মাঝ-আকাশেই ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস, রণতরীর সলিলসমাধি, দুর্ধর্ষ জোড়া হাতিয়ারে পেশি প্রদর্শন ভারতের!
শত্রুর ছোড়া আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ-আকাশে ধ্বংস করার ইন্টারসেপ্টার এ বার পেতে চলেছে ভারতীয় ফৌজ। সেই হাতিয়ারের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে সামরিক গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও।
লাগাতার সামরিক খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়িয়ে চলেছে পাকিস্তান। অন্য দিকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি (লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) ও বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে চিন। এই পরিস্থিতিতে সবাইকে চমকে দিয়ে জোড়া শত্রুর মোকাবিলায় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী হাতিয়ারের সফল পরীক্ষা চালাল ভারত। এই প্রযুক্তি বর্তমানে রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটা দেশের কাছে।
চলতি বছরের ১০ ও ১২ জুন তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় এ দেশের সামরিক গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন (ডিআরডিও)। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, তিনটি হাতিয়ারের ক্ষেত্রেই ১০০ শতাংশ সাফল্য পাওয়া গিয়েছে। তবে সেগুলির সাঙ্কেতিক নাম প্রকাশ করা হয়নি। এতে আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) এবং রণতরী ধ্বংসের সক্ষমতা যে ভারতের বাড়ল, তা বলাই বাহুল্য।
দীর্ঘ দিন ধরেই একটি বহুস্তরীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছিল নয়াদিল্লি। ১০ ও ১২ জুনের পরীক্ষায় সেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করে ডিআরডিও। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলি নিখুঁত নিশানায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। এগুলি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকেও আটকে দিতে পারবে। তবে ইন্টারসেপ্টরের পাল্লা প্রকাশ করা হয়নি।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা ইরান যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই হাতিয়ার ব্যবহার করেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরিন, ইরাক ও সৌদি আরবের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে তেহরান। পাশাপাশি, ইজ়রায়েলের বন্দর শহর হাইফা বা বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে উড়িয়ে দিতেও এই ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ করতে দেখা গিয়েছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজকে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করতে পারেনি কোনও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে যুদ্ধের গতি। তেহরানের প্রতি আক্রমণের ঝাঁজে ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য হয় আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। পশ্চিম এশিয়ার ওই লড়াইয়ের দিকে কড়া নজর ছিল ভারতের। ফলে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ঢাল তৈরির গবেষণায় গতি বৃদ্ধি করে ডিআরডিও।
আরও পড়ুন:
পাকিস্তানের হাতে না থাকলেও চিনা লালফৌজের কাছে রয়েছে বিপুল সংখ্যায় আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। আর তাই সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, বেজিঙের পিপল্স লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) রকেট ফোর্সের কথা মাথায় রেখে এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি তৈরি করেছে ডিআরডিও। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনায়াসেই কৌশলগত এলাকাগুলিকে রক্ষা করতে পারবে ফৌজ।
ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোটের উপর বেশ শক্তিশালী। গত বছরের (২০২৫) মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে চলা চার দিনের যুদ্ধে জাত চিনিয়েছে তারা। গোড়া থেকেই একাধিক স্তরে এয়ার ডিফেন্স গড়ে তোলার উপর জোর দিয়ে এসেছে নয়াদিল্লি। ইসলামাবাদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় সেটা কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় দুনিয়া জুড়ে হইচই পড়ে যায়। এই ব্যবস্থায় দেশি-বিদেশি দু’ধরনের হাতিয়ারই রয়েছে।
গত বছর পাকিস্তানে চালানো সামরিক অভিযানের নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখে ভারত। তাতে ইসলামাবাদ বিমানবাহিনীর ১১টি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় এ দেশের বিমানবাহিনী। ওই সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে খবরের শিরোনামে উঠে আসে নয়াদিল্লির রুশ এয়ার ডিফেন্স এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ। আদর করে এর নাম ‘সুদর্শন চক্র’ রেখেছে এ দেশের ফৌজ। আগামী দিনে ডিআরডিওর নতুন ইন্টারসেপ্টরগুলি এর সঙ্গেই কাজ করবে বলে জানা গিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, সব ধরনের পরিবেশে কাজ করতে পারে মস্কোর এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ। অর্থাৎ মরুভূমির প্রবল গরম এবং হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় সমান ভাবে কার্যকর এই হাতিয়ার। এস-৪০০র রেডারের পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার। অন্য দিকে স্টেলথ যুদ্ধবিমান, ক্রুজ় এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে মাঝ-আকাশেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে ক্রেমলিনের এই ব্রহ্মাস্ত্রের।
