কলেজছুট, নাবালক ডেলিভারিকর্মী আজ ৪০ হাজার কোটির সংস্থার মালিক! হোয়াট্সঅ্যাপের নতুন ‘মাথা’ কে এই কুণাল শাহ?
কুণালের জন্ম মুম্বইয়ে। পড়াশোনা উইলসন কলেজে। দর্শনশাস্ত্র নিয়ে। কৈশোরে পারিবারিক ব্যবসায় লালবাতি জ্বলে যাওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণে সাহায্য করতেন কুণাল।
মার্ক জ়ুকেরবার্গের সংস্থা মেটার মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াট্সঅ্যাপের নতুন মাথা বা ‘গ্লোবাল হেড’ হলেন এক ভারতীয়। ভারতীয় ফিনটেক সংস্থা ক্রেডের প্রতিষ্ঠাতা কুণাল শাহকে নিয়োগ করার কথা ঘোষণা করে মেটা। গ্লোবাল সিইও হিসাবে কুণালের নাম ঘোষণা করেছেন মেটার কর্ণধার স্বয়ং। স্বাভাবিক ভাবেই স্টার্টআপ জগতের অন্যতম আলোচিত উদ্যোক্তাদের মধ্যে নাম উচ্চারিত হচ্ছে কুণালের।
কুণালের উত্থানের গল্পের সঙ্গে সিনেমার চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পেতে পারেন অনেকেই। ক্রেড, ফ্রিচার্জের মতো একাধিক অ্যাপের প্রতিষ্ঠাতা কুণাল। কিছুটা চমকে দিয়েই সোমবার হোয়াট্সঅ্যাপের বর্তমান সিইও উইল কাথকার্টের জায়গায় তাঁর নাম ঘোষণা হয়। একই সঙ্গে কুণালের সংস্থা ক্রেডে ৯০ কোটি ডলার বা প্রায় ৮৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করেছে মেটা।
ভারতের স্টার্টআপ সংস্থার কথা বললে যে ক’টি নাম সবার আগে আসে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল কুণালের সংস্থা ক্রেড। ভারতের অন্যতম সফল ফিনটেক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা কুণাল। তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর কৈশোরেই সংসারের হাল ধরা এবং প্রথাগত শিক্ষার বাইরে গিয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তার জোরে আজ ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে বৈগ্রহিক হয়ে উঠেছেন এই তরুণ উদ্যোগপতি।
কুণালের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মতে কুণাল সেই বিরল প্রজাতির স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, যিনি একই সঙ্গে বাস্তববাদী, সহানুভূতিশীল এবং রসিক। বাবার ব্যবসা ভেস্তে যাওয়ার পর পরিবার দেউলিয়া হয়ে গেলেও হাল ছাড়েননি কুণাল। দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিকূল স্রোতে লড়াই করে ভেসে থেকেছেন।
কুণালের জন্ম মুম্বইয়ে। পড়াশোনা উইলসন কলেজে। দর্শনশাস্ত্র নিয়ে। কৈশোরে পারিবারিক ব্যবসায় লালবাতি জ্বলে যাওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো কাজ করে সংসারের ভরণপোষণে সাহায্য করতেন কুণাল। প্রায় কোনও কাজ করতেই বাকি রাখেননি। ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই ডেলিভারি কর্মী, ডেটা অপারেটর, মেহন্দি বিক্রেতা, সাইবার ক্যাফে অপারেটর, সিডি বিক্রি এবং কম্পিউটার শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল তাঁকে।
আরও পড়ুন:
অন্যান্য অধিকাংশ বিখ্যাত ভারতীয় স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের মতো আইআইটি-আইআইএম ডিগ্রি বা ন্যূনতম কারিগরি শিক্ষার ডিগ্রিটুকুও নেই কুণালের। ২০২৪ সালে কুণাল দর্শনশাস্ত্র নিয়ে কলেজে ভর্তি হন। এই বিষয়টি নিয়ে পড়ার একমাত্র কারণ ছিল, এর ক্লাস সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত হত। দিনের বাকি সময়টা তিনি ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ পেতেন।
কলেজ শেষ করার পর কুণাল মুম্বইয়ের নারসি মনজি ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ়ে এমবিএ-তে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ডিগ্রি শেষ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, চার দেওয়ালের ভিতরের তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে ময়দানে নেমে বাস্তব ব্যবসার আকর্ষণ অনেক বেশি।
২০১০ সালে কুণাল এবং সন্দীপ টন্ডন মিলে প্রতিষ্ঠা করেন একটি সংস্থা। এটি ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যা মোবাইল রিচার্জের বিনিময়ে গ্রাহকদের বিভিন্ন নামীদামি ব্র্যান্ডের সমমূল্যের কুপন বা ভাউচার দিত। অর্থাৎ, গ্রাহকদের পরের রিচার্জ হয়ে যেত কার্যত বিনামূল্যে। এই অভিনব ব্যবসায়িক কৌশল ভারতের বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
২০১৫ সালের মধ্যে সংস্থাটি ভারতের অন্যতম বৃহত্তম মোবাইল রিচার্জ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। ওই বছরেই তৎকালীন একটি ই-কমার্স জায়ান্ট সংস্থা প্রায় ৪০ কোটি ডলারের (তৎকালীন প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা) বিনিময়ে কুণালের প্রথম সংস্থাটি কিনে নেয়। সেই সময় ভারতীয় স্টার্টআপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অধিগ্রহণ ছিল এটি।
আরও পড়ুন:
বিক্রির পর কুণাল নিষ্ক্রিয় ছিলেন এবং বৈশ্বিক বাজার নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি লক্ষ করেন, ভারতে যাঁরা সময়মতো ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করেন, অর্থাৎ যাঁদের ক্রেডিট স্কোর ভাল, তাঁদের জন্য বিশেষ কোনও পুরস্কার বা সুবিধা নেই। এই ভাবনা থেকেই ২০১৮ সালে জন্ম হয় ক্রেডের।
ক্রেড হল এমন একটি অ্যাপ, যা ক্রেডিট স্কোর বেশি রয়েছে এমন গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করতে সাহায্য করে। বিনিময়ে বিভিন্ন ক্যাশব্যাক ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের নানা সুবিধা প্রদান করে। অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং নান্দনিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেড দ্রুত ভারতের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝে জায়গা করে নেয়। বর্তমানে সংস্থাটি একটি ‘ইউনিকর্ন’ (১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সংস্থা) সংস্থা।
ক্রেডের বর্তমানে ১ কোটি ৭০ লক্ষ মাসিক সক্রিয় গ্রাহক রয়েছেন। এই ব্যবসাটি শুধুমাত্র সদস্যদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের সময়মতো ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করার জন্য পুরস্কৃত করে এটি।
সফল হওয়ার জন্য সব সময় একটি সমৃদ্ধ পরিবার বা নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। তীব্র ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার মানসিকতা থাকলে এক সাধারণ ডেলিভারিকর্মীও দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এমনটাই বিশ্বাস ক্রেডের প্রতিষ্ঠাতার। কুণাল জানিয়েছেন, তাঁর সংস্থায় এমন কর্মচারীও রয়েছেন যিনি দশম শ্রেণি উত্তীর্ণ।
কুণালের ব্যবসায়িক সাফল্যের চাবিকাঠি কী? জাতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘গ্রাহকের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার প্রতি যদি আপনি সহানুভূতিশীল না হন, তা হলে তাঁদের আচরণে পরিবর্তন আনার আশা করা কঠিন। একই ভাবে, এমন একটি দলও গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আমার বিশ্বাস, যাঁরা নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা করেন, তারা দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা অসংবেদনশীল থাকতে পারেন না।”
হোয়াট্সঅ্যাপের শীর্ষ পদে যোগ দিতে ক্রেডের সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন কুণাল। তবে, তিনি তাঁর সংস্থায় ব্যক্তিগত শেয়ারের মালিকানা নিজের হাতেই রাখবেন।
মেটা ২০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণের পর ক্রেডের মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৪০ হাজার কোটি চাকারও বেশি)। হোয়াট্সঅ্যাপের বর্তমান গ্লোবাল হেড উইল কাথকার্টের স্থলাভিষিক্ত হবেন কুণাল। যদিও কাথকার্টকে মেটার একটি নতুন দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর ভিত্তি করে পণ্য উন্নয়নের উপর কাজ করবেন বিদায়ী গ্লোবাল হেড।
অন্য দিকে ক্রেডে কৌশলগত পরিকল্পনা ও অর্থায়নের দায়িত্বে থাকা মিতেন সম্পত অন্তর্বর্তিকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও-এর দায়িত্ব পালন করবেন। হোয়াট্সঅ্যাপ ক্রমশ মেসেজিংয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আর্থিক লেনদেন, বাণিজ্য এবং ব্যবসায়িক পরিষেবার মতো ক্ষেত্রগুলিতে প্রসারিত হচ্ছে। আর এই ক্ষেত্রগুলিতে কুণাল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পণ্য তৈরি, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন সংস্থাকে পরামর্শ দিয়ে এসেছেন।
কেন কুণালকে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করে জানায়নি জ়ুকেরবার্গের সংস্থা। তবে নিয়োগের সময় মেটার সিইও জানিয়েছেন, কুণালের নতুন কিছু তৈরি করার ক্ষমতা এবং বিশ্ব জুড়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে এই পদের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে। এর আগে মূলত ফিনটেক ও স্টার্টআপ জগতে কাজ করেছেন কুণাল। কিন্তু এ বার তাঁকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে, যার পরিধি আগের কাজের তুলনায় বেশ বড় ও ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিভিন্ন স্টার্টআপ সংস্থার কর্ণধারেরা।