পুত্রকে হাড়ে হাড়ে চিনতেন খামেনেই, নিজেই চাননি কট্টরপন্থী মোজতবার হাতে যাক ইরানের শাসনভার! কার চাপে ঘুরল খেলা?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর পুত্র মোজ়তবা। এই পুত্রকে রাজনীতির ‘কানা গলি’তে কখনওই আনতে চাননি ওই শিয়া ধর্মগুরু। তবে পশ্চিমি দুনিয়ার দাবি, বাবার চেয়ে বেশি কট্টরপন্থী বছর ৫৬-র মোজতবা।
শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে হারিয়ে দমে যায়নি ইরান। উল্টে দ্বিগুণ উৎসাহে মার্কিন সেনাঘাঁটি এবং ইজ়রায়েলি শহরগুলিকে নিশানা করছে তেহরান। পাশাপাশি, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ় প্রণালী বন্ধ রেখেছে সাবেক পারস্যের ফৌজ। এই রণকৌশলে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করতে চাইছে তারা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছেন খামেনেই-পুত্র মোজতবা।
৯ মার্চ বছর ৫৬-এর মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নেয় ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’। এর পরই তাঁর নামে জোড়া শত্রুর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে সুপ্রিম লিডারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। ইতিমধ্যেই সেই দৃশ্য সরকারি টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত করেছে তেহরান। ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে লেখা ছিল ‘আপনার সেবায়, সৈয়দ মোজতবা’। তবে ওই দিনই তাঁর ‘মৃত্যুকামনা’ করে সাবেক পারস্যের আনাচ-কানাচে ওঠে স্লোগানও।
তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কুর্সি পেয়েছেন মোজতবা। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তেহরানকে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে তাঁকে। সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে কতটা আলাদা মোজ়তবা? আলি খামেনেইয়ের ছায়া থেকে কি বেরিয়ে আসতে পারবেন না এই কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরু? সংশ্লিষ্ট বিতর্কে বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত বিশ্ব।
মোজতবা খামেনেই সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ইরানি শাসনব্যবস্থার শীর্ষে বসতেই নতুন বিতর্ক প্রকাশ্যে এনেছে পশ্চিমি গণমাধ্যম। তাদের দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের প্রভাব বজায় রাখতে কিছুটা ‘মধ্যপন্থা’ নিয়ে চলছিলেন আলি খামেনেই। কিন্তু, বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে তাঁর পুত্র সেই রাস্তায় হাঁটার বান্দা নন। উল্টে মোজতবার আমলে আরও বেশি করে কট্টরপন্থাকে আঁকড়ে ধরতে পারে তেহরান। তবে বাবার মতো প্রশাসন পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। সেটা সাবেক পারস্যের নতুন সর্বোচ্চ নেতার জন্য যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলাই বাহুল্য।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর তেহরানে ‘ইসলামীয় প্রজ়াতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা হলে দেশটির সুপ্রিম লিডার হন আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি। তাঁর অধীনে দীর্ঘ দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন আলি খামেনেই। বিপ্লবের পরের বছরই (পড়ুন ১৯৮০ সাল) সাবেক পারস্য আক্রমণ করে বসেন প্রতিবেশী ইরাকের কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। সেই লড়াই টানা আট বছর চলেছিল। ওই সময় দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে রাতারাতি আমজনতার ‘নয়নের মণি’ হয়ে যান মোজতবার বাবা।
আরও পড়ুন:
১৯৮১ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের মধ্যেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান আলি খামেনেই। পরবর্তী আট বছর ওই পদে ছিলেন তিনি। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লার মৃত্যু হলে তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে বেছে নেয় তেহরানের কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের সরকারি প্রতিষ্ঠান। সেই নিয়োগও ছিল বেশ বিতর্কিত। কারণ, আয়াতোল্লাহ বা সুপ্রিম লিডার হওয়ার মতো কোনও যোগ্যতাই ছিল না মোজতবার বাবার। ফলে কুর্সিতে বসে বহু কিছু সংশোধনে বাধ্য হন তিনি, জানিয়েছেন ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মাবন।
বিশ্লেষকেরা অবশ্য ইতিমধ্যেই পিতা-পুত্রের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। প্রথমত, ইসলামীয় বিপ্লব, ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ, প্রেসিডেন্ট কিংবা সর্বোচ্চ নেতা থাকাকালীন ইরানি জনগণের সঙ্গে অনেকটাই মিশে ছিলেন খামেনেই। অন্য দিকে বরাবরই পর্দার আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন মোজতবা। তাঁকে এখনও পর্যন্ত কোনও বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যায়নি। তাঁর খুব কম ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ্য এসেছে। ২০০০ সালের শেষের দিকে তাঁকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসে বহুজাতিক অনলাইন মিডিয়া সংস্থা উইকিলিক্স।
মোজতবা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনে উইকিলিক্স লিখেছিল, খামেনেই-পুত্রের হাতে আছে তেহরানের ‘প্রাণভোমরা’। সাবেক পারস্যের ‘পর্দার পিছনের শক্তি’ তিনি। ইরানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে ‘সক্ষম’ এবং ‘বলশালী’ হলেন মোজ়তবা। ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম বার তাঁর রাজনৈতিক বুৎপত্তির পরিচয় পায় ওই উপসাগরীয় শিয়া মুলুক। ভোটে প্রভাব খাটিয়ে কট্টরপন্থী মাহমুদ আহমাদিনেজ়াদকে ক্ষমতায় আনেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনের শেষে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।
