যান্ত্রিক মেধার ঝাপটায় তথ্যপ্রযুক্তিতে ‘মহাপ্রলয়’! ভারতের তিন সংস্থার সাম্রাজ্য টলমল, হবে গণছাঁটাই, বলল ‘ডুম্সডে’ গবেষণা
সিট্রিনি রিসার্চের ‘দ্য ২০২৮ গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স ক্রাইসিস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে সারা বিশ্বে। সেই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে কৃত্রিম মেধার প্রতিপত্তিতে খাদের কিনারায় পৌঁছে যেতে পারে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার ভবিষ্যৎ। তিনটি সংস্থা নিয়ে আশঙ্কার কথা শুনিয়েছে গবেষণা।
ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তির সাম্রাজ্য নাকি খাদের কিনারায়। সৌজন্যে এআই বা কৃত্রিম মেধা। যান্ত্রিক মেধা দখল করে নেবে তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়া। ২০২৮-এর মধ্যে গণহারে চাকরি ছাঁটাইয়ের ঢল নামবে দুনিয়া জুড়ে। তৈরি হবে আর্থিক অস্থিরতা। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির মাথাতেও ঝুলছে ঝুঁকির খাঁড়া। এআই ডুম্সডে নাকি আসন্ন। কৃত্রিম মেধার ঢেউয়ে নাকি তলিয়ে যাবে বিশ্বের অর্থনীতির খুঁটি।
সিট্রিনি রিসার্চের ‘দ্য ২০২৮ গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স ক্রাইসিস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে সারা বিশ্বে। তথ্যপ্রযুক্তির জগতে ‘শেষের সে দিন’ আসন্ন হলে বিশ্বের অর্থনীতির যে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হবে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ওয়াল স্ট্রিট থেকে দালাল স্ট্রিটে।
গবেষণাকারী সংস্থা জানিয়েছে, এই প্রতিবেদনটি কোনও ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এআইয়ের ব্যবহারে ভবিষ্যতে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তারই একটি পরীক্ষামূলক ছবি তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। সেই সমীক্ষা অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্তের ফলে ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে বেকারত্ব এবং আর্থিক অস্থিরতার ফলে দোলাচল তৈরি হবে সারা বিশ্বে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সিট্রিনি একটি ছোট গবেষণা গোষ্ঠী। মাত্র তিন বছর আগে আত্মপ্রকাশ করে সংস্থাটি। এর প্রতিষ্ঠাতা জেমস ভ্যান গিলেন। একটি স্বাস্থ্যপরিষেবা সংস্থার মালিক ছিলেন তিনি। সেই সংস্থাটি বিক্রি করার পর স্টক গবেষণাপত্র লেখা শুরু করেছিলেন। ওষুধপত্র এবং কৃত্রিম মেধা নিয়েও গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখতেন গিলেন।
সর্বশেষ ভাইরাল প্রতিবেদনটি সহ-লেখক ছিলেন আলাপ শাহ। লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুসারে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন আলাপ। নিউ ইয়র্কের লোটাস টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট লিটলবার্ডের প্রধান বিনিয়োগকারী তিনি। তিনি ফ্লোরিডার লোটাস টেকনোলজি ম্যানেজমেন্টে ম্যানেজিং পার্টনার এবং সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ায় থিসলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হিসাবে কাজ করেছেন।
আরও পড়ুন:
তারও আগে এআই-পরিচালিত আর্থিক অনুসন্ধান প্ল্যাটফর্ম সেন্টিওরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আলাপ। এই সংস্থাটিকে পরে অধিগ্রহণ করে আলফাসেন্স নামে একটি সংস্থা। ডিসেম্বর ২০১১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সিইও এবং সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে মে ২০২২ পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আলাপ।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত (এআই) সমস্যার আশঙ্কা তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শেয়ারকে বিপুল হারে টেনে নামিয়েছে। গবেষণাপত্রটি জনসমক্ষে আসতেই বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মনে আশঙ্কা তৈরি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ট্রেডিংয়ের দিনটির সাক্ষী থেকেছে আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি ও পরামর্শক সংস্থা আইবিএম। ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে উইপ্রো, ইনফোসিস এবং টিসিএসের মতো বৃহৎ সংস্থার স্টকে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই।
গবেষণাপত্রটিতে ভারতীয় অর্থনীতির জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক কিছু নেই। তার বদলে হতাশাজনক চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে এতে। সিট্রিনি রিসার্চের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৮ সালের প্রথম প্রান্তিকেই আর্থিক অবমূল্যায়নের কারণে নয়াদিল্লিকে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনায় বসতে হবে। কারণ তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে রফতানি কমে যাবে, ডলারের সাপেক্ষে ভারতীয় মুদ্রা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি সাবধানবাণী শুনিয়েছে যে টিসিএস, ইনফোসিস এবং উইপ্রোর মতো ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্টরা ঝুঁকির সামনে রয়েছে। তাদের বাণিজ্যিক মডেলগুলি এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয়তার জন্যই সম্ভাব্য ধ্বংসের মুখোমুখি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, ক্রমশ কোডিং করার কাজে সিদ্ধহস্ত হচ্ছে এআই মডেলগুলি। গ্রাহকেরা অনেক কম খরচে এআই কোডিং এজেন্ট ব্যবহার করা শুরু করবে। আর তার জেরেই মার খাবে এই সমস্ত সংস্থার ব্যবসা।
আরও পড়ুন:
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র থেকে বার্ষিক রফতানি এই মুহূর্তে ২০ হাজার কোটি ডলার। কিন্তু ২০২৮ সালের দোরগোড়ায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের দৌড় নাকি থমকে যাবে। কারণ এই সমস্ত সংস্থার গ্রাহকদের অধিকাংশই খরচের একটি অংশ এআই কোডিং এজেন্ট ব্যবহারের দিকে ঝুঁকবে। কৃত্রিম মেধা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে বহু সংস্থাই কর্মীসঙ্কোচনের পথে হাঁটবে।
ভারতীয় কর্মীদের জন্য গ্রাহক সংস্থাগুলি তাদের আমেরিকার কোডিং ডেভেলপারদের বেতনের ভগ্নাংশ খরচ করত। কিন্তু এআই কোডিংয়ের রমরমার ফলে এক জন কোডিং এজেন্টের খরচ বিদ্যুতের খরচের সমান। ফলে অদূর ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের চাহিদা কমবে গোটা বিশ্বেই।ভারতীয় কর্মীদের জন্য গ্রাহক সংস্থাগুলি তাদের আমেরিকার কোডিং ডেভেলপারদের বেতনের ভগ্নাংশ খরচ করত। কিন্তু এআই কোডিংয়ের রমরমার ফলে এক জন কোডিং এজেন্টের খরচ বিদ্যুতের খরচের সমান। ফলে অদূর ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের চাহিদা কমবে গোটা বিশ্বেই।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের প্রথম সারির তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার প্রাপ্ত বরাতের সিংহভাগ বাতিল হবে ২০২৭ সালের মধ্যে। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর পরিষেবার চাহিদা কমলে টাকার দামে তার প্রতিফলন পড়তে বাধ্য। আগামী দু’বছরের মধ্যে আরও দুর্বল হবে টাকা।
এর ফলে ব্যাপক ছাঁটাই হবে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে কোপ পড়বে তা স্পষ্ট করা হয়নি প্রতিবেদনে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ‘হোয়াইট কলার’ কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশির ভাগ পরিষেবা খাতই সম্পূর্ণ রূপে কোডিং এজেন্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও তা জিডিপির (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) হার বৃদ্ধিতে কোনও প্রভাব ফেলবে না। শুধুমাত্র কর্পোরেট মুনাফা বৃদ্ধি পাবে। যদিও জিডিপিতে এর অবদান নামমাত্র। ‘হোয়াইট কলার’ চাকরিতে ধস নামার ফলে বহু পরিবারের আয় কমতে শুরু করবে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও তা জিডিপির (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) হার বৃদ্ধিতে কোনও প্রভাব ফেলবে না। শুধুমাত্র কর্পোরেট মুনাফা বৃদ্ধি পাবে। যদিও জিডিপিতে এর অবদান নামমাত্র। ‘হোয়াইট কলার’ চাকরিতে ধস নামার ফলে বহু পরিবারের আয় কমতে শুরু করবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অটোমেশন মডেলগুলি আসলে একটি নেতিবাচক চক্র। স্বয়ংক্রিয়তার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে, অর্থাৎ বেতন এবং ভাতাবাবদ খরচ কাটছাঁট করবে সংস্থাগুলি। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। এর আওতায় আরও খরচ কমাবে সংস্থাগুলি। সেই টাকা দিয়ে কৃত্রিম মেধার চর্চায় বিনিয়োগ আরও বাড়াবে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি। এই ভাবে চক্রের আকারে তা চলতেই থাকবে।
অনেকেই মনে করছেন, চাকরির বাজারে ভবিষ্যতে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। কৃত্রিম মেধার আগ্রাসী প্রসারের কারণেই বিভিন্ন সংস্থা মানবসম্পদের বোঝা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে। তেমন আশঙ্কার কথা উঠে আসছে বার বার। কিন্তু কেন এই চাকরিগুলি ঝুঁকির মুখে রয়েছে?
গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, এই চাকরিগুলিতে এমন কাজ করতে হয়, যেমন বিষয়বস্তু খসড়া করা, প্রচুর পরিমাণে তথ্যের হিসাব রাখা বা নিয়মিত জনসংযোগ করা— যা এআই খুব সহজেই করতে পারবে। এআই মডেলগুলি মানুষের বুদ্ধিমত্তার স্তরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
চাকরির বাজারে এআইয়ের কুপ্রভাব পড়লেও কয়েকটি ক্ষেত্র কৃত্রিম মেধার থাবা থেকে রক্ষা পাবে। ব্যক্তিগত পরিষেবার খাতগুলি টিকে থাকবে বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। হিসাবরক্ষক, ব্যক্তিগত সহকারীর মতো চাকরিগুলিতে প্রয়োজন পড়বে মানুষের। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কৃত্রিম মেধার বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং এর উপর ভিত্তি করে কেরিয়ার গড়ার পন্থা খুঁজে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এআই কী ভাবে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা শেখার ক্ষেত্রে জোর দেওয়া উচিত। বিচক্ষণ হয়ে কৃত্রিম মেধার তরঙ্গের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলে কর্মক্ষেত্র নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তাতে দক্ষতা আরও বৃদ্ধি পাবে। চাকরি হারানোর ঝুঁকি থেকেও নিস্তার মিলতে পারে।