১০ হাজার ৩৭৭ কোটির সম্পত্তি! বাড়ি দেখে লজ্জা পাবে রাজপ্রাসাদ, রয়েছে বহু গাড়ি, কোটি কোটির দানধ্যানও করেন ফুটবলের ‘গোট’
একাধিক বাড়ি এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিক মেসি। ফুটবল মাঠের বাইরেও এই তারকা বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে রয়েছে হোটেল থেকে শুরু করে নরম পানীয়ের ব্যবসা।
বিশ্বকাপে মেসি-ঝড়। দু’ম্যাচেই ৫ গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে এগিয়ে বিশ্ববরেণ্য ফুটবলার। এর মধ্যেই বুধবার ৩৮ পেরিয়ে ৩৯-এ পা দিয়েছেন তিনি। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন লিয়োনেল মেসি। এই আবহে তাঁর ভক্তকুলের একাংশের মনে প্রশ্ন জেগেছে কত সম্পত্তির মালিক ফুটবল জগতের ‘গোট’? একই সঙ্গে জেনে নেওয়া যাক, তাঁর দানধ্যানের বিষয়েও।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসির বার্ষিক মোট আয় প্রায় ১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৭ কোটি ডলার আসে মাঠের খেলা থেকে এবং বাকি ৭ কোটি ডলার আসে বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে। মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১১০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ১০ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা)। অর্থাৎ, তিনি হাজার কোটিপতি।
একাধিক বাড়ি এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিক মেসি। ফুটবল মাঠের বাইরেও এই তারকা বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে রয়েছে হোটেল থেকে শুরু করে নরম পানীয়ের ব্যবসা।
মেসির মালিকানাধীন হোটেলের নাম ‘মিম হোটেলস’। ২০১৭ সাল থেকে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। এ ছাড়াও তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য মেসি স্টোর’, ‘৫২৫ রোজারিও মিডিয়া কোম্পানি’, ‘প্লে টাইম স্পোর্টস-টেক ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম’, ‘এল ক্লাব দে লা মিলানেসা রেস্তরাঁ’।
‘আর্কিটেকচারাল ডাইজেস্ট’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসি এবং তাঁর পরিবারের বসবাসের জন্য একাধিক বাড়ি এবং অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। তারকা ফুটবলারের প্রতিটি বাড়িই জনগণের চোখের আড়ালে বানানো হয়েছে। মূলত জলাশয়ের পাশে কেনা, যাতে সহজে বাইরের ব্যক্তির প্রবেশ না ঘটে। কোনওটিতে হেলিপ্যাড রয়েছে, কোনওটিতে নিজস্ব ফুটবল মাঠ। তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও এবং কায়রোর খেলাধুলোর জন্য আলাদা প্রাঙ্গণ। জিম, সুইমিং পুল, সিনেমা দেখার থিয়েটার— কী নেই সেই বাড়িগুলিতে!
