American businessperson Charlie Munger is resurfacing, where he strongly warned against Donald Trump dgtl
Charlie Munger
‘দাম্ভিক, ফূর্তিবাজ, জুয়াড়ি ট্রাম্প কুর্সির শেষ বিকল্প’! মৃত রিপাবলিকান ধনকুবেরের মূল্যায়ন হঠাৎ প্রকাশ্যে, শুরু হইচই
মার্কিন ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটের ‘ডানহাত’ বলতে যাঁকে বোঝানো হত সেই মানুষটিই ছিলেন চার্লি মুঙ্গার। হোয়াইট হাউসের জন্য নৈতিক ভাবে যোগ্য নন, ট্রাম্পের প্রতি এমন মূল্যায়ন ছিল প্রয়াত মার্কিন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৩
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৭
বছরের শুরুতেই একের পর এক চমক বিশ্বকে উপহার দিয়ে চলেছেন প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক অভিযান করে সস্ত্রীক ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তাঁর বাসভবন থেকে তুলে আনা। তার পরই স্বশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি পুনরায় উত্থাপন করে আকস্মিক ভাবেই ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং নেটো জোটকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেওয়া। তাঁর একাধিক হুমকি, হুঁশিয়ারির চোটে টালমাটাল বিশ্বের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি।
০২১৭
বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে তিনি যে ভাবে তুর্কিনাচন দেখিয়ে ছাড়ছেন তাতে অনেকেই তিতিবিরক্ত। ট্রাম্পের যে খামখেয়ালিপনা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বিশ্ববাসী, তারই ভবিষ্যদ্বাণী ১৫ বছর আগে করে গিয়েছিলেন এক মার্কিন নাগরিক। ট্রাম্পেরই এক রাজনৈতিক সতীর্থ। প্রথম বার আমেরিকার মসনদের জন্য দৌড়ে শামিল হওয়ার অনেক আগেই ট্রাম্প সম্পর্কে খোলাখুলি মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি আমেরিকান ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, আইনজীবী এবং সমাজসেবী চার্লি মুঙ্গার।
০৩১৭
আমেরিকার সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোগপতি, বিশ্বের ধনীতম সিইওদের মধ্যে এক জন। ওয়ারেন বাফেট। এই বাফেটের ‘ডানহাত’ বলতে যাঁকে বোঝানো হত সেই মানুষটিই ছিলেন মুঙ্গার। পৃথিবীতে যে ক’জন শিল্পপতি রয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেরা বলে মনে করা হয় বাফেটকে। খোদ ওয়ারেন বাফেট ভরসা করতেন এই বিশ্বস্ত সঙ্গীর উপরই।
০৪১৭
আমৃত্যু বাফেটের প্রতিষ্ঠান বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন মুঙ্গার। ২০১১ সালের একটি সাক্ষাৎকারে মুঙ্গার জানিয়েছিলেন, তাঁর মতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদের জন্য অন্তিম বাছাই হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিদ্ধান্তগ্রহণ ও ব্যবস্থাপক হিসাবে পছন্দসই প্রার্থীদের তালিকায় শেষতম ব্যক্তি হতে পারেন ট্রাম্প, এমন ধারণাই পোষণ করতেন মুঙ্গার।
০৫১৭
মুঙ্গার এবং বাফেটের প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯৫৯ সালে ওমাহায় এক বন্ধুর মাধ্যমে। মুঙ্গারের বাবা আইনজীবী ছিলেন এবং তরুণ চার্লি বাফেটের দাদারই একটি মুদি দোকানে কাজ করতেন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর বিমানবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে হার্ভার্ড আইন স্কুল থেকে ‘ম্যাগনা কাম লড’ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিনিয়োগ ব্যবসায় যোগদানের আগে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ওকালতি করতেন।
০৬১৭
পঞ্চাশের দশকে ছানি অস্ত্রোপচার ব্যর্থ হওয়ার পর মুঙ্গার তাঁর বাম চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছিলেন। চিকিৎসকেরা তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ডান চোখও হারাতে পারেন। তাই তিনি ব্রেইল শেখাও শুরু করেন। পরে অবশ্য তার প্রয়োজন পড়েনি। আধুনিক বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন বাফেটের সহযোগী। আবেগ এড়িয়ে যুক্তিসঙ্গত ট্রেডিংয়ের সপক্ষেই চিরদিন সওয়াল করে গিয়েছিলেন তিনি।
০৭১৭
দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও দলীয় সহকর্মীকে নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার কারণ জানতে চাওয়া হলে মুঙ্গের জানিয়েছিলেন, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এমন কিছু ‘গুণাবলি’ রয়েছে যা তাঁকে এই পদের জন্য অযোগ্য করে তুলেছে। দলের সতীর্থ ট্রাম্পকেই সরাসরি দাম্ভিক বলে আখ্যা দিয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই রিপাবলিকান নেতা। হোয়াইট হাউসের জন্য নৈতিক ভাবে যোগ্য নন, ট্রাম্পের প্রতি এমন মূল্যায়ন ছিল প্রয়াত মার্কিন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার।
০৮১৭
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ঠিক আগেই ২০১৬ সালে মুঙ্গার আরও এক বার তাঁর দেশের সর্বোচ্চ পদ নিয়ে নিজের অনুভূতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘আমার মনোভাব হল, যদি কেউ ক্যাসিনো চালিয়ে অর্থ উপার্জন করেন, তিনি নৈতিক ভাবে যোগ্য নন।’’
০৯১৭
তারও আগে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ট্রাম্প সম্পর্কে মুঙ্গারের ধারণা ছিল, তাঁর দলেরই এই নেতা দারুণ অহঙ্কারী ও একটু বেশি রকমের ফূর্তিবাজ। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে অনুপযুক্ত, একসময় পর্যন্ত এই মতই পোষণ করতেন মুঙ্গার। মার্কিন প্রেসিডেন্টের একগুঁয়ে ব্যক্তিত্ব এবং কথা বলার ভঙ্গি নিয়েও নিজের মত ব্যক্ত করেছিলেন অশীতিপর এই বৃদ্ধ ধনকুবের।
১০১৭
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্প ছিলেন আপাদমস্তক ব্যবসায়ী। রিয়্যাল এস্টেটের বিশাল ব্যবসা। কিনতেই তিনি ভালবাসেন। সে আকাশচুম্বী বাড়িই হোক বা ক্যাসিনো। নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিতে সেই ‘ট্রাম্প তাজমহল ক্যাসিনো’ অনেকটা তাজমহলের আদলেই তৈরি হয়েছিল। সেই ক্যাসিনো অবশ্য চলেনি। দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পরে বেশ কয়েক বার হাতবদল শেষে তাজমহল ক্যাসিনো নামমাত্র দরে বিক্রি হয়ে যায়। সেই নিয়ে অবশ্য ট্রাম্পের বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। কারণ তত দিনে তিনি হোয়াইট হাউস দখল করে নিয়েছিলেন।
১১১৭
প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার আগে নিজেকে ধনকুবের ব্যবসায়ী বলে দাবি করে নজর কেড়েছিলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প-বিরোধীদের বক্তব্য, আমেরিকার সর্বময় কর্তার আসনদখলের পরও নিজের ব্যবসায়িক সত্তার খোলস ঝেড়ে ফেলতে পারেননি ট্রাম্প। ২০১৯ সাল থেকেই তাঁর নজর ছিল গ্রিনল্যান্ডের উপর। বিশুদ্ধ পানীয় জল, সি-ফুড এবং বিপুল খনিজ সম্পদের লোভ কি সহজে ছাড়া যায়, মত ট্রাম্প-নিন্দকদের।
১২১৭
জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপটি দখল করার ছক কষছেন তিনি বলে সুর চড়িয়েছে বিরোধীরা। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণাও করেছে যে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কিছু দেশের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে তারা। ১ জুন থেকে তা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি গ্রিনল্যান্ড কেনা বা অধিগ্রহণ বিষয়ে কোনও চুক্তিতে তখনও না পৌঁছোনো যায়। এই শুল্ক-‘শাস্তি’র তালিকায় ডেনমার্ক ছাড়াও রয়েছে ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন এবং ব্রিটেনের মতো নেটো-ভুক্ত দেশগুলি।
১৩১৭
২০১৬-র ৭ নভেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পপুলার ভোটে হেরেও ইলেক্টোরাল কলেজের বদান্যতায় ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হলেন, তখন বহু লোকই মনে করেছিলেন যে পৃথিবীর সুখের দিন বুঝি শেষ হল। সেই একই সুরে সুর মিলিয়ে মুঙ্গারকেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শোনা গিয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে মিশেছিল প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গও। ট্রাম্প কুর্সিতে আসীন হওয়ার পরও নরমে গরমে মুঙ্গার তাঁর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছিলেন।
১৪১৭
সুদের হার নিয়ে ফেডারেল রিজ়ার্ভ চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মুঙ্গার। সুদের হার খুব কম রাখার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। ট্রাম্পের পক্ষপাতদুষ্ট স্বভাব নিয়েও দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন এই উদ্যোগপতি। তিনি মনে করতেন এই ধরনের ব্যক্তিরা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বহু দূর যেতে পারেন। মুঙ্গার মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘উভয় পক্ষই এখন এতটাই পক্ষপাতদুষ্ট যে তাঁরা ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছেন।’’
১৫১৭
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ট্রাম্প মসনদ দখল করার মাত্র এক মাস পর নিজের মত থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছিলেন মু্ঙ্গার। ডেলি জার্নাল কর্পোরেশনের বার্ষিক সভায় একটি অদ্ভুত বিবৃতি দিতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি আরও শান্ত হয়েছি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সব কিছুই ভুল নয়। কেবল তিনি আমাদের মতো নন বলেই, তাঁকে ভুল বোঝা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে মানিয়ে নিন। আর যদি একটু বিপদ হয়, তা হলে বেশি আর কী হবে, আপনি চিরকাল তো আর বেঁচে থাকবেন না।’’
১৬১৭
আবার ২০১৯ সালে একটি সাক্ষাৎকারে এসে ট্রাম্পের অভিবাসন সংক্রান্ত নীতির প্রশংসা শোনা গিয়েছিল বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের কর্তার গলায়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন’ বলে মন্তব্য করেন মুঙ্গার। যদিও কয়েক বছর আগে তিনি জানিয়েছিলেন ট্রাম্পের এমন কিছু গুণাবলি রয়েছে যা তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদে জন্য ‘অযোগ্য’ করে তুলেছে।
১৭১৭
২০২৩ সালের নভেম্বরে ৯৯ বছর বয়সে মারা যান মুঙ্গার। তার ১ বছর দু’মাসের মাথায় দ্বিতীয় বারের জন্য আমেরিকার শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য এখনও প্রাসঙ্গিক রয়ে গিয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।