শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী মা, ব্যবসায়ী স্বামী, সফল কন্যা এবং অখ্যাত গায়ক দাদা! ‘পদ্মভূষণ’ অলকার পরিবারও বর্ণময়
১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ এক গুজরাতি পরিবারে অলকার জন্ম। দু’টি জাতীয় পুরস্কারের পাশাপাশি সেরা মহিলা কণ্ঠশিল্পী হিসাবে সাতটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন গায়িকা।
ভারতের অন্যতম সেরা কণ্ঠশিল্পী (প্লেব্যাক গায়িকা) অলকা যাজ্ঞিক। সম্প্রতি পদ্মসম্মানে ভূষিত হয়েছেন গায়িকা। তবে তাঁকে নিয়ে উদ্বেগেও রয়েছেন অনুরাগীরা। দু’বছর আগে গায়িকা নিজেই জানিয়েছিলেন যে, তিনি শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। ফলে থমকে গিয়েছে তাঁর কণ্ঠ। এর পরে দীর্ঘ দিন আড়ালে ছিলেন তিনি।
সম্প্রতি পদ্মসম্মানের অনুষ্ঠানে অলকাকে ফের দেখা যায়। মঙ্গলবার পদ্মসম্মানে ভূষিত হন অলকা। অনুষ্ঠানের পরে হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। তার পর থেকেই উদ্বেগে তাঁর অনুরাগীরা। অলকার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। এখন শারীরিক অবস্থা কেমন, তা নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন অলকা।
বৃহস্পতিবার গায়িকা এক বিবৃতিতে অনুরাগীদের ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেছেন, “অনুষ্ঠানের ভিডিয়ো থেকে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে, তা আমি দেখেছি। তাঁদের সকলকে জানাতে চাই, আমি এখন ঠিক আছি এবং ক্রমশ সুস্থতার দিকে এগোচ্ছি। আসলে পদ্মসম্মানের অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ক্ষণ থাকার পরে আমি ক্লান্ত বোধ করছিলাম। তাই বেরোনোর সময়ে একটা হুইলচেয়ারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম।”
অনুরাগীদের নিশ্চিন্ত করেছেন অলকা। উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই বলেও জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “এখন যথেষ্ট সুস্থ বোধ করছি। সকলের প্রার্থনার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।” এর আগে বুধবারও একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন অলকা।
১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ কলকাতায় এক গুজরাতি পরিবারে অলকার জন্ম। দু’টি জাতীয় পুরস্কারের পাশাপাশি সেরা মহিলা কণ্ঠশিল্পী হিসাবে সাতটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন গায়িকা।
আরও পড়ুন:
চার দশকেরও বেশি সময়ের বিস্তৃত কর্মজীবন এবং খ্যাতির সুবাদে অলকা ভারতীয় সঙ্গীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। সম্প্রতি, পদ্মসম্মান অর্জন এবং শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের জেরে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন তিনি। তার পর থেকে তাঁর পরিবারকে নিয়ে কৌতূহল জন্মেছে অনেকের মনে।
অলকার বাবার নাম ধর্মেন্দ্র শঙ্কর এবং মায়ের নাম শুভা যাজ্ঞিক। তাঁর মা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক জন প্রশিক্ষিত গায়িকা ছিলেন। তাই সঙ্গীত সব সময়ই তাঁদের পারিবারিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৭২ সালে, মাত্র ছ’বছর বয়সে অলকা কলকাতায় আকাশবাণী বা ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’র জন্য গান গাওয়া শুরু করেন। ১০ বছর বয়সে, পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে জমি শক্ত করার লক্ষ্যে তাঁর মা তাঁকে মুম্বই নিয়ে যান। মায়ের সেই উদ্যোগ এবং উৎসাহই গায়িকার জীবন বদলে দিয়েছিল।
১৯৮৯ সালে শিলঙের ব্যবসায়ী নীরজ কপূরকে বিয়ে করেন অলকা। এই দম্পতি তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে সব সময়ই প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন। নীরজ চলচ্চিত্র জগতের মানুষ নন। অলকার অত্যন্ত আলোচিত কর্মজীবনের মধ্যেও তাঁদের দাম্পত্যজীবন ছিল শান্ত এবং চর্চার আলোকবৃত্তের বাইরে।
আরও পড়ুন:
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে রয়েছেন অলকা এবং নীরজ। অলকা যখন বলিউডে মহিলা কণ্ঠশিল্পী হিসাবে শীর্ষে পৌঁছেছিলেন এবং নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, তখন শিলঙে তাঁর ব্যবসায়িক কেরিয়ারে মনোযোগ দিয়েছিলেন নীরজ। তাঁদের সম্পর্ককে কর্মজীবী তারকা দম্পতির সফল সম্পর্কের উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়েও অটুট থেকেছে।
অলকা এবং নীরজের এক কন্যা রয়েছে। নাম সায়েশা কপূর। সায়েশা একজন উদ্যোগপতি। সায়েশা ‘হসপিটালিটি’ বা আতিথেয়তা খাতের মার্কেটিং বা বিপণন বিষয়ে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে রেস্তরাঁ ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রয় বিভাগে কাজ করেছেন তিনি।
সায়েশা বিনোদন জগৎ থেকে নিজেকে দূরেই রেখেছেন। বাবার মতো কেরিয়ার গড়ে তুলেছেন ব্যবসায়িক জগতে। অলকাও সর্বদা তাঁর কন্যার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং যত্নশীল থেকেছেন।
সায়েশা বর্তমানে একটি সংস্থায় ‘ন্যাশনাল হেড অফ কি অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড অন-ট্রেড সেলস’ হিসাবে কর্মরত রয়েছেন। সংস্থাটি একটি নামী জিন (মদ) তৈরি করে। ওই সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগে দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় অন্য একটি আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) সংস্থায় কাজ করেছেন সায়েশা।
কর্পোরেট পেশাজীবনের পাশাপাশি সায়েশা মুম্বইয়ের একটি রেস্তরাঁরও মালিক। তিনি এই রেস্তরাঁটিকে এমন একটি স্থান হিসাবে বর্ণনা করেছেন যেখানে মানুষ দিনের যে কোনও সময় খাবার খেতে পারেন এবং সেখানে সৃজনশীল খাবারের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সায়েশা ২০১৭ সালে ব্যবসায়ী অমিত দেশাইয়ের সঙ্গে বাগ্দান সম্পন্ন করেন। ২০১৮ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা।
অলকার দাদার নাম সমীর যাজ্ঞিক। সমীর নিজেও এক জন গায়ক। তবে বোনের মতো অত খ্যাতি তিনি পাননি। ‘দিল থা ইয়াহাঁ আভি আভি (২০০০)’ গানটির জন্য পরিচিত পেয়েছিলেন সমীর। গানটিতে দাদার সঙ্গে মহিলা কণ্ঠ দিয়েছিলেন খোদ অলকা।
ভারতীয় সঙ্গীত এবং কণ্ঠশিল্পী হিসাবে অনবদ্য অবদানের জন্য ভারত সরকার অলকাকে ২০২৬ সালে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করেছে। এটি ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান এবং অলকার কর্মজীবনের এক যথার্থ স্বীকৃতি।
২৩ জুন দিল্লিতে আয়োজিত ‘পদ্ম পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে অলকা এই সম্মান গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালে বিরল ‘সেন্সরি-নিউরাল হিয়ারিং লস’ (শ্রবণশক্তি হ্রাসজনিত সমস্যা) ধরা পড়ার পর এটি ছিল জনসমক্ষে তাঁর প্রথম উপস্থিতি।