আরও পড়ুন:
২০০৯ সালে বার্সেলোনার অভিজাত উপকূলীয় এলাকা কাস্তেলদেফেলসে প্রায় ১৯ কোটি টাকার একটি বাড়ি কেনেন মেসি। বার্সেলোনার স্টেডিয়ামের কাছেই এই বিশাল প্রাসাদে রয়েছে জিম, স্পা, সিনেমা থিয়েটার, সুইমিং পুল, বার্বিকিউ করার ছাদ এবং তাঁর সন্তানদের সঙ্গে খেলার জন্য একটি ছোট ফুটবল মাঠ। ২০১৯ সালে আমেরিকার মায়ামির ফ্লরিডায় প্রায় ৪৭ কোটির একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন তিনি। ৬০তলার পোরশে ডিজ়াইনের বহুতলে ৩,৫৫৫ বর্গফুটের ৩টি বেডরুমের ফ্ল্যাট সেটি। এই টাওয়ারে শুধু গাড়ি উপরে তোলার জন্য একটি আলাদা কাচের লিফ্ট রয়েছে।
২০২১ সালে ফ্লরিডার বাড়ির কাছেই ‘রেগালিয়া’ বিল্ডিংয়ের পুরো নবম তলাটি প্রায় ৭০ কোটি টাকায় কিনে নেন মেসি। ৪টি বেডরুম ও ৬টি শৌচালয়ের এই বাড়ি ২,১০০ বর্গফুটের। বিশাল বারান্দা, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কাচের জানলা, ১,০০০ বোতলের ওয়াইন রুম এবং প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি পাথরের বাথরুম রয়েছে। পাশাপাশি, এখানে ছ’টি সুইমিং পুল ও স্পা-সহ বিলাসবহুল সব বন্দোবস্ত রয়েছে। ২০২১ সালেই ‘রেগালিয়া’র কাছে ‘ট্রাম্প রয়্যাল’ বিল্ডিংয়ে প্রায় ১৭ কোটি টাকায় কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন মেসি, যদিও সেখানে থাকার কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। সম্পত্তির বিস্তারের কথা ভেবেই হয়তো কিনে রেখেছেন সে বাড়ি।
২০২২ সালে নিজের জন্মভূমি আর্জেন্টিনার রোজ়ারিওতে ‘দ্য ফোর্ট্রেস’ নামে তিনটি প্লট জুড়ে একটি বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেছেন মেসি। একই বছরে স্পেনের ইবিজ়া দ্বীপে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি অট্টালিকা কিনেছেন। মূলত ছুটি কাটানোর জন্য নিরিবিলি নীড়ের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেই দ্বীপে মেসির একটি নিজস্ব বিলাসবহুল হোটেলও রয়েছে, যেখানে তিনি প্রায়ই সপরিবার গরমের ছুটি কাটাতে যান।
ইন্টার মায়ামি ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কয়েক মাস পর, ২০২৩ সালে মেসি ফ্লোরিডায় প্রায় ১০০ কোটি দিয়ে তাঁর চতুর্থ বাড়িটি কেনেন। আগের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টগুলির মতো অত সাজানো-গোছানো নয় বটে, কিন্তু নিজস্ব ওয়াটারফ্রন্ট সুইমিং পুল, ৭০ ফুটের জলাশয়, জিম এবং স্পা রুম রয়েছে। এ ছাড়া বাড়িটি ইন্টার মায়ামির মাঠ থেকেও খুব দূরে নয়। প্রচুর গাড়ির সম্ভারও রয়েছে মেসির।
আরও পড়ুন:
ফুটবলের মাঠ ছাড়িয়ে মেসির প্রভাব আরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের দানধ্যানের বিষয়েও এক বার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। গত দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে, আর্জেন্টাইন তারকা দানের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য নজির গড়েছেন। বিভিন্ন মহাদেশ জুড়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দুর্যোগকালীন সহায়তা এবং ক্যানসার গবেষণার মতো খাতে অবদান রেখে চলেছেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসি উদার ভাবে নিয়মিত দানধ্যান করে থাকেন। এর জন্য সংস্থাও রয়েছে তাঁর। তা কোনও লোকদেখানো প্রকল্প নয়। প্রকৃত গবেষণাকেন্দ্র, হাসপাতাল এবং অসহায় শিশুদের কল্যাণে টাকা ঢালে তাঁর সংস্থা। মেসি ২০০৭ সালে ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’ নামে অসরকারি সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থাটি মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির সহায়তায় কাজ করে। মেসির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই এই ফাউন্ডেশনের জন্ম হয়েছিল।
