কারও কোটি টাকার জমি, কারও ‘প্রাসাদ’! রামমন্দিরের অনুদান চুরি বিতর্কে কেঁচো খুঁড়তে বেরোচ্ছে একের পর এক কেউটে
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার অনুদান ও গয়না নয়ছয় বা চুরির অভিযোগ ওঠে গত ৭ জুন। সমাজবাদী পার্টির প্রাক্তন বিধায়ক পবন পাণ্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি সিট গঠন করার কথা ঘোষণা করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।
এ যেন কেঁচো খুঁড়তে কেউটে! রামমন্দিরের অনুদান ঘিরে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে উত্তরপ্রদেশে। রামমন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। আর এই আবহে ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর মধ্যে। কারণ অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান চুরিকে কেন্দ্র করে অভিযোগের আঙুল উঠেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ঘনিষ্ঠদের দিকে।
পিঠ বাঁচাতে মামলায় দ্রুত এফআইআর দায়ের করে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে বিচারের জন্য উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ প্রশাসনের কাছে প্রকাশ্যে দাবি জানিয়ে সরব হয়েছে ভিএইচপি। আর তাতেই বিরোধীরা সুর চড়াতে শুরু করেছেন বিজেপি ও ভিএইচপির বিরুদ্ধে। দায় এড়াতেই এই কৌশল বেছে নিয়েছে আরএসএসের শাখা সংগঠনটি, অভিযোগ তুলেছে সমাজবাদী পার্টি-সহ বিরোধী পক্ষ।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সংগঠন হিসাবে পরিচিত গোটা দেশে। সংগঠনটি দাবি করেছে যে মামলাটির শুনানি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতে করা হোক। সংগঠনটির বক্তব্য, তদন্তে যাঁরা দোষী প্রমাণিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার অনুদান ও গয়না নয়ছয় বা চুরির অভিযোগ ওঠে গত ৭ জুন। সমাজবাদী পার্টির প্রাক্তন বিধায়ক পবন পাণ্ডে অভিযোগ তোলেন রামমন্দিরে দেওয়া সাত থেকে সাড়ে সাত কোটি টাকার অনুদান চুরি বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিতর্ক বাড়তে থাকলে, বিজেপি নেতা রজনীশ সিংহ ৯ জুন প্রধানমন্ত্রীকে সিবিআই তদন্তের দাবিতে চিঠি লেখেন।
এর ঠিক পরের দিনই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রামমন্দির ট্রাস্টের কাছে একটি প্রতিবেদন চায়। রামমন্দির ট্রাস্টের সুপারিশে, মন্দিরের অনুদান ব্যবস্থাপনায় কোনও অনিয়ম হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ১৩ জুন তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করেছেন। এই বিস্ফোরক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যোগী সরকার তদন্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।
আরও পড়ুন:
আইনজীবী মোহিত অশোক গত ৮ জুন উত্তরপ্রদেশের প্রধান সচিব (ভিজিল্যান্স), রামমন্দির ট্রাস্ট, সিবিআই এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনপত্র পাঠানোর পর গত ১২ জুন একটি জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল) দায়ের করেছেন। তিনি জানান, রামমন্দির প্রকল্পে অনিয়ম এবং সম্ভাব্য অর্থ আত্মসাতের ইঙ্গিত দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তাঁর এই আবেদনপত্রটি ছিল।
অনুদান চুরির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর অযোধ্যার রুডৌলি এলাকায় মন্দিরের এক কর্মচারীর বাড়ি থেকে পুলিশ ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা উদ্ধার করে। শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পৎ রাইয়ের উপস্থিতিতে অযোধ্যা পুলিশ মীনাপুরের ফগৌলী গ্রামে লবকুশ মিশ্র নামের ওই কর্মচারীর বাড়িতে অভিযান চালায়। স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে যে, মন্দির প্রশাসনে চাকরি পাওয়ার আগে লবকুশ গাড়ি সারাইয়ের কাজ করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয় লবকুশের, যা নজরে পড়েছিল প্রতিবেশীদেরও। এর পর লবকুশকে গ্রেফতার করা হয়। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় আট জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়াও ট্রাস্টটি মন্দিরের দান গণনার দায়িত্বে থাকা দুই কর্মচারীকে আটক করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। উভয় কর্মচারীই মন্দিরে প্রাপ্ত দান গণনার দায়িত্বে ছিলেন। মাসিক ১৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা বেতন পেতেন দু’জনে। এঁদের দু’জনের মধ্যে এক জন সম্প্রতি দেড় কোটি টাকার জমি কিনেছেন, আর অন্য জন ৪০ লাখ টাকার একটি জমি কিনেছেন বলে সূত্রের খবর।
রামমন্দির অনুদান চুরি-কাণ্ডে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট যোগী প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি)। তাতে ১৭ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে তারা। এ ছাড়া মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত দেড়শোর কাছাকাছি সেবাদারের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে।
আরও পড়ুন:
রামমন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে এঁদের অনেকেরই সম্পদ কয়েক গুণ বেড়েছে। সম্পত্তি বৃদ্ধির তালিকায় নাম উঠে এসেছে ফুলকান্ত মিশ্র নামে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির। তিনি ‘রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র’-এর সাধারণ সম্পাদক তথা ভিএইচপি-র সহ-সভাপতি চম্পৎ রাইয়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
চুরি-কাণ্ডে এক দিকে যেমন যোগী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই প্রশ্ন উঠেছে আরএসএসের শাখা সংগঠন ভিএইচপি-র ভূমিকা নিয়েও। সূত্রের বক্তব্য, ঘটনার দায় কে নেবে তা নিয়ে উভয় পক্ষ পরস্পরের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করেছে। এই আবহে ভিএইচপি সভাপতি (আন্তর্জাতিক) অলোক কুমার সমাজমাধ্যমে অবিলম্বে ওই চুরি-কাণ্ডে এফআইআর দায়ের করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি মহা ধুমধাম করে উদ্বোধন করা হয়েছিল অযোধ্যার ‘বহু প্রতীক্ষিত’ রামমন্দিরের। প্রথম দিন শুধু নিমন্ত্রিতেরাই উপস্থিত ছিলেন সেখানে। পরদিন থেকেই সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল মন্দিরের দরজা। ২২ তারিখ রামলালার অভিষেকের পর থেকে মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই রামলালার পাওয়া দানের টাকার অঙ্ক শুনলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। চেক, অনলাইন এবং দানবাক্স মিলিয়ে সেই ক’দিনের মধ্যে রামলালার পাওনা হয়েছিল ১১ কোটি টাকারও বেশি!
একটি সংস্থার সিএমডি রাজু ভি মানওয়ানি বুধবার সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তিনি ২০২১ সালে সিন্ধি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে রামমন্দিরে ২০০টি রুপোর ইট দান করেছিলেন। দানের সময় কোনও রসিদ পাননি। তিনি এখন একটি রসিদ এবং রুপোটি কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য চেয়েছেন। এ বিষয়ে মন্দির ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।
১৪ জন কর্মীর একটি দল রয়েছে রামমন্দিরে। এঁদের মধ্যে ১১ জন ব্যাঙ্কের কর্মচারী এবং বাকি তিন জন মন্দির ট্রাস্টের কর্মী। তাঁরা সকলে মিলে চারটি দানবাক্স এবং কম্পিউটারাইজ়ড কাউন্টারে জমা পড়া দান গণনা করেন৷ ট্রাস্টের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অনুদানের টাকা জমা করা থেকে গণনা করা, সব কিছুই সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে হয়।
বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) আর্থিক নথিপত্র, অনুদান গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া এবং মন্দির প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে। তদন্তের অংশ হিসাবে ট্রাস্টের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং অনুদানের হিসাব, নগদ অর্থ জমার রেকর্ড ও অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এসআইটি চম্পৎ রাই ও গোপাল রাও-সহ ট্রাস্টের কয়েক জন ঊর্ধ্বতন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পাশাপাশি অনুদানের রেকর্ড, নগদ অর্থ গণনার নথি এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্রও খতিয়ে দেখা হয়েছে। তদন্তকারীরা দান হিসেবে পাওয়া সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও পর্যালোচনা করেছেন। দানসামগ্রী গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং তার হিসাবরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজবাদী পার্টির পক্ষ থেকে সাড়ে সাত কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পরে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি-সহ কয়েকটি বিরোধী দলের নেতারা অনুদানের প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন।
আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ট্রাস্ট অনুদান হিসাবে ৮২.৭৮ কোটি টাকা পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সুদ থেকে ১৩৮.০৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে এবং মোট আয় হিসাবে ২২০.৮১ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
এই অভিযোগ ও বিতর্ক এমন এক সময় সামনে এসেছে যখন ২০২৭ সালের শুরুতে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। তদন্তে ভালমন্দ যা-ই উঠে আসুক না কেন শাসকদল বিজেপির উপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে রাজমনৈতিক মহলের একাংশ। যদিও দল বা সরকার মন্দিরটির ব্যবস্থাপনা বা দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে কোনও ভাবেই জড়িত নয়। কিন্তু আরএসএসের শাখা সংগঠন ভিএইচপি ঘনিষ্ঠদের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় অস্বস্তিতে পড়তে হতে পারে বর্তমান শাসকদলকে।
১৯ জুন এক অনুষ্ঠানে গিয়ে রামমন্দিরের এই ঘটনা নিয়ে মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ। সিট গঠনের কথা জানিয়ে সকলকে সংযত থাকার আহ্বান করেছেন তিনি। তাঁর অনুরোধ, “কারও প্ররোচনায় পা দেবেন না। সিট-কে নিজেদের মতো তদন্ত করতে দিন। তাদের অন্তত ১৫ দিন সময় দিন।” তাঁর কথায়, ‘‘রামভক্তদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, ভগবান রাম আমাদের মর্যাদা এবং সংযমের পথে হাঁটা শিখিয়েছেন। রাম জন্মভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা ৫০০ বছর শৃঙ্খলার সঙ্গে সংগ্রাম করেছি। আরও ১৫ দিন অপেক্ষা করুন। ধৈর্য ধরুন। দুশ্চিন্তা করবেন না।’’