উগান্ডায় ‘গৃহযুদ্ধ’! এলাকা দখলের লক্ষ্যে ভয়াবহ সংঘাত শিম্পাঞ্জিদের দুই দলের! উদ্বেগে বিজ্ঞানীরাও
গবেষকদের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিমি দলের শিম্পাঞ্জিরা মধ্যাঞ্চলীয় দলের অন্তত সাতটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং ১৭টি শাবককে হত্যা করেছে। একই সময়ে, মধ্যাঞ্চলীয় দলের ১৪ জন কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জি নিখোঁজ হয়ে যায়।
উগান্ডায় ‘গৃহযুদ্ধ’! তবে সরকার বা সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে নয়, পশ্চিম উগান্ডার কিবালে জাতীয় উদ্যানে ‘গৃহযুদ্ধে’ মেতেছে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী শিম্পাঞ্জির দল। এলাকা দখলের জন্য ভয়াবহ সংঘাত শুরু হয়েছে দু’পক্ষের মধ্যে। তেমনটাই উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
১৯৯৫ সাল থেকে নোগোগো শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়কে নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের বিজ্ঞানীদের দাবি, এ রকম সংঘর্ষ তাঁরা আগে কখনও দেখেননি।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতে, একসময় ১০০টিরও বেশি সদস্যের এই শিম্পাঞ্জিদের দলটি বন্য পরিবেশে নথিভুক্ত সর্ববৃহৎ দলগুলোর মধ্যে অন্যতম।
প্রায় এক দশক আগে বিশাল শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়টি দু’টি পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে যায়। তার পর থেকেই এই দলগুলো এলাকা দখল নিয়ে এক ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে। সম্প্রতি সেই সংঘাত মাত্রা ছাড়িয়েছে।
বিষয়টি প্রসঙ্গে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইমাটোলজিস্ট জন মিতানি বলেন, ‘‘নোগোগো শিম্পাঞ্জিরা তাদের নিজেদের সাফল্যেরই শিকার। দলটি ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সদস্যেরা আর একত্রিত থাকতে পারছিল না।’’
আরও পড়ুন:
নোগোগো দলের পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা বছরের পর বছর ধরে শক্তিশালী জোট গঠনের জন্য পরিচিত ছিল একসময়। দলবদ্ধ ভাবে শিকার করত তারা। এলাকা পাহারা দিত এক হয়ে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটির সদস্যসংখ্যা বেড়ে যায়। গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০০-তে। এর পর সব সময় একসঙ্গে থাকার পরিবর্তে খাবারের সন্ধানে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যায় তারা। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বনে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে।
তবে ছোট ছোট দলগুলি আবার যখন মিলিত হত, তারা মারামারি করত না। বরং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করত। একে অপরের শরীর পরিষ্কার করে দেওয়া, একসঙ্গে বিশ্রাম নেওয়া এবং একটি বড় পরিবারের মতো মিলেমিশে থাকা— এই ছিল তাদের স্বভাব।
এমনকি, একটি নোগোগো সম্প্রদায়ের শিম্পাঞ্জি এক দিনে একাধিক বার দল পরিবর্তন করে অন্য দলে যেতে পারত। তবে এই শিম্পাঞ্জি দলগুলির মধ্যে একটি প্রধান দলও থাকত।
আরও পড়ুন:
নোগোগো শিম্পাঞ্জিরা তাদের বেশির ভাগ সময় কোথায় কাটাত তার উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এদের তিনটি দলে ভাগ করেন—পশ্চিম, মধ্য এবং পূর্ব। কিন্তু ২০১৫ সালে, যখন মধ্য দলটি পশ্চিম দলের মুখোমুখি হয়, তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানী মিতানির কথায়, ‘‘শিম্পাঞ্জিরা জোরে চিৎকার করতে এবং একে অপরকে আক্রমণ করতে শুরু করে। পশ্চিম দলটি শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যায়। মধ্য দলটি তাদের তাড়া করে।’’
প্রথমে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, কোনও কারণে একটি দল অপর দলের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। আর সে কারণেই সংঘর্ষের সূত্রপাত। তেমনটা আর কখনও হবে না বলেও বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন।
কিন্তু বিজ্ঞানীদের সেই অনুমান ভুল ছিল। পরবর্তী কয়েক বছরে তিনটি দলের মধ্যে ওই ধরনের সংঘর্ষ আরও ঘন ঘন হতে থাকে। ২০১৮ সাল নাগাদ সেই ‘গৃহযুদ্ধ’ মারাত্মক আকার ধারণ করে। একে অপরের আক্রমণে শিম্পাঞ্জিরা মারাও যেতে থাকে।
গবেষকদের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিমি দলের শিম্পাঞ্জিরা মধ্যাঞ্চলীয় দলের অন্তত সাতটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং ১৭টি শাবককে হত্যা করেছে। একই সময়ে, মধ্যাঞ্চলীয় দলের ১৪ জন কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জি নিখোঁজ হয়ে যায়। তাদের মৃতদেহও কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নিখোঁজ হওয়ার আগে শিম্পাঞ্জিগুলি সুস্থ ছিল। সম্ভবত স্বগোত্রীয়দের হামলাতেই তাদের অনেকে নিহত হয়েছে। এখনও মাঝেমধ্যেই সেই ‘গৃহযুদ্ধ’ চলছে উগান্ডার নোগোগো শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে। সম্প্রতি তা চরম আকারও ধারণ করেছে।
বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত গবেষণা করে যাচ্ছেন বিষয়টি নিয়ে। নোগোগো শিম্পাঞ্জিদের আচরণ নিয়েও একাধিক গবেষণা চলছে।
তবে হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে ‘ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন’-এর তহবিল অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংস্থাটি প্রাণীর আচরণ এবং মানুষের জ্ঞান বিষয়ক গবেষণা-সহ অনেক গবেষণা প্রকল্পে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এই কাটছাঁট যদি সত্যিই করা হয়, তা হলে নোগোগো শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে দীর্ঘ দিনের গবেষণাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে।