মানসিক অসুস্থ বলেও প্রকাশ্যে এনকাউন্টার! সরকারবিরোধী পোস্ট করেই বিষনজরে? ভরত তিওয়ারী হত্যায় উত্তাল বিহার!
ভোজপুর পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার দিন তারা খবর পায় যে ভরত তিওয়ারি বিলাউটি গ্রামে একটি পিস্তল নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালাচ্ছেন। এসটিএফ সদস্যদের সঙ্গে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছোয়। পুলিশ জানায়, বার বার আত্মসমর্পণ করতে বললেও ভরত গুলি চালাতে থাকেন।
বিহারের ভোজপুরে তরুণের এনকাউন্টার। ঘটনার জেরে উত্তাল পড়শি রাজ্য। প্রথমে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাগিয়ে দেওয়া। পরে ভরতভূষণ তিওয়ারি নামের ২৮ বছরের ওই তরুণকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এনকাউন্টারের মতো পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিপুল সমালোচনা হওয়ার পর সম্রাট চৌধরির সরকার বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্ট বিচারপতির তত্ত্বাবধানে সংঘর্ষের ঘটনাটির একটি স্বাধীন বিচারবিভাগীয় তদন্তের কথা ঘোষণা করেছেন। সরকার জানিয়েছে, এই তদন্তে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখা হবে। ঘটনাটি ঘিরে জনরোষের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে বিহারের একাংশে। এমনকি শাসক দল বিজেপির অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৭ জুন। ভোজপুর পুলিশের দাবি অনুযায়ী ওই দিন তারা খবর পায় যে বিলাউটি গ্রামে একটি পিস্তল নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালাচ্ছেন ভরত। এসটিএফ সদস্যদের সঙ্গে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছোয়। পুলিশ জানায়, বার বার আত্মসমর্পণ করতে বললেও ভরত গুলি চালাতে থাকেন। পুলিশ দাবি করেছে, আত্মরক্ষার্থে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের রক্ষা করতে তারা পাল্টা গুলি চালিয়েছে।
দীর্ঘ ক্ষণ ধরে পুলিশ ভরতকে ঘিরে রাখে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই ঘটনা সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েকটি ভিডিয়োয় ভরতকে অস্ত্র হাতে দেখা যায় বলেও দাবি। যদিও সেই ভিডিয়োগুলির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম। ভরত বার বার পুলিশ-প্রশাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছিলেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন অনুসারে, পুলিশ প্রথমে ভরতকে মানসিক ভাবে অসুস্থ বলে বর্ণনা করেছিল। পরবর্তী কালে এনকাউন্টারে তাঁকে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা এসটিএফ সদস্যেরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভরতের দিকে এগিয়ে গেলে তিনি পাল্টা গুলি চালান।
আরও পড়ুন:
ওই সময় ভরতের পায়ে গুলি লাগে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে পটনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এনকাউন্টারের পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, দু’টি তাজা কার্তুজ, একটি ম্যাগাজ়িন এবং দু’টি গুলির খালি খোল উদ্ধার করা হয়েছে।
নেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, গুলি চালানোর আগেই ভরত তাঁর অস্ত্র ফেলে দিচ্ছেন। তার পরও পুলিশ কেন এই এনকাউন্টারটি পরিচালনা করল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। পরিস্থিতি অন্য ভাবে সামলানো যেত কি না এবং এনকাউন্টারের যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিহারের রাজনীতির অলিন্দে।
ভোজপুরের শাহপুর এলাকার বিলাউটি গ্রামের বাসিন্দা ভরত প্রায়ই সমাজমাধ্যমে বন্যা, নদীভাঙন ও বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলি নিয়ে সোচ্চার হতেন। তাঁর পরিবারের দাবি, ভরতের অপরাধমূলক কাজকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনও প্রমাণ ছিল না। প্রায়ই জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে কথা বলার কারণে স্থানীয় প্রশাসনের বিরাগভাজন হতেন তিনি।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভরত সমাজমাধ্যমে বেশ কয়েকটি পোস্ট করেন। অভিযোগ, এই পোস্টগুলিতে তিনি দেশে একটি ‘বিপ্লবী যুদ্ধ’ শুরু করার কথা বলেন এবং জগদীশপুরের এসডিএমকে হত্যার হুমকি দেন। গত ১৫ জুন পুলিশ তাঁর বাড়িতে দু’বার হানা দেয়। কিন্তু পালিয়ে যান ভরত।
আরও পড়ুন:
