China bans on dual use goods export to Japan, may create new flashpoint in Indo Pacific region dgtl
China Japan Conflict
সামরিক-অসামরিক দুই কাজের পণ্য রফতানিই বন্ধ, নতুন ফ্রন্টে ‘সামুরাই- যোদ্ধা’দের টুঁটি চেপে ধরছে ড্রাগন!
দ্বৈত কাজে ব্যবহার হয় এমন পণ্যের জাপানে রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিল চিনের শি জিনপিঙের সরকার। এই বাণিজ্যিক ‘ব্ল্যাকমেলে’ তীব্র হচ্ছে বেজিং-টোকিয়ো সংঘাত।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:১৩
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশে ঘনাচ্ছে অশান্তির কালো মেঘ। ফের মুখোমুখি সংঘাতে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না) ও জাপান। তবে কোনও কামান-বন্দুক-রকেট লঞ্চার নিয়ে নয়। টোকিয়োর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক লড়াইয়ের নতুন ফ্রন্ট খুলেছে বেজিং। আর তাতে গরম হচ্ছে সেখানকার পরিস্থিতি, যা আগামী দিনে যুদ্ধের বিউগল বাজাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।
০২১৮
চলতি বছরের গোড়াতেই জাপানে দ্বৈত কাজে ব্যবহৃত পণ্যের রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে চিন। এতে যথেষ্ট বিপদের মুখে পড়েছে টোকিয়োর শিল্পোৎপাদন। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির জন্য ‘সূর্যোদয়ের দেশ’টিকে যে অন্য কিছু ভাবতে হবে, তা একরকম স্পষ্ট। পাশাপাশি প্রভাবিত হতে পারে সফটঅয়্যার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম নির্মাণও, যার জেরে বেজিঙের এ-হেন ‘খামখেয়ালিপনা’র বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে ‘সামুরাই যোদ্ধা’দের সরকার।
০৩১৮
এখন প্রশ্ন হল, দ্বৈত কাজে ব্যবহৃত পণ্য কোনগুলি? বর্তমানে পৃথিবীতে এমন কিছু ধাতু এবং রাসায়নিক আছে যেটা অসামরিক এবং সামরিক দু’টি ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়ে থাকে। এগুলিই দ্বৈত কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী হিসাবে চিহ্নিত। চিনের দাবি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে জোর দিয়েছে জাপান। সেই কারণেই ওই ধরনের সংবেদনশীল পণ্যের রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে বেজিং।
০৪১৮
এ বছরের জানুয়ারিতে জাপানি শিল্পপতিদের একটি দলের ড্রাগনভূমিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাত্রার কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই তাঁদের ভিসা বাতিল করে বেজিং, যার জেরে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে টোকিয়োর শুরু হয় চাপানউতোর। ঠিক তার পরেই দ্বৈত কাজে ব্যবহৃত পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় মান্দারিনভাষী প্রশাসন। ফলে এই ইস্যুতে যে ‘জলঘোলা’ হতে শুরু করেছে, তা মানছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরাও।
০৫১৮
বেজিঙের এ-হেন বাণিজ্যিক ‘ব্ল্যাকমেল’কে জাপানের উপর চাপ তৈরির পুরনো কৌশল বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। চৈনিক কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিসি (কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না) নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম পিএলএ-র ডেইলি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দিনে টোকিয়োতে বিরল খনিজের রফতানির উপর রাশ টানার ব্যাপারে ইতিমধ্যেই চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। এর মাধ্যমে ‘সামুরাই যোদ্ধা’দের উৎপাদন ব্যবস্থার কফিনে যে তিনি শেষ পেরেক পুঁততে চাইছেন, তা বলাই বাহুল্য।
০৬১৮
