পরিচালককে বিয়ে, নানা পটেকরের সঙ্গে পরকীয়ায় বিবাহবিচ্ছেদ! ক্যানসারে আক্রান্ত বাগ্দত্তকে হারিয়েছিলেন অভিনেত্রী
দ্বিতীয় বার সংসার পাতার আগেই অভিনেত্রীকে ছেড়ে চলে যান তাঁর সঙ্গী। ক্যানসারে মৃত্যু হয় টেলি অভিনেতার। তার পর আর কোনও সম্পর্কে জড়াননি অভিনেত্রী। লেখালিখি করে একাধিক বই প্রকাশ করেছেন। নিজের আঁকার প্রদর্শনীও করেন। বড়পর্দার পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও অভিনয় করছেন ৭৩ বছরের দীপ্তি নবল।
আশির দশক থেকে অভিনয়জগতের সঙ্গে যুক্ত। ডাকসাইটে সুন্দরী অভিনেত্রীদের তালিকায় নামও ছিল তাঁর। তবে পেশাজীবনের চেয়ে ব্যক্তিজীবনের কারণেই অধিকাংশ সময় শিরোনামে আসতেন বলি অভিনেত্রী দীপ্তি নবল। বলি পরিচালককে বিয়ে, সহ-অভিনেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সংসারে তিক্ততা, বিবাহবিচ্ছেদ। পরে টেলিভিশনের অভিনেতার সঙ্গে বাগ্দান সেরেছিলেন। কিন্তু সাত পাকে বাঁধা পড়ার আগেই ক্যানসারে সঙ্গীকে হারিয়েছিলেন দীপ্তি।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পঞ্জাবের অমৃতসরে জন্ম দীপ্তির। বাবা-মা, ভাই এবং দিদির সঙ্গে সেখানেই থাকতেন তিনি। তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক এবং মা ছিলেন চিত্রশিল্পী। দীপ্তিও মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে একই পেশা বেছে নেবেন, এমন ইচ্ছা ছিল তাঁর বাবা-মায়ের। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মেয়ের আগ্রহ ছিল অভিনয়ে।
২০২২ সালে প্রকাশিত ‘আ কান্ট্রি কল্ড চাইল্ডহুড’ নামক আত্মজীবনীতে দীপ্তি লিখেছিলেন, সিনেমায় কাশ্মীরের দৃশ্য দেখে তিনি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহও জন্মেছিল তাঁর। বাড়ি থেকে একদিন হঠাৎ পালিয়ে গিয়েছিলেন ১৩ বছরের কিশোরী। পুলিশের কাছে ধরা পড়ে, মারধর খেয়ে নাকি আবার বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে।
১৯৭১ সালে বাবার পেশার সূত্রে পরিবার-সহ নিউ ইয়র্কে চলে যান দীপ্তি। তত দিনে স্কুলের পাট চুকে গিয়েছিল তাঁর। বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হন তিনি। মনোবিদ্যা, ললিত কলা বিদ্যা (ফাইন আর্টস) এবং জ্যোতিষবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন দীপ্তি। স্নাতক হওয়ার পর বাবা-মাকে অবশেষে অভিনেত্রী হওয়ার সুপ্ত বাসনার কথা জানান তিনি। মেয়ের স্বপ্নপূরণে বাধা দেননি তাঁরা।
নিউ ইয়র্কের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশনজগতের কাজকর্ম নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন দীপ্তি। সেখানে ছাত্রাবস্থায় রেডিয়োয় একটি অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করার সুযোগ পান। সেই সূত্রে রাজ কপূর, দিলীপ কুমারের মতো তারকাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। দীপ্তির সঙ্গে তখন থাকত শুধুমাত্র একটি মাইক এবং টেপ রেকর্ডার।
আরও পড়ুন:
অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়তে চান বলে বিদেশ থেকে মুম্বই পাড়ি দেন দীপ্তি। কাজের জন্য মুম্বইয়ের এক নামকরা প্রযোজনা সংস্থার দফতরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন তিনি। সেই সূত্রে বহু তারকার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল দীপ্তির। নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ছোটপর্দায় নাটকের অনুষ্ঠানের জন্য অডিশন দিতে গিয়েছিলেন দীপ্তি। তখনই তাঁর ভাগ্য অন্য দিকে মোড় নেয়।
টেলিভিশনের প্রথম সারির সঞ্চালক-অভিনেতা ফারুক শেখের সঙ্গে আলাপ হয় দীপ্তির। ফারুকের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে সহ-সঞ্চালনার প্রস্তাব পান তিনি। সঞ্চালনা করার সময় দীপ্তির প্রতি নজর পড়ে বলি পরিচালক বিনোদ পাণ্ডের। তার আগে অবশ্য বড়পর্দায় হাতেগোনা দু’-তিনটি ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে ফেলেছিলেন দীপ্তি। কিন্তু বিনোদ তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাবে রাজিও হয়ে যান দীপ্তি।
