Advertisement
E-Paper

ব্রিটেন-আমেরিকা-চিন-জাপান ফেল! পরমাণু চুল্লিতে ৭০০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল মুঠোয় আনল ভারত

তামিলনাডুর কলপক্কম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিরাট সাফল্য পেলেন এ দেশের গবেষকদল। থোরিয়ামের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছেন তাঁরা। ফলে ৭০০ বছর পর্যন্ত জ্বালানির সমস্যা মিটে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৫৫
India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০১ / ১৯

আর কেবলমাত্র পরমাণু বোমার কাঁচামাল তথা তেজস্ক্রিয় পদার্থ ইউরেনিয়াম দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। সারা পৃথিবীকে চমকে দিয়ে এ বার সেখানে থোরিয়াম ব্যবহার করতে চলেছে ভারত। সেই প্রযুক্তি প্রায় নয়াদিল্লির হাতের মুঠোয় চলে এসেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। আর তাই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করতে দেরি করেননি ‘উচ্ছ্বসিত’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০২ / ১৯

থোরিয়ামের সাহায্যে তড়িৎ উৎপাদনে তামিলনাড়ুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র কলপক্কমকে বেছে নেয় নয়াদিল্লি। ২০০৩ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’-এর নমুনা বা প্রোটোটাইপ (পিএফবিআর)। সম্প্রতি ওই রিঅ্যাক্টরটি ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করেছে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সেটা অচিরেই দেশের জ্বালানি চাহিদার ক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৩ / ১৯

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন বেশ জটিল প্রক্রিয়া। এর অর্থ হল ওই রিঅ্যাক্টরের ভিতর নিরাপদ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে আণবিক বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন এ দেশের গবেষকদল। শুধু তা-ই নয়, প্রোটোটাইপের সাহায্যে ইচ্ছা করলে তাঁরা থোরিয়াম-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতেন। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল গভীর রাতে দেশবাসীকে সেই খবর জানিয়ে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৪ / ১৯

সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘অসামরিক পরমাণু শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ করেছে। এটা আমাদের আণবিক কর্মসূচিকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাবে। কলপক্কমের পিএফবিআর ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করছে। এটা আমাদের বিশাল থোরিয়ামের ভান্ডারকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটা নির্ণায়ক পদক্ষেপ।’’ বিশ্বের ২৫ শতাংশ থোরিয়াম রয়েছে নয়াদিল্লির হাতে।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৫ / ১৯

থোরিয়াম-নির্ভর পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন ভারতের আজকের নয়। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে এর নীলনকশা তৈরি করেন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গির ভাবা। এর জন্য তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেন তিনি। কিন্তু, ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সে রহস্যজনক ভাবে তাঁর মৃত্যু হলে গোটা পরিকল্পনা ঠান্ডা ঘরে চলে যায়। এর পর সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আনু্ষ্ঠানিক ভাবে কাজ শুরু করে নয়াদিল্লি।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৬ / ১৯

এখন প্রশ্ন হল কী এই ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’? একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি ১০ লিটার পেট্রলের একটি গাড়ি নিয়ে ১০০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করেছেন। এর পর জ্বালানি, অর্থাৎ পেট্রল পরীক্ষা করতে গিয়ে চোখ কপালে উঠল তাঁর। পরিমাণ কমা তো দূরে থাক, উল্টে সেটা বেড়ে ১২ লিটার হয়ে গিয়েছে। ঠিক এই কাজটাই করে থাকে ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’। কিন্তু কী ভাবে?