আরও পড়ুন:
এস-৪০০ নির্মাণকারী সংস্থা হল আলমাজ় সেন্ট্রাল ডিজ়াইন ব্যুরো। এটি একসঙ্গে চিহ্নিত করতে পারে ৩০০ লক্ষ্যবস্তু। রাশিয়া থেকে এই হাতিয়ারের পাঁচটি ইউনিট আমদানি করেছে নয়াদিল্লি। তার মধ্যে চারটি ইতিমধ্যেই সরবরাহ করেছে মস্কো। বাকি একটির কিছু দিনের মধ্যে ভারতীয় বায়ুসেনার বহরে শামিল হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটিতে রয়েছে চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। ‘স্টেলথ’ শ্রেণির লড়াকু জেটকেও অনায়াসেই চিহ্নিত করতে পারে এ দেশের ‘সুদর্শন চক্র’।
‘এস-৪০০’-এর চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির পাল্লা আলাদা। ৪০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য রয়েছে ৪০এন৬ ক্ষেপণাস্ত্র। আবার ২৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুর জন্য ব্যবহার হবে ৪৮এন৬ ক্ষেপণাস্ত্র। দু’টি ছাড়া মাঝারি পাল্লার ৯এম৯৬ই২ এবং স্বল্পপাল্লার ৯এম৯৬ই নামের আরও দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ‘এস-৪০০’র লঞ্চারে। অত্যাধুনিক এই ‘সুদর্শন চক্র’ ব্যবহার করার পদ্ধতিটি বেশ জটিল।
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি পরিচালনার জন্য চারটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। প্রথমে নজরদারি (সার্ভেল্যান্স) রেডার লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করে। দীর্ঘপাল্লার এই রেডার ব্যবস্থা বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করে কমান্ড ভেহিকলকে। এই কমান্ড ভেহিকল লক্ষ্যবস্তুকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিশানা করার জন্য বার্তা পাঠায় এনগেজমেন্ট রেডারকে। এনগেজমেন্ট রেডারের সেই বার্তা লঞ্চার ভেহিকলে যায়। নিশানা ঠিক করে দেয় এনগেজমেন্ট রেডার। তার পরই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এস-৪০০।
‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন নয়াদিল্লিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় পাক ফৌজ। হরিয়ানার সিরসার আকাশে সেগুলিকে ধ্বংস করে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পাশাপাশি, এই লড়াইয়ে একগুচ্ছ অত্যাধুনিক লড়াকু জেটও হারায় ইসলামাবাদ। তাতে এস-৪০০-এর ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের হাতযশ ছিল বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
২০২৪ সালে ডিআরডিওর তৈরি আকাশতীর এবং আকাশ নামের দু’টি এয়ার ডিফেন্স হাতে পায় ভারতীয় সেনা। সিঁদুরকে কেন্দ্র করে চলা পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে এগুলির পারফরম্যান্সও ছিল নজরকাড়া। প্রথমটির সাহায্যে ইসলামাবাদের প্রায় সমস্ত ড্রোনের ঝাঁককে আটকে দেয় নয়াদিল্লি। আর দ্বিতীয়টি দিয়ে রাওয়ালপিন্ডির সাড়ে চার প্রজন্মের চিনা লড়াকু জেট জেএফ-১৭কে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে এ দেশের বায়ুসেনা।
ফলে ডিআরডিও নির্মিত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র-বিরোধী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটির খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সেটিকে নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে চড়ছে পারদ। কবে থেকে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হওয়ার জেরে খুব দ্রুত সেই পদক্ষেপ করতে পারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আকাশ প্রতিরক্ষা বাদ দিলে শত্রুর রণতরী ধ্বংসের মাঝারি পাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে ডিআরডিও। আয়তনের নিরিখে চিনা নৌবাহিনী বিশ্বের বৃহত্তম। ফলে সংঘাত পরিস্থিতিতে এই হাতিয়ার ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন সাবেক সেনাকর্তারা।
সূত্রের খবর, অপারেশন সিঁদুরে পাক বিমানঘাঁটিগুলি ধ্বংস করতে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস সুপারসনিক (শব্দের চেয়ে গতিশীল) ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল ভারত। এ বার ওই অস্ত্রটিকেই হাইপারসনিক স্তরে উন্নীত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি ও মস্কো। সে ক্ষেত্রে শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বা তারও বেশি গতি পাবে ব্রহ্মস।
সম্প্রতি এই ইস্যুতে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন ভারতে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। তিনি জানিয়েছেন, ব্রহ্মসের এই নতুন সংস্করণ আকারে কিছুটা ছোট এবং ওজনে হালকা হলেও মারণক্ষমতা কমবে না। পাশাপাশি হাইপারসনিক স্তরে উন্নীত হলে বাড়বে এর পাল্লাও।