১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এক বার ফির’ ছবিতে প্রথম বার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান দীপ্তি। পরের বছর ‘চশমে বদ্দুর’ ছবিতে অভিনয় করে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। আশির দশকে একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কেরিয়ারে এই সাফল্যের স্বাদ তাঁকে বেশি দিন টানেনি।
দীপ্তি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আমি একসময় অনুভব করছিলাম যে, আমি পর পর সিনেমায় অভিনয় করছি বটে, কিন্তু সেই চরিত্রগুলি তেমন জোরদার নয়। আমি এমন চরিত্র খুঁজছিলাম যা মানুষের অন্তর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে। তা পাচ্ছিলাম না। চিত্রনাট্য বাছাই করতে শুরু করেছিলাম। ফলে ছ’মাস ধরে আমি কোনও চুক্তিতে সই করিনি। একসময় দেখলাম, আমার হাতে আর কোনও কাজ নেই।’’
আরও পড়ুন:
১৯৮৫ সালে বলি পরিচালক প্রকাশ ঝাকে বিয়ে করেন দীপ্তি। তার পর ধীরে ধীরে কাজের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘‘বলিউডের এ রকম বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, কোনও নায়িকার বিয়ে হয়ে গেলে তিনি আর কাজ করবেন না। সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। ফলে তাঁকে আর কাজের সুযোগও দেন না কেউ।’’
পরিচালককে বিয়ে করলেও সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দু’-তিন বছর একসঙ্গে থাকার পর ছাদ আলাদা হয়ে যায় দীপ্তি এবং প্রকাশের। বলি অভিনেত্রী বলেছিলেন, ‘‘বিয়ে করার পর মনে হয়েছিল, সব ঠিকঠাক ভাবে চলছে না। আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম যে, নূন্যতম কথোপকথনের মধ্যেও যেতাম না। তখনই বুঝলাম এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।’’ বহু বছর আলাদা থাকার পর ২০০২ সালে আইনি বিচ্ছেদ হয় তাঁদের।
বলিপাড়ায় কানাঘুষো শোনা যায়, দীপ্তির সঙ্গে তাঁর সহ-অভিনেতা নানা পটেকরের ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বাড়ছিল। তার প্রভাব পড়েছিল অভিনেত্রীর সংসারে। বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও সেই সময় নানা এবং তাঁর স্ত্রী নীলকান্তি আলাদা থাকতেন। দীপ্তি তখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। একাংশের দাবি, সেই সন্তানের পিতা নাকি ছিলেন নানা।
বলিপাড়ার অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, অনাগত সন্তানের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন নানা। তা নিয়ে দীপ্তির সঙ্গে অভিনেতার সম্পর্কে ভাঙন ধরে। দীপ্তি গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন। তা নিয়ে প্রকাশের সঙ্গেও দূরত্ব বেড়ে যায়। পরে দীপ্তি এবং প্রকাশ কন্যাসন্তান দত্তক নিয়েছিলেন। বিবাহবিচ্ছেদ হলেও প্রকাশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে দীপ্তির।
বিবাহবিচ্ছেদের পর অবসাদে ভুগতে শুরু করেছিলেন দীপ্তি। দীর্ঘ ক্ষণ নিজেকে গ্যারাজে বন্দি করে আঁকতেন তিনি। পরে পণ্ডিত যশরাজের ভাইপো বিনোদ পণ্ডিতের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন দীপ্তি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, বিনোদ তাঁর সৃজনশীল সত্তাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছিলেন। বিনোদের অনুপ্রেরণাতেই তিনি ছবি আঁকা এবং লেখালিখিতে মনোনিবেশ করেন।
বিনোদের সঙ্গে বাগ্দান সেরে ফেলেছিলেন দীপ্তি। অভিনেত্রী বলেছিলেন, ‘‘আমরা টাকা জমাতাম। তার পর বাইরে ঘুরতে চলে যেতাম। যখন দেখতাম, টাকাপয়সা শেষ হয়ে আসছে, তখন আবার ফিরে কাজ শুরু করতাম। ও আমার মতোই অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ছিল। আমরা ভাবতাম, বিয়ে করলে মনে হয় আমাদের রোম্যান্স ফুরিয়ে যাবে। তাই বাগ্দানের পর আর বিয়ে করার সাহস পাইনি।’’
দ্বিতীয় বার সংসার পাতার আগেই দীপ্তিকে ছেড়ে চলে যান বিনোদ। ক্যানসারে মৃত্যু হয় তাঁর। তার পর আর কোনও সম্পর্কে জড়াননি অভিনেত্রী। লেখালিখি করে একাধিক বই প্রকাশ করেছেন। নিজের আঁকার প্রদর্শনীও করেন। বড়পর্দার পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও অভিনয় করছেন ৭৩ বছরের দীপ্তি।