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৭ / ১৯

থোরিয়ামের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে বিজ্ঞানী ভাবা বুঝতে পারেন ইউরেনিয়ামের মতো একে রাতারাতি তড়িতে বদলে ফেলা সম্ভব নয়। আর তাই সরকারকে ত্রিমুখী পদক্ষেপের পরামর্শ দেন তিনি। প্রথমে এমন রিঅ্যাক্টর তৈরি করা যেটা ইউরেনিয়ামের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। ১৯৬৯ সালে সেই লক্ষ্যে পা ফেলে কেন্দ্র। মহারাষ্ট্রের তারাপুরে বাণিজ্যিক ভাবে শুরু হয় পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৮ / ১৯

পরবর্তী কালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও কয়েকটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট চুল্লিগুলিতে যত ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয়েছে, ততই সেখানে উপজাত দ্রব্য হিসাবে বেরিয়ে এসেছে প্লুটোনিয়াম। ইউরেনিয়ামের মতো এটিও একটি তেজ়স্ক্রিয় পদার্থ। ফলে এর সাহায্যেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনও সমস্যা নেই। যদিও এই পর্যায়ে বিদ্যুৎচুল্লির কাঁচামাল ব্যবহারে সামান্য অদল-বদল করার কথা বলেন বিজ্ঞানী ভাবা।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
০৯ / ১৯

কিংবদন্তি গবেষকের বক্তব্য ছিল, দ্বিতীয় পর্যায়ে প্লুটোনিয়ামের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হোক থোরিয়াম। এতে পরমাণু বিদ্যুৎচুল্লিটির ভিতরে গিয়ে বিক্রিয়া করবে ওই যৌগ। পাশাপাশি, উচ্চ তাপে খুব দ্রুত সেটা পরিণত হবে ইউরেনিয়াম-২৩৩তে। অর্থাৎ, আণবিক রিঅ্যাক্টর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এর কাঁচামালেরও জোগান দিয়ে যাবে। তামিলনাডুর কলপক্কম কেন্দ্রে এই কাজই সফল ভাবে করতে পেরেছেন ভাবার উত্তরসূরিরা।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১০ / ১৯

বিশ্লেষকদের কথায়, এই গবেষণার তৃতীয় তথা শেষ ধাপ হল থোরিয়াম রিঅ্যাক্টরের নির্মাণ। সেটা তৈরি হয়ে গেলে প্রথমে প্লুটোনিয়াম এবং থোরিয়ামের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে দিল্লি। এবং দ্বিতীয় ধাপে থোরিয়ামের উপজাত হিসাবে বেরিয়ে আসা ইউরেনিয়াম-২৩৩ ব্যবহার হবে তড়িৎশক্তি নির্মাণে। এক কথায় এটা এমন একটা সাইকেল যেখানে বিদ্যুৎ তৈরির কাঁচামালের জোগান কখনও শেষ হবে না বলা যেতে পারে।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১১ / ১৯

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সদস্য এবং আণবিক শক্তি বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অনিল কাকোদর। তাঁর কথায়, ‘‘এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ এখন আমরা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ইউরেনিয়ম থেকে ৮০-১০০ গুণ বেশি শক্তি আহরণ করতে পারছি।’’ যদিও এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও অন্তত ১০ বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১২ / ১৯

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিজ্ঞানী ভাবার স্বপ্ন অনুযায়ী কলপক্কমে যে সোডিয়াম-শীতলীকৃত পুল-টাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর বা চুল্লিটি কাজ করছে তা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। এর নকশা নির্মাণে হাত রয়েছে ‘ইন্দিরা গান্ধী সেন্টার ফর অ্যাটমিক রিসার্চের’ (আইজিসিএআর)। চুল্লি তৈরির বরাত পায় ‘ভারতীয় নাভিকিয়া বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড’ (ভাভিনি)। দু’টি সংস্থাই পরমাণু শক্তি সংস্থার অন্তর্গত।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৩ / ১৯

