কেতনের সঙ্গে বাগ্দান, চেতনের সঙ্গে প্রেম! ২৩৮ ঘণ্টার গোপন কথোপকথন, সিয়ার বিচিত্র কর্মকাণ্ড ভাবাচ্ছে পুলিশকে
ধনী বাগ্দত্তকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া কে এই সিয়া? কী তাঁর পরিচয়?
মহারাষ্ট্রের লোহাগড় দুর্গে পুণের ব্যবসায়ী-পুত্র কেতনবিশাল অগ্রবালের ট্রেকিংয়ের সময় হওয়া মৃত্যুর যে ঘটনাটিকে প্রথমে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বলে মনে করা হয়েছিল, তা এখন একটি পরিকল্পিত হত্যার ষড়যন্ত্র হিসাবে সামনে এসেছে। অভিযোগের তির কেতনের বাগ্দত্তা সিয়া গয়ালের দিকে।
অভিযোগ, সিয়া এবং তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধরি খুন করেছেন কেতনকে। ট্রেকিংয়ের সময় গভীর খাদে পড়ে পুণের ব্যবসায়ী-পুত্রের মৃত্যুর পাঁচ দিন পর, তাঁর বাগ্দত্তা সিয়া এবং সিয়ার প্রেমিক চেতনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুণে গ্রামীণ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দু’জনে মিলে কেতনকে ৪০০ ফুট গভীর খাদে ফেলে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুন, অপরাধের ষড়যন্ত্র এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে।
ইতিমধ্যেই খুনের আগে কেতনকে নিয়ে সিয়ার বেশ কয়েকটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট প্রকাশ্যে এসেছে। হইচই ফেলেছে পোস্টগুলি। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে ধনী বাগ্দত্তকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া কে এই সিয়া? কী তাঁর পরিচয়?
সিয়া পুণের বিবওয়েওয়াড়ির বাসিন্দা। বয়স ২০ বছর। ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। সিয়ার পরিবার ড্রাই ফ্রুটস বা শুকনো ফলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, কেতনের পরিবার রিয়্যাল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কেতন মহারাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গুদামঘর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘সাকসেস গ্রুপ’-এর ডিরেক্টর ছিলেন। ম্যাসাচুসেটসের বাবসন কলেজের ‘এফডব্লিউ ওলিন গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ বিজনেস’ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ২০২৩ সালে তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিতে পুণে ফিরে আসেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেতনের সঙ্গে বাগ্দান হওয়ার আগে থেকেই গয়াল ও অগ্রবাল পরিবার একে অপরকে চিনত। কেতন এবং সিয়ার নভেম্বরে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। ব্যক্তিগত বিমান এবং উদয়পুরে রাজপ্রাসাদ ভাড়া করে জমকালো বিয়ের আয়োজনের পরিকল্পনাও করেছিল উভয়ের পরিবার।
পুলিশের দাবি, কেতনের সঙ্গে বাগ্দান সম্পন্ন হওয়ার সময়ও সিয়া তাঁর ২২ বছর বয়সি প্রেমিক চেতনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন। চেতনের পরিবারও যুক্ত ব্যবসার সঙ্গে। তদন্তকারীদের ধারণা, ব্যবসায়িক মহলের সুবাদে তাঁরা একে অপরকে চিনতেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীরা চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সিয়া এবং চেতনের মধ্যে হওয়া ২,০০৪টি কলের রেকর্ড পর্যালোচনা করেছেন। বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ওই ছ’মাসে একে অপরের সঙ্গে মোট ২৩৮ ঘণ্টা কথা বলেছিলেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেতনের মৃত্যুর আগেই সিয়াকে নিয়ে কিছু ‘সঙ্কেত’ পেয়েছিলেন কেতন এবং তাঁর পরিবার। কিন্তু মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটার আগে পর্যন্ত তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন কেতনের পরিবারের সদস্যেরা।
কেতনের বাবা বিশাল অগ্রবালের মতে, ফেব্রুয়ারিতে বাগ্দানের পর থেকেই সিয়ার আচরণ নিয়ে তাঁর ছেলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশাল জানান, বাগ্দানের পর কেতন ও সিয়ার প্রায়ই দেখা হত। তবে কেতন নাকি মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন তুলতেন, সিয়ার পরিবার বা তাঁর অতীত সম্পর্কে তাঁর পরিবার যথাযথ খোঁজখবর নিয়েছে কি না।
বিশাল জানান, তিনিই কেতনকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কারণ, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মহলের মাধ্যমে সিয়ার পরিবার তাঁদের আগে থেকেই পরিচিত ছিল। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কেতন এবং সিয়ার মধ্যে প্রায়ই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া হত। এমনকি চেতনকে নিয়েও নাকি সিয়া এবং কেতনের ঝামেলা হয়েছিল। কেতনের সন্দেহ ছিল, ওই দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।
জানা গিয়েছে, সিয়া কমবয়সি হওয়ায় কেতনের পরিবার বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিল। কিন্তু অভিযোগ, সিয়ার বাবা-মা বিয়েটি যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য জোর দিয়েছিলেন।
পুলিশের ধারণা, কেতনকে বিয়েই করতে চাননি সিয়া। তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য চেতনের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছিলেন ক্রমাগত। তদন্তকারীদের দাবি, এই হত্যার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা হয়েছিল।
জুনের প্রথম সপ্তাহে প্রি-ওয়েডিং ফোটোশুটে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে যাওয়ার কথা ছিল কেতন-সিয়ার। তাঁরা দু’জনে প্রথমে মুম্বই যান। কিন্তু বিমানবন্দরে গিয়ে পাসপোর্ট খুঁজে পাচ্ছিলেন না কেতন। ফলে বালি যাওয়া ভেস্তে গিয়েছিল।
কিন্তু সিয়ার মনে ছিল অন্য পরিকল্পনা। তদন্তকারীদের মতে, কেতন পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেননি। সিয়াই ওই পাসপোর্ট লুকিয়ে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ে নিয়ে গিয়ে কেতনকে খুন করার।
শেষ পর্যন্ত ১৮ জুন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। কেতনকে নিয়ে লোহাগড় দুর্গে যান সিয়া। পুলিশের দাবি, ক্যামেরায় যাতে না চেনা যায়, তার জন্য প্রচণ্ড গরমেও হুডি পরে গোপনে সিয়া এবং কেতনকে অনুসরণ করেছিলেন চেতন।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, লোহাগড় দুর্গে নিয়ে গিয়ে কেতনকে প্রায় ৪৫০ ফুট উঁচু থেকে একটি খাদে ফেলে দেন সিয়া এবং চেতন। কেতনের মৃত্যুকে যাতে ট্রেকিংয়ের সময় ঘটা দুর্ঘটনা বলে মনে হয়, তারও চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা।
পুলিশ জানিয়েছে, কিছু দিন আগেও এক বার কেতনকে লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিংয়ের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন সিয়া। তদন্তকারী সূত্রের খবর, সেই সময়েও কেতনকে খুনের পরিকল্পনা ছিল চেতন এবং সিয়ার।
তদন্তে জানা গিয়েছে, সে বার কেতনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। এ ছাড়াও আরও দু’বার খুনের চেষ্টা করা হয়েছিল কেতনকে। কিন্তু তিন বারই ব্যর্থ হন চেতন এবং সিয়া।