২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট ভোটে প্রার্থী ছিলেন সংস্কারপন্থী ও উদারনৈতিক নেতা মেহেদি কাররুবি। নির্বাচনের শেষে খামেনেই-পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তিনি। বলেন, ‘‘আহমাদিনেজ়াদকে জেতাতে আইআরজিসি এবং বাসিজ় ভাড়াটে বাহিনীকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছেন মোজতবা। শুধু তা-ই নয়, একাধিক ধর্মীয় সংগঠনের হাতে মোটা টাকাও গুঁজে দেন তাঁর অনুগামীরা।’’ চার বছরের মাথায় আহমাদিনেজ়াদ পুনর্নির্বাচিত হলে দেশ জুড়ে শুরু হয় গণবিক্ষোভ। নির্দয় ভাবে তা দমন করেন খামেনেই-পুত্র।
আরও পড়ুন:
এই ঘটনার জেরে মোজতবার রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে তীব্র আপত্তি জানায় তেহরানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন মহল। জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্ট আবার জানিয়েছে, ছেলে সর্বোচ্চ নেতার কুর্সিতে বসুক, তা নাকি চাননি স্বয়ং আলি খামেনেই। নিজের ইচ্ছাপত্রে সেই উল্লেখও করেছেন তিনি। কিন্তু মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা করতে চাপ দেয় আইআরজিসি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের সামনে শেষ পর্যন্ত মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে ইরানি ধর্মগুরুদের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’।
এই ইস্যুতে নিউ ইয়র্ক পোস্টের কাছে মুখ খুলেছেন ইরানি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত তথা বিরোধী দল ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্র্যাসির রিসার্চ ডিরেক্টর খোসরো ইসফাহানি। তাঁর কথায়, ‘‘ইচ্ছাপত্রে আলি খামেনেই লিখেছেন, মোজ়তবাকে কখনওই তাঁর উত্তরসূরি মনোনীত করা যাবে না। কারণ তিনি দুর্বল তরুণ শিয়া ধর্মগুরু। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বলে কিছু নেই। বাবার পরিচয় সরিয়ে নিলে সাবেক পারস্যের আমজনতার কাছে মোজতবার কোনও অস্তিত্ব নেই।’’
আলি খামেনেইয়ের এ-হেন ইচ্ছাপত্র করার নেপথ্যে অবশ্য অন্য যুক্তিও রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামীয় বিপ্লবের একটি কারণ ছিল পরিবারতান্ত্রিক রাজশাহির বিরোধিতা। সর্বোচ্চ নেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে সেটা আবার ফিরুক, তা চাননি রুহুল্লার ভাবশিষ্য। তাই মোজতবাকে তেহরানের ঘরোয়া রাজনীতি থেকে বরাবর দূরে রেখেছিলেন তিনি। যদিও ধর্মশিক্ষার পর আইআরজিসির সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন খামেনেই-পুত্র। বাহিনীর সঙ্গে থাকার দৌলতে বাবার মতোই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হচ্ছে তাঁর।
সর্বোচ্চ নেতা পদে মোজতবার নির্বাচন প্রক্রিয়া আবার নিউ ইয়র্ক পোস্টের কাছে ফাঁস করেছেন ইসফাহানি। একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে তিনি জানিয়েছেন, ‘‘সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট খামেনেই-পুত্র পাননি। শেষে আইআরজিসির চাপে বেশ কয়েক জন ধর্মগুরু অধিবেশন বয়কট করেন। এর পর আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁকে ওই পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়।’’
সামরিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, আইআরজিসির দিক থেকে মোজতবাকে সমর্থন করার নেপথ্যে মূলত দু’টি কারণ রয়েছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে খামেনেইয়ের নামে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বাহিনীকে উজ্জীবিত রাখতে পারবে তারা। দ্বিতীয়ত, অন্য কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের তুলনায় তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ।
এ ব্যাপারে একটি প্রশ্নের উত্তর ইসফাহানি বলেছেন, ‘‘আইআরজিসির কাছে মোজতবা হলেন সাদা ক্যানভাস। সেখানে যে কোনও ছবি আঁকা যেতে পারে। যেমন খুশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুবিধা রয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট লড়াইকে দীর্ঘায়িত করার ছক কষছে তারা। অন্য কোনও শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে সেই পরিকল্পনা করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন।’’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে মোজতবার নাম ঘোষণা হতেই হুঁশিয়ারি দেয় ইজ়রায়েল। তেল আভিভ জানিয়েছে, ওই পদে যিনি বসুন না কেন তাঁকে রেয়াত করবে না ইহুদি ফৌজ। তাই সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের কিছু ক্ষণের মধ্যেই তেহরানে বোমাবর্ষণ করে ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী। তাতে মোজতবা আহত হয়েছেন বলে খবরও ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেটাকে ভুয়ো তথ্য বলে উড়িয়ে দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়শকিয়ানের পুত্র ইউসুফ।
বর্তমানে তেহরান প্রশাসনের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করছেন ইউসুফ পেজ়কশিয়ান। গত ১১ মার্চ সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, ‘‘সর্বোচ্চ নেতা আহত হয়েছেন, এই খবরটা আমার কানে আসায় তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েক জনের কাছে খবর নিই। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন, মোজতবা খামেনেই সুস্থ এবং সুরক্ষিতই আছেন। মিথ্যা খবর ছড়ানো বন্ধ করুক ইজ়রায়েল।’’ যদিও সূত্রের খবর ইহুদি হামলায় পা বাদ গিয়েছে মোজ়তবার। তাঁর অবস্থা সঙ্কটজনক।
খামেনেই-পুত্রের উত্থান নিয়ে ‘বিরক্তি’ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘‘ইরানবাসীর শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য মোজ়তবা গ্রহণযোগ্য নন। আমি এমন একজনকে জানি, যিনি এটা করতে পারবেন।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের পর আমেরিকাকে চরম শিক্ষা দেওয়ার পাল্টা হুমকি দিয়েছে তেহরান।