পরদিন ১৬ জুন পুলিশের কাছে অভিযোগ আসে, বিলাউটি গ্রামে অস্ত্রসমেত ঘোরাঘুরি করছেন ভরত। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছোয়, তখনও ভরতের কাছে একটি বন্দুক ছিল বলে দাবি পুলিশের। এমনকি পুলিশকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভরত ফেসবুকে লাইভও করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
লাইভ ভিডিয়ো এবং পোস্টগুলিতে বিহার সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন ভরত। এনকাউন্টারে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে সেই নিয়ে আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন বিলাউটি গ্রামের বাসিন্দা এই তরুণ। ভরত দাবি করেছিলেন, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
১৬ জুন গভীর রাতে ভোজপুর পুলিশ সমাজমাধ্যমে জানায় যে, ভরত মানসিক ভাবে অসুস্থ। তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধের জন্য তাঁর কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে পোস্টে জানিয়েছিল স্থানীয় পুলিশ।
পুলিশের দাবি, বার বার আত্মসমর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও ভরত গুলি চালাতে থাকেন। পুলিশ তাঁর কাছে গেলে তিনি সরাসরি তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়, যা তাঁর পায়ে লাগে।
ভরতের পরিবার এই এনকাউন্টারকে সম্পূর্ণ ভুয়ো বলে আখ্যা দিয়েছে। পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন নিহতের মা সুমন দেবী এবং তাঁর ভাই চন্দন তিওয়ারী। ভরতের মা সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, জাওয়ানিয়া গ্রামে বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনের দাবি করছিলেন তাঁর ছেলে। সরকার বা এসডিএম কেউই তাতে কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ। তাই বাধ্য হয়ে ভরত অস্ত্র হাতে তুলে নেন। ছেলে যখন বাড়ি থেকে বার হন, পুলিশ তাঁকে ঘিরে ফেলে। অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করা সত্ত্বেও পুলিশ ইচ্ছাকৃত ভাবে তাঁকে গুলি করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সন্তানহারা সুমন।
মানসিক ভারসাম্যহীনতার অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে ভরতের পরিবার জানায় তাঁদের ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। বিজ্ঞানে স্নাতক ভরত চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চাকরি না পেয়ে সমাজসেবার দিকে ঝুঁকেছিলেন ভরত। পরিবার ও গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগেই ভরত আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তাঁদের দাবি, সমাজমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিয়ো থেকে বোঝা যায় যে, পুলিশ যখন গুলি চালায় তখন তিনি নিরস্ত্র ছিলেন।
এনকাউন্টারের জেরে শাহপুরের বিলাউটি গ্রামে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ভরতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়েরা তাঁর মৃতদেহ নিয়ে জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে ভুয়ো এনকাউন্টার চালানোর অভিযোগ তোলেন এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানাতে শুরু করে। অন্য দিকে, পুলিশি অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিহার পুলিশস্টেশন হাউস অফিসার-সহ চার পুলিশকর্মীকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে খবর।
এনকাউন্টার মামলায় পুলিশ তিনটি পৃথক এফআইআর দায়ের করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন নিহত ভরত, তাঁর বাবা এবং তাঁর ভাই। এফআইআর-এ ভরতের বাবা কাশীনাথ তিওয়ারী এবং ভাই চন্দনের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র মজুত ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগও নথিভুক্ত হয়েছে।
এনকাউন্টারের ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়ে এবং জড়িত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করা হয়েছে। আবেদনে ঘটনাটি খতিয়ে দেখার জন্য সুপ্রিম কোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনেরও দাবি জানানো হয়েছে।
পড়শি রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয়কুমার সিংহ এই ঘটনাকে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক বলে প্রশাসনিক গাফিলতির কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারী, ঋতুরাজ সিনহা এবং বক্সারের বিধায়ক আনন্দ মিশ্র-সহ বিজেপি নেতারা এনকাউন্টারের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করেছেন। বিহারের শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এনকাউন্টার ছাড়া পুলিশের কাছে যদি অন্য কোনও বিকল্প থাকত, তবে সেটিই বিবেচনা করা উচিত ছিল।