Iran’s Chabahar Port is not an option says India, why it matters for New Delhi dgtl
India on Chabahar Port
২৫% শুল্কের জুজু দেখিয়ে ইরানি-প্রেম ছাড়ানোর চেষ্টা! মার্কিন হুঁশিয়ারি উড়িয়ে পারস্য-বন্দরের ‘জমি আঁকড়ে’ ভারত
ইরানকে ‘একঘরে’ করতে নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছে আমেরিকা। কিন্তু, তা সত্ত্বেও সেখানকার চাবাহার বন্দর ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:০৮
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
কোনও অবস্থাতেই পারস্যের ‘কৌশলগত’ চাবাহার বন্দর হাতছাড়া করা সম্ভব নয়। ইরান ইস্যুতে শুল্ক হুঁশিয়ারি উড়িয়ে এ বার ওয়াশিংটনকে পাল্টা বার্তা দিল নয়াদিল্লি। কেন্দ্রের এই মনোভাব ‘সুপার পাওয়ার’ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ‘হজম’ করা বেশ কঠিন। আর তাই আগামী দিনে তেহরানকে কেন্দ্র করে ফের তীব্র হতে পারে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সংঘাত, যাতে আর্থিক দিক থেকে এ দেশের রক্তাক্ত হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকদের একাংশ।
০২১৮
আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার জেরে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করেই খাদে চলে যায় ইরানি মুদ্রা রিয়েল, যার জেরে ভেঙে পড়ে অর্থনীতি। ফলে আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি আর সহ্য করতে না পেরে রাস্তায় চলে আসে জনরোষ। শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের সরকারকে সরিয়ে পুরনো রাজশাহি ফেরানোর দাবি তোলে তারা। সুযোগ বুঝে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তেহরানকে ‘একঘরে’ করে ফেলতে শুল্কবাণ চালানোর হুমকি দেয় ওয়াশিংটন।
০৩১৮
দেশের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হতেই দমননীতির রাস্তা নেয় খামেনেই প্রশাসন, যার জেরে নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন ২,৫০০ জন। বিক্ষোভকারীদের একাংশকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে তেহরান। এমনকি তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পেয়েছেন মৃত্যুদণ্ডের সাজাও। এ-হেন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখলে ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয় আমেরিকা। তার পরেই পারস্যের চাবাহার বন্দর নয়াদিল্লি ছাড়তে চলেছে বলে তুঙ্গে ওঠে জল্পনা।
০৪১৮
সম্প্রতি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই ইরানি বন্দরটি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বল্প মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা মকুব করলেই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চাবাহার ব্যবহার করতে পারবে নয়াদিল্লি। এ ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত পেতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। তবে তাতে বরফ কতটা গলবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ফলে সাউথ ব্লকের উপর চাপ যে বাড়ছে, তা বলাই বাহুল্য।
০৫১৮
ইরানের সিস্তান-বালোচিস্তান প্রদেশের দক্ষিণ উপকূলের চাবাহার বন্দরের পরিকাঠামোগত উন্নতিতে গত কয়েক বছরে বিপুল অর্থ লগ্নি করেছে নয়াদিল্লি। ভারতকে তাই এর অন্যতম বড় অংশীদার বলা যেতে পারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তেহরানের উপর নতুন করে কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমেরিকা। যদিও চাবাহারকে সেই ‘শাস্তির’ আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। ফলে ছ’মাসের জন্য স্বস্তি পায় নয়াদিল্লি। সেই অব্যাহতি শেষ হবে এ বছরের ২৬ এপ্রিল। তার আগেই ওয়াশিংটন শুল্ক চাপানোর হুমকি দেওয়ায় জটিল হয়েছে পরিস্থিতি।
০৬১৮