বর্তমানে ভারতে ১৮-২০টি ‘প্রেশারাইজ়ড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর’ (পিএফডব্লিউআর) রয়েছে। এগুলির সব ক’টিতেই জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয় ইউরেনিয়াম। ফলে সংশ্লিষ্ট চুল্লিগুলি বিপুল পরিমাণে উপজাত দ্রব্য হিসাবে প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করছে। সম্মিলিত ভাবে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৭.৪৮ গিগাওয়াট। ফলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলিতে থোরিয়াম রিঅ্যাক্টর তৈরি করতে মোটা অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের পথে হাঁটতে পারে কেন্দ্র।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৪ / ১৯

গত কয়েক দশক ধরে থোরিয়ামকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত করার কম চেষ্টা করেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের মতো দ্বিতীয় পর্যায়ে যেতে একসময় ১,৫০০ কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছিল আমেরিকা। তার পরেও ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’-এর নমুনা বা প্রোটোটাইপ তৈরি করতে ব্যর্থ হন সেখানকার বিজ্ঞানীরা।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৫ / ১৯

একই কথা জাপানের ক্ষেত্রেও সত্যি। ১৯৯৯ সালে টোকিয়োর এই ধরনের একটি চুল্লিতে সোডিয়াম থেকে আগুন ধরে যায়। পরবর্তী বছরগুলিতে বহু চেষ্টা করেও আর সেটাকে চালু করা যায়নি। এ ব্যাপারে কিছুটা সাফল্য অবশ্য পায় ফ্রান্স। যদিও ১১ বছরে মাত্র সাত শতাংশ চলেছিল ফরাসিদের ওই ধরনের বিদ্যুৎচুল্লি। ফলে একসময় রণে ভঙ্গ দেন প্যারিসের পরমাণু বিজ্ঞানীরা।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৬ / ১৯

অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মধ্যে থোরিয়াম-নির্ভর বিদ্যুৎচুল্লি নির্মাণের চেষ্টা চালিয়েছে ব্রিটেন, জার্মানি এবং ইটালি। প্রত্যেকেরই বক্তব্য হল, ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’-এর নির্মাণ এবং তার থেকে বিদ্যুৎ তৈরির খরচ অনেক বেশি। ফলে এর সাহায্যে কখনওই বাণিজ্যিক ভাবে তড়িৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। সেটা এ বার মিথ্যা প্রমাণ করে দেখালেন ভারতের পরমাণু গবেষকেরা।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৭ / ১৯

বিজ্ঞান মন্ত্রক সূত্রে খবর, কলপক্কমের ওই নমুনা চুল্লি তৈরি করতে নয়াদিল্লির সর্বসাকুল্য খরচ হয়েছে আট হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কম বাজেটে এই সাফল্য পেয়েছেন ভারতীয় গবেষকেরা। বর্তমানে এই প্রযুক্তি একটি দেশের কাছেই আছে। আর সেটা হল রাশিয়া।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৮ / ১৯

বিজ্ঞান মন্ত্রক জানিয়েছে, কলপক্কমের ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টরে’ ফুয়েল সাইকেল ফেসিলিটির নির্মাণকাজ চলছে। অর্থাৎ, ভাবার তৃতীয় পর্যায়ের রাস্তায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে নয়াদিল্লি। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার চুল্লি ওই কেন্দ্রে তৈরি হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। তার পর শুরু হবে ইউরেনিয়াম রিঅ্যাক্টর থেকে প্লুটোনিয়াম নিষ্কাশনের কাজ। সব শেষে থোরিয়াম-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে ওই চুল্লি।

India’s nuclear power programme marking a significant step forward by achieving criticality in prototype fast breeder reactor
১৯ / ১৯

বিশ্লেষকদের দাবি, গোটা প্রক্রিয়া শেষ হতে আট থেকে ১০ বছর লাগতে পারে। তবে এতে সাফল্য পেলে বিদ্যুতের বিষয়ে নয়াদিল্লিকে আর চিন্তা করতে হবে না। আগামী ৭০০ বছর পর্যন্ত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে তড়িৎ উৎপাদন করতে পারবে ভারত।

সব ছবি: সংগৃহীত।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও গ্যালারি

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy