প্রেক্ষাগৃহের বাইরে থাকত অ্যাম্বুল্যান্স! যে ভূতের ছবি একা দেখতে পারলেই দর্শক পেতেন ১০ হাজার টাকার পুরস্কার
কম বাজেটে কী ভাবে বড় মাপের বিনোদন দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন ছবিনির্মাতারা। কানাঘুষো শোনা যায়, যখন কোনও ছবির শুটিং শুরু হত, তখন পুরো পরিবারই শুটিং স্পটে পৌঁছে যেত। ছবিনির্মাতাদের স্ত্রীরাও মেকআপ এবং পোশাক বাছাইয়ের কাজে সাহায্য করতেন।
হরর ঘরানার ছবি বললেই এক কথায় হলিউড! বলিউডের দুর্বল চিত্রনাট্য এবং চড়া মেকআপের কারণে ভূতের হিন্দি ছবি থেকে নাকি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দর্শক। অথচ সত্তরের দশকে এমন একটি বলিউডি ভূতের ছবি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল, অর্থের প্রলোভনেও যে ছবি একা দেখার সাহস দেখাতেন না দর্শক।
বলিউডে হরর ঘরানার উল্লেখ করতেই যে নামটি সবার আগে মনে পড়ে, তা হল ‘রামসে ব্রাদার্স’। সত্তরের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত ভারতীয় দর্শকের মনে এক গভীর আতঙ্কের ছাপ ফেলেছিল ‘রামসে ব্রাদার্স’-এর প্রযোজনা সংস্থা।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, রামসেরা সাত ভাই মিলে এই প্রযোজনা সংস্থার দায়িত্ব পালন করতেন। কোনও ছবি নির্মাণের সময় সাধারণত বাইরের লোকের উপর বিশেষ নির্ভর করতেন না তাঁরা। সাত ভাই মিলে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি ভাগাভাগি করে নিয়ে ছবি তৈরি করতেন।
ছবি পরিচালনার দায়িত্বে থাকতেন তুলসী এবং শ্যাম রামসে। চিত্রনাট্যকারের দায়িত্ব পালন করতেন কুমার রামসে। চিত্রগ্রহণের দায়িত্ব থাকত গাঙ্গু রামসের উপর।
শব্দনির্মাণ এবং সাজসজ্জার দায়িত্বে থাকতেন কিরণ রামসে। ছবি সম্পাদনা করতেন অর্জুন রামসে। প্রযোজনা এবং আলোকসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন কেশু রামসে। চলচ্চিত্রনির্মাণের প্রতি সাত ভাইয়ের নিষ্ঠাও ছিল প্রশংসনীয়।
আরও পড়ুন:
১৯৭০ সালে রামসে ব্রাদার্সের প্রথম ছবি মুক্তি পায়— ‘এক নন্হী মুন্নী লড়কী থী’। ছবিটি বক্সঅফিসে ব্যবসা করতে সফল না হলেও তার ভয়ধরানো দৃশ্যের প্রতিক্রিয়া দর্শকের মনে বহু দিন ধরে বজায় ছিল। তা দেখে শুধুমাত্র হরর ঘরানার ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন সাত ভাই।
কম বাজেটে কী ভাবে বড় মাপের বিনোদন দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন রামসেরা। কানাঘুষো শোনা যায়, যখন কোনও ছবির শুটিং শুরু হত, তখন রামসের পুরো পরিবারই শুটিং স্পটে পৌঁছে যেত। সাত ভাইয়ের স্ত্রীরাও মেকআপ এবং পোশাক বাছাইয়ের কাজে সাহায্য করতেন।
সাড়ে তিন লক্ষ টাকা খরচ করে রামসে ব্রাদার্স তাঁদের কেরিয়ারের দ্বিতীয় ছবি তৈরি করেছিলেন। ১৯৭২ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘দো গজ় জ়মীন কে নীচে’। হরর ঘরানার এই ছবি বক্সঅফিসে দুর্দান্ত ব্যবসা করে। তার পর থেকেই রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন রামসেরা।
‘পুরানা মন্দির’, ‘বীরানা’, ‘বন্দ দরওয়াজ়া’, ‘তহখানা’র মতো হরর ঘরানার বহু হিন্দি ছবি তৈরি করেছিলেন রামসেরা। তাঁদের ছবির বিশেষত্ব ছিল পুরনো ভাঙা কেল্লা, জঙ্গল এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। ছমছমে আবহসঙ্গীতও আলাদা ভাবে নজর কাড়ত।
আরও পড়ুন:
সত্তরের দশকে উন্নত মানের গ্রাফিক্স ব্যবহার করে বড়পর্দায় ‘ভূত’ দেখানো যেত না ঠিকই। তার পরিবর্তে নকল রক্ত, রবারের মুখোশ এবং ভয়ঙ্কর মেকআপের উপরেই ভরসা রাখতে হত। তাতেও রামসে ব্রাদার্সের ছবি দেখতে গেলে ভয়ে আঁতকে উঠতেন দর্শক।
১৯৭৮ সালে তুলসী এবং শ্যামের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ‘দরওয়াজ়া’। বলিউডের রূপটানশিল্পীর পাশাপাশি এই ছবিতে কাজ করেছিলেন এক বিদেশি রূপটানশিল্পী।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ভূতের মেকআপ যেন নজরকাড়া এবং ভয়ঙ্কর হয় তা চাইছিলেন ছবিনির্মাতারা। রূপটানশিল্পী ক্রিস্টোফার টাকার থাকতেন লন্ডনে। ক্রিস্টোফারের সঙ্গে দেখা করার জন্য মুম্বই থেকে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন ছবিনির্মাতারা।
ছবির বাজেট কম, অথচ ‘ভূতের’ মেকআপ হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য। ক্রিস্টোফারের কাছে এমন দাবি জানিয়েছিলেন ছবিনির্মাতারা। তাঁদের অনুরোধ ফেলতে পারেননি বিদেশি রূপটানশিল্পী। এক কথায় রাজি হয়ে চলে গিয়েছিলেন মুম্বই। কানাঘুষো শোনা যায়, ক্রিস্টোফারকে তাঁর প্রাপ্য পারিশ্রমিক পাউন্ডেই দিয়েছিলেন রামসেরা।
১৯৭৮ সালে ‘দরওয়াজ়া’ ছবিটি মুক্তি পেলে বক্সঅফিসে সাফল্যের বন্যা বয়ে যায়। মুক্তির দিন কয়েকের মধ্যেই প্রচুর ব্যবসা করে ফেলে ছবিটি। ‘দরওয়াজ়া’ দেখে দর্শক এত ভয় পেয়েছিলেন যে, একা একা দেখতে যাওয়ার সাহসই দেখাতেন না কেউ।
বলিপাড়ার একাংশের দাবি, ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরেরা দর্শকের উদ্দেশে বিশেষ প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। ‘দরওয়াজ়া’ ছবিটি একা একা প্রেক্ষাগৃহে দেখতে পারলেই সেই দর্শককে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু অর্থের প্রলোভনেও নাকি কোনও দর্শকই পা দেননি।
পাছে ‘দরওয়াজ়া’ দেখতে দেখতে কোনও দর্শক ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন, সে কারণে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে সব সময় অ্যাম্বুল্যান্স রাখা থাকত। ছবির ভয়াবহতা এমন সাড়া ফেলেছিল যে, পোস্টারে লেখা থাকত, ‘ভারতের প্রথম বক্সঅফিস কাঁপানো ভয়ঙ্কর ছবি।’