এ প্রসঙ্গে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘‘গত বছরের (২০২৫ সালের) ২৮ অক্টোবর চাবাহার নিয়ে একটি চিঠি পাঠায় মার্কিন ট্রেজ়ারি বিভাগ। যেখানে এ বছরের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে বন্দরটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা মকুব করার কথা বলা হয়েছিল। সেটা কার্যকর রাখতে আমেরিকার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছে।’’ ইরানি বন্দরটির কোনও বিকল্প যে এই মুহূর্তে নয়াদিল্লির হাতে নেই, তাও স্পষ্ট করেছেন জয়সওয়াল।
০৭১৮
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদেশ মন্ত্রকের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘আমাদের পক্ষে শুল্কের ভয়ে চাবাহার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। কারণ ‘কৌশলগত’ দিক থেকে বন্দরটির গুরুত্ব অপরিসীম। ওটা ছাড়া আফগানিস্তান-সহ মধ্য এশিয়ায় পণ্য পরিবহণের বিকল্প কোনও রাস্তা নেই। বিষয়টি মার্কিন প্রশাসনকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা অবশ্য ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা মেনেই সংশ্লিষ্ট বন্দরটি ব্যবহার করব। তবে তার পরেও ইরানের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা জটিল হতে পারে।’’
০৮১৮
চাবাহার শব্দটির অর্থ হল ‘চারটি ঝর্না’। গুজরাটের কান্দলা থেকে প্রায় সাড়ে ৫০০ নটিক্যাল মাইল দূরের ওই এলাকার বন্দরটিকে নয়াদিল্লির গুরুত্ব দেওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। অতীতে আফগানিস্তান-সহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে পণ্য পাঠাতে পাকিস্তানের জমি ব্যবহার করতেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বার বার যুদ্ধ ও সীমান্ত পারের সন্ত্রাসের জেরে ইসালামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গেলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় সেই রাস্তা। তখনই বিকল্প পথের সন্ধান করতে থাকে কেন্দ্র, যাতে ‘অটোমেটিক চয়েস’ হিসাবে ভারতের সামনে আসে ইরান।
০৯১৮
‘কৌশলগত’ অবস্থানের কারণে বর্তমানে চাবাহারের মাধ্যমে পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে অনায়াসেই বাণিজ্য করতে পারছে নয়াদিল্লি। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বন্দরটি পারস্য উপসাগরের হরমুজ় প্রণালীর উপর অবস্থিত। যে সামুদ্রিক রাস্তাটিকে পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলির খনিজ তেল পরিবহণের ব্যস্ততম রুট বলা যেতে পারে। ফলে চাবাহারকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, কাতার, বাহারিন এবং ওমানের মতো দেশগুলির সঙ্গেও পণ্য লেনদেন বৃদ্ধির সুযোগ পেয়ে গিয়েছে কেন্দ্র।
১০১৮
দ্বিতীয়ত, ২০১৮ সালে রাশিয়ার ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’ বা আইএনএসটিসি (ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রাম্পপোর্ট করিডর) প্রকল্পে যোগ দেয় নয়াদিল্লি। সমুদ্র, রেল ও স্থলপথের ৭,২০০ কিলোমিটার লম্বা এই পরিবহণ রুটের একটা বড় অংশই থাকছে পারস্য দেশে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চাবাহারকে আইএনএসটিসির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে লোহিত সাগর ও সুয়েজ় খালের প্রথাগত রাস্তা এড়িয়ে মুম্বই থেকে মস্কো পর্যন্ত পণ্য লেনদেন করতে পারবেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা।
১১১৮
ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপসাগরকে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’ কাস্পিয়ান সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিবহণ রুটটি শেষ হবে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। ফলে এর মাধ্যমে সহজেই ইউরোপের বাজারে নিয়ে যাওয়া যাবে পণ্য। বিশ্লেষকদের দাবি, আইএনএসটিসি পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে অনেকটাই হ্রাস পাবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের খরচ। তখন প্রতি ১৫ টন পণ্যে ২,৫০০ ডলার করে বাঁচাতে পারবেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা। আর তাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
১২১৮
আইএনএসটিসি বাস্তবায়িত হলে উজ়বেকিস্তান, কাজ়াখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজ়ারবাইজান ও আর্মেনিয়া-সহ মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ পাবে নয়াদিল্লি। চাবাহার যার অন্যতম ‘প্রবেশদ্বার’ হয়ে উঠতে চলেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট বন্দরটি হাতে পেতে ইরানের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি করে কেন্দ্রের মোদী সরকার। এর পর এলাকাটির পরিকাঠামোগত উন্নতিতে সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেডের’ মাধ্যমে ৩৭ কোটি ডলার লগ্নি করে ভারত।
১৩১৮
২০৩০ সালের মধ্যে এ দেশের অর্থনীতিকে ১০ লক্ষ কোটি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১৫ লক্ষ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নয়াদিল্লির। এর জন্য চাই বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ ও স্থিতিশীল বাণিজ্যিক রাস্তা। এই অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির জন্য চাবাহার যে যাবতীয় ‘খেলা ঘোরাতে’ পারে, তা বলাই বাহুল্য। ইরানি বন্দরটির পরিকাঠামোগত উন্নতি প্রকল্পে আরও ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা আছে। সেই অর্থ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্রের মোদী সরকার।
১৪১৮
বিদেশ মন্ত্রকের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে যে অচিরেই চাবাহারকে কেন্দ্র করে বড় কোনও প্রকল্প কার্যকর করবে নয়াদিল্লি। বন্দরটির আর্থিক স্বাস্থ্য মজবুত রাখতে যা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে চাবাহারের উন্নতিতে মোদী সরকার আগ্রহ দেখালে তাতে আপত্তি করেনি মার্কিন প্রশাসন। বরং তেহরানের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভারতকে বিরল ছাড় দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৫১৮
গোড়ার দিকে বন্দর আব্বাস নামের আর একটি ইরানি সমুদ্রবন্দরকে নিষেধাজ্ঞার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলার দিকে বেশি নজর দেয় আমেরিকা। তাতেই তেহরানের অর্থনীতির যথেষ্ট লোকসান হয়েছিল। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অতীতের ছাড় প্রত্যাহার করে সাবেক পারস্য দেশটির উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চাপায় ওয়াশিংটন। কিন্তু, কয়েক দিনের মধ্যেই চাবাহারকে ছ’মাসের জন্য ‘শাস্তি’র আওতার বাইরে বার করে দিয়ে নয়াদিল্লির চিন্তা দূর করে ট্রাম্প প্রশাসন।
১৬১৮
বিশেষজ্ঞদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাবাহার ছেড়ে বেরিয়ে আসা কোনও অবস্থাতেই ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে শুল্কের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র নাছোড়বান্দা হলে আমেরিকার বাজারে এ দেশের পণ্যের উপর করের মাত্রা বেড়ে দাঁড়াবে ৭৫ শতাংশ। বর্তমানে যেটা ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেটা নয়াদিল্লির রফতানি বাণিজ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
১৭১৮
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জয়সওয়াল জানিয়েছেন, গত বছর (২০২৫ সালে) ভারত ও ইরানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৬০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১২০ কোটি ডলারের পণ্য তেহরানকে রফতানি করে নয়াদিল্লি। অন্য দিকে পারস্য থেকে আমদানি করা হয়েছিল ৪০ কোটি ডলারের পণ্য।
১৮১৮
জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতকে নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন এ দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। ওয়াশিংটনের কাছে নয়াদিল্লির গুরুত্ব যে যথেষ্টই বেশি তা বোঝাতে দেরি করেননি তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে ট্রাম্পের সম্পর্ক বেশ খারাপ হয়েছে। ফলে চাবাহারের ব্যাপারে ‘কৌশলগত অংশীদার’ ভারতের সঙ্গে সংঘাতে জড়়াতে না-ও পারেন তিনি, বলছেন বিশ্লেষকেরা।