মাত্র ১১ বছর বয়সে মেসির শরীরে ‘গ্রোথ হরমোন’-এর ঘাটতি ধরা পড়ে। প্রতি মাসে প্রায় ১,৫০০ ডলারের সেই ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাতে তাঁর পরিবারকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। অবশেষে এফসি বার্সেলোনা তাঁর প্রথম চুক্তির অংশ হিসাবে সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার দায়িত্ব নেয়। সেই অভিজ্ঞতা তরুণ ফুটবলারের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
পরবর্তী কালে মেসি অসরকারি সংস্থা খুলে একটি বিশাল দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এটি বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতি বছর মোট ১০ কোটি ইউরো অনুদান এবং সহায়তা প্রদান করে। আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের হাসপাতালগুলির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করে মেসির সংস্থা। বিশেষ করে বুয়েনস আইরেসের ‘গারাহান’ হাসপাতাল এবং বার্সেলোনার ‘সান্ত জোয়ান দে দেউ’ হাসপাতালের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ রয়েছে সংস্থাটির।
শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রের জন্যও মেসির সংস্থার অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বার্সেলোনায় ‘এসজেডি পেডিয়াট্রিক ক্যানসার সেন্টার’ নির্মাণের জন্য মেসির সংস্থাটি ২৬ লক্ষ ইউরো অনুদান দিয়েছে। এই কেন্দ্রটি ইউরোপের বৃহত্তম শিশু ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। প্রতি বছর সেখানে ৪০০ জন রোগীর চিকিৎসার হয়।
কোভিড অতিমারির সময়েও মেসি ১০ লক্ষ ইউরো অনুদান দিয়েছিলেন। এর অর্ধেক বার্সেলোনার একটি হাসপাতালে এবং বাকি অর্ধেক আর্জেন্টিনার একটি হাসপাতালে প্রদান করা হয়। সেই কঠিন সময়ে ক্লাবের খরচ সামলাতে সহায়তা করার জন্য মেসি স্বেচ্ছায় এফসি বার্সেলোনায় নিজের বেতন ৭০ শতাংশ কমিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন।
মেসির দানধ্যান কেবল ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সিরিয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের জন্য প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড (সহজে স্থাপনযোগ্য) শ্রেণিকক্ষ তৈরির লক্ষ্যে ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করেছেন।
কেনিয়ায় শিশুদের অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিনি জলের পাম্প এবং পুষ্টিকর খাবার সরবরাহে ২ লক্ষ ইউরো অনুদান দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আর্জেন্টিনার অনুন্নত এলাকায় খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা এবং খেলার মাঠ তৈরির কাজেও বিনিয়োগ করেছেন তিনি।
২০১১ সালে তাঁর বাঁ পায়ের আদলে তৈরি ২৫ কেজি ওজনের একটি নিরেট সোনার প্রতিকৃতি বিক্রির লভ্যাংশের একটি অংশ জাপানে তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামিদুর্গতদের জন্য দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন মেসি। শিল্পকর্মটির মূল্য ছিল ৫২.৫ লক্ষ ডলার। এ ছাড়া মেসি ব্যক্তিগত ভাবে ক্যাম্প ন্যু-তে সেই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০ জন জাপানি শিশুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
দানধ্যানের জন্য মেসি প্রায়শই তাঁর ব্যক্তিগত ফুটবল-সংক্রান্ত স্মারকও নিলামে তুলেছেন একাধিক বার। ২০২২ সালে ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি টুর্নামেন্ট চলাকালীন তাঁর পরা ছ’টি জার্সি নিলামে তুলেছিলেন। সেই অর্থ বার্সেলোনার একটি হাসপাতালে বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের সহায়তায় ব্যয় করা হয়েছিল। এ ছাড়া ‘ফ্রেন্ডস অফ মেসি’ নামে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচেরও আয়োজন করেন মেসি, যার মাধ্যমে তাঁর সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়। এক বার মেসি বলেছিলেন, ‘‘এখন কিছুটা বিখ্যাত হওয়ার সুবাদে আমি এমন সব মানুষকে সাহায্য করার সুযোগ পাচ্ছি, যাঁদের সত্যিই সাহায্যের প্রয়োজন।’’