২০১০ সালে হঠাৎ করেই তিন মাসের জন্য জাপানে বিরল খনিজের রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় চিন। এতে সর্বাধিক লোকসানের মুখে পড়ে টোকিয়োর গাড়ি নির্মাণ শিল্প। ওই সময় থেকেই বিকল্প উৎসের সন্ধানে মরিয়া ছিল ‘সূর্যোদয়ের দেশ’। কিন্তু তার পরেও বিরল খনিজের ব্যাপারে তারা ড্রাগনের উপর নির্ভরশীলতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখনও ওই ধাতুগুলির ৬০ শতাংশই মান্দারিনভাষীদের থেকে কিনে থাকে ‘সামুরাই যোদ্ধা’রা।
০৭১৮
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন জাপানি গবেষণা সংস্থা ‘নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর অর্থনীতির অধ্যাপক তাকাহিদে কিউচি। তাঁর দাবি, ২০১০ সালে বিরল খনিজের উপরে বেজিঙের নিষেধাজ্ঞার জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টোকিয়োর লোকসানের অঙ্ক দাঁড়িয়েছিল ৬৬ হাজার ইয়েন। মার্কিন মুদ্রায় যেটা প্রায় ৪২১ কোটি ডলার। এর জেরে ওই বছর মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) ০.১১ শতাংশ হ্রাস পায়।
০৮১৮
কিউচি মনে করেন, বিরল খনিজ রফতানির নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্ট শি এক বছর দীর্ঘায়িত করলে ০.৪৩ শতাংশ কমবে জাপানের জিডিপির সূচক। গত বছরের নভেম্বরে বেজিঙের থেকে ৩০৫ টন বিরল ধাতু আমদানি করে টোকিয়ো। ফলে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় ড্রাগনের রফতানি বাণিজ্য, যা ২০২৪ সালের নিরিখে সর্বোচ্চ। এককথায় চিনের হাতে যে ‘সামুরাই যোদ্ধা’দের শ্বাসনালিতে ছুরি রাখার সুযোগ রয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
০৯১৮
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দ্বৈত কাজে ব্যবহৃত পণ্যের রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি জাপানের প্রতিরক্ষা খাতে রেকর্ড পরিমাণ ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেজিং। গত বছরের (২০২৫ সালের) ডিসেম্বরে সামরিক খরচ ন’লক্ষ কোটি ইয়েন করার কথা একরকম ঘোষণা করে দেয় টোকিয়ো। ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৫,৭০০ কোটি ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্রের, যেটা ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ বেশি।
১০১৮
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বেজিং-টোকিয়ো সংঘাতের সূত্রপাত হয় গত বছরের ৭ নভেম্বর। ওই দিন সাবেক ফরমোজা দ্বীপ তথা তাইওয়ানকে (রিপাবলিক অফ চায়না) নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। তিনি বলেন, ‘‘ড্রাগন যদি ওই দ্বীপরাষ্ট্র দখলের চেষ্টা করে তা হলে চুপ করে বসে থাকবে না টোকিয়ো। প্রয়োজনে তাইওয়ানকে সামরিক সাহায্য করা হবে।’’ তাঁর ওই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই হুঁশিয়ারি দেয় ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি-র সরকার।
১১১৮
দীর্ঘ দিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে চিন। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটিকে স্বাধীন স্বতস্ত্র দেশ বলে মানতে নারাজ বেজিং। এ-হেন ফরমোজ়া দ্বীপ নিয়ে জাপানি প্রধানমন্ত্রী বিস্ফোরক বিবৃতি দেওয়ার এক দিনের মাথায় (৮ নভেম্বর, ২০২৫) উপকূলরক্ষী বাহিনীর রণতরী পাঠিয়ে টোকিয়োর সেনকাকু দ্বীপ ঘিরে ফেলে ড্রাগন। পরে অবশ্য সেখান থেকে সরে যায় তারা। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটির নতুন নামকরণ করেছে জিনপিং প্রশাসন, আর সেটা হল দিয়াওয়ু।
১২১৮
মান্দারিনভাষীদের অভিযোগ, অন্যায় ভাবে ওই দ্বীপ দখল করে রেখেছে ‘সামুরাই যোদ্ধারা’। মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই চিনা হানাদারি ঠেকাতে তাইওয়ানের উপকূল থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইয়োনাগুনি দ্বীপে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে জাপানি ফৌজ। ফলে সুর চড়ায় বেজিংও। হুঁশিয়ারির সুরে জিনপিঙ প্রশাসন জানিয়ে দেয়, ‘‘টোকিয়ো যদি তাইওয়ানে হস্তক্ষেপ করে, তা হলে পুরো জাপান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।’’
১৩১৮
গত ডিসেম্বরে জাপানের দক্ষিণের প্রশাসনিক এলাকা ওকিনাওয়াতে ‘আগ্রাসী’ মনোভাব দেখায় চিনের পিএলএ নৌবাহিনী। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্বে মোতায়েন ছিল লিয়াওনিং নামের তাঁদের একটি বিমানবাহী রণতরী। সেখান থেকে জে-১৫ লড়াকু জেট উড়ে এসে টোকিয়ো বায়ুসেনার একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে রেডার-লক করে ফেলে লালফৌজ। ফলে জেটটির উপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত কোনও বিপদ ঘটেনি।
১৪১৮
এখন প্রশ্ন হল কী এই ‘রেডার লক’? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতিটি যুদ্ধবিমানের ককপিটে থাকে একাধির সেন্সর এবং রেডার। এগুলির সাহায্যেই মাঝ-আকাশে লড়াই চালান পাইলট। ককপিটের রেডার শত্রুর জেটকে চিহ্নিত করে তার উপর নিশানা করতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিতে মাঝ-আকাশে বিপক্ষের যুদ্ধবিমানের উপর নিশানা ঠিক করাকেই বলে ‘রেডার লক’। এক বার তা হয়ে গেলে অনায়াসে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সংশ্লিষ্ট জেটকে উড়িয়ে দিতে পারেন ককপিটের যোদ্ধা-পাইলট।
১৫১৮
জাপানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, গত ৬ ডিসেম্বর ওকিনাওয়া দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় রুটিন টহলদারি চালাচ্ছিল তাদের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান। ওই সময় অন্তত দু’বার টোকিয়োর এফ-১৫ জেটকে ‘রেডার লক’ করে চৈনিক নৌবাহিনীর জে-১৫। প্রথম ঘটনাটি ঘটে বিকেল ৪টে ৩২ থেকে ৪টে ৩৫ মিনিটের মধ্যে। আর দ্বিতীয় বার সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ থেকে ৭টা ৭ মিনিটের মধ্যে সামুরাই যুদ্ধবিমানের উপর পিএলএ পাইলট নিশানা করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
১৬১৮
এই ঘটনার পর ৭ ডিসেম্বর টোকিয়োয় মোতায়েন চিনা রাষ্ট্রদূত উ জিয়াংহাওকে তলব করে জাপান সরকার। পরে এই বিষয়ে বিবৃতি দেয় বেজিং। সেখানে অবশ্য যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছে ড্রাগন। তাদের দাবি, ইচ্ছাকৃত ভাবে পিএলএ-র বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়াচ্ছে জাপান। তাদের বিরুদ্ধে কোনও আগ্রাসন দেখানো হয়নি। উল্টে নিয়ম ভেঙে তাদের বিমানবাহী রণতরীর কাছেই নাকি এগিয়ে এসেছিল জাপানি জেট।
১৭১৮
বেজিঙের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য ছিল, ‘‘লিয়াওনিং বিমানবাহী যুদ্ধপোত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন পিএলএ নৌবাহিনীর পাইলটেরা। তখন হঠাৎ করে সংশ্লিষ্ট রণতরীটির খুব কাছে চলে আসে জাপানি জেট। দেখে মনে হয়েছিল, আক্রমণ শানাতে চাইছে তারা। সেই কারণেই টোকিয়োর যুদ্ধবিমানকে ‘রেডার লক’ করা হয়। তবে তাদের উপর কোনও রকমের হামলা চালানো হয়নি।’’ এই যুক্তিতে আগ্রাসনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে পাল্টা বিবৃতিতে সুর চড়ায় ড্রাগন সরকার।
১৮১৮
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক তাস খেলে জাপানি প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির উপর ঘরে-বাইরে চাপ তৈরি করতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট শি। তবে বেজিঙের এই চাল বাস্তবে কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে। কারণ তাইওয়ান ইস্যুতে কোনও অবস্থাতেই মত বদলাতে রাজি নয় বেজিং। পাশাপাশি, ড্রাগনের ‘ব্ল্যাকমেল’ ঘরের মাটিতে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে বলেই খবর পাওয়া গিয়েছে।