতটা পাবেন সেটাও নির্ধারিত হয়ে থাকে।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১২ / ২০

ইতিহাসবিদ অরবিন্দন নীলাকান্দন তাঁর ‘ভারতীয় সমাজের ধর্মীয় ইতিহাস’ বইয়ে ‘হুকোউ’ ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের তৈরি বর্ণ প্রথা বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই চিনে যে কোনও ব্যক্তি যে কোনও জায়গায় বাড়ি কিনতে বা তৈরি করতে পারতেন না। ক্ষমতা হাতে পেয়ে সেটাকেই আরও কঠোর ভাবে প্রয়োগ করেন সিপিসির কিংবদন্তি চেয়ারম্যান মাও জে দং।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৩ / ২০

নিজের বইয়ে নীলাকান্দন লিখেছেন, ‘‘চিনে গ্রাম ও শহরের মধ্যে মারাত্মক আর্থিক বৈষম্য রয়েছে। সেই পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার বদলে মাও তাতে প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর দিয়ে দেন। ১৯৫৯ সাল থেকে ‘হুকোউ’ বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠে। তবে শিল্পায়নে এটা বেজিংকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল।’’

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৪ / ২০

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষণাভিত্তিক পত্রিকা ‘ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরেই গ্রামীণ হুকোউদের বিপজ্জনক শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করাচ্ছে চিন। তাঁদের বেতন কাঠামো খুবই কম। শহরের কারখানায় কাজ করলেও সেখানে পাকাপাকি ভাবে থাকতে পারেন না তাঁরা। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য নাগরিক সুবিধার জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে গ্রামে ফিরে যেতে হয় তাঁদের।’’

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৫ / ২০

‘ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার’ জানিয়েছে, এই ব্যবস্থায় শহরের জমির উপর চাপ অনেকটাই কমাতে সক্ষম হয়েছে চিন। পাশাপাশি, দু’টি আর্থিক এলাকায় দেশকে বিভক্ত করে রাখতে পারছে মান্দারিনভাষীদের সরকার। এর এক দিকে আছে বেজিং ও সাংহাইয়ের মতো ঝাঁ চকচকে শহর। অপর দিকে হতদরিদ্র গ্রাম, যার ছবি কখনওই প্রকাশ্যে আনে না ড্রাগন।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৬ / ২০

পশ্চিমি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই ব্যবস্থায় শহুরে উচ্চবিত্ত শিল্পপতিদের খুশি করার একটা চেষ্টা রয়েছে। কারণ, সিপিসি জানে তাঁদের উপর ভিত্তি করেই এগোবে দেশের অর্থনীতি। পাশাপাশি, উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে কম মজুরিতে যে বিপুল শ্রমিকের প্রয়োজন সেটাও মেটাতে পারছে এই ‘হুকোউ’ ব্যবস্থা। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সংস্থাগুলি একাধিক কারখানা তৈরি করেছে সেখানে।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৭ / ২০

বেজিঙের এই ‘হুকোউ’ প্রথার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন চিনের শেনঝেন প্রদেশের চাইনিজ় ইউনিভার্সসিটি অফ হংকংয়ের অধ্যাপক ও ডিন। নিজের গবেষণাপত্রে একে নগরভিত্তিক বর্ণ ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ডিনের দাবি, বিষয়টা সোভিয়েত ইউনিয়নের সামাজিক কাঠামো থেকে অনুপ্রাণিত। তবে ড্রাগনভূমির সামাজিক কাঠামোর কথা মাথায় রেখে সেটা সাজিয়ে তোলেন চেয়ারম্যান মাও।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৮ / ২০

তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিনা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ঝাং ইইউ-র কথায়, ‘প্রাচীন যুগের শি-নং-গং-শাং এবং বর্তমানের হুকোউকে এক শ্রেণিতে রাখা হাস্যকর। প্রথমটার ভিত্তি হল পেশাগত দক্ষতা। সেই ভাবেই আমাদের সমাজ গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়টা একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এর সঙ্গে জাতিভেদ প্রথা বা বর্ণব্যবস্থার কোনও মিল নেই।’’

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
১৯ / ২০

উল্লেখ্য, চিনা সরকারি গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস এ ব্যাপারে ভারতের জাতিভেদ প্রথাকে নিশানা করেছে। ঔপনিবেশিক আমলে যে সামাজিক কাঠামো তৈরি করেন মূলত ইংরেজ শাসকেরা। কারণ পেশাগত দক্ষতাকে বর্ণ ব্যবস্থা বলেই মনে করতেন তাঁরা। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি।

Does China have a caste system like India, what is Hukou in Beijing’s society
২০ / ২০

ল্যাটিন কাস্টাস থেকে এসেছে ইংরেজি কাস্ট বা জাতি শব্দটি। পশ্চিমি দুনিয়ায় এর সঙ্গে বংশকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন ভারত বা চিনে সেটা কখনওই ছিল না। তবে জাতি বা বর্ণ ব্যবস্থা না হলেও ‘হুকোউ’কে ঘিরে যে ভাবে বিতর্ক দানা বাঁধছে তাতে আন্তর্জাতিক মহলে বেজিঙের অস্বস্তি বাড়াবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

সব ছবি: সংগৃহীত।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও গ্যালারি

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy