‘প্যাট্রিয়ট’, ‘রিপার’, ‘লুকাস’, আত্মঘাতী ড্রোন থেকে বি-২! ইরানে ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’ বর্ষাতে তূণে কী কী রেখেছে আমেরিকা?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে আত্মঘাতী ড্রোন, টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্টেল্থ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। কম খরচে তৈরি একমুখী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ড্রোনও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
ইহুদি-মার্কিন যৌথ অভিযানে রক্তাক্ত ইরান। তাদের মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় নিহত ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান ইরান।
চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি যৌথ ভাবে ইরানকে নিশানা করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার ফৌজ। ওই দিন ভোরে সাবেক পারস্য দেশের রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক শহরে আছড়ে পড়ে তাদের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন।
ইহুদিরা এই অভিযানের নাম রেখেছে ‘অপারেশন লায়ন্স রোর’ (সিংহের গর্জন)। অন্য দিকে আমেরিকার আক্রমণের পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’। অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন খামেনেই-সহ তাঁর পরিবারের সদস্যেরা (পড়ুন মেয়ে, জামাই ও নাতনি)।
ইজ়রায়েলি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে খামেনেই-হত্যার খবর জানিয়ে বিবৃতি দেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। জানা যায়, ইরানি সর্বোচ্চ নেতার মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
এর মধ্যেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে ব্যবহৃত মার্কিন অস্ত্রশস্ত্রের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান শুরুর পর সেই সব ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ দিয়েই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌঘাঁটি এবং সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের অফিসের কাছের কিছু এলাকা-সহ গুরুত্বপূর্ণ ইরানি সামরিক কেন্দ্রগুলিতে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা।
আরও পড়ুন:
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে আত্মঘাতী ড্রোন, টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্টেল্থ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে। কম খরচে তৈরি একমুখী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ড্রোনও ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ইরানের উপর ভয়ঙ্কর হামলায় কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে আমেরিকা। তালিকার প্রথমেই রয়েছে বি২ স্টেল্থ বোমারু বিমান। আমেরিকার এই ‘শিকারি ইগল’-এর গায়ে সেঁটে আছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবিমানের তকমা। এর আগে ইরানেরই তিন পরমাণুকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের কৌশলগত ‘স্টেল্থ’ বোমারু বিমান ‘বি-২’।
ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ‘লুকাস’ ড্রোনকে প্রথম বার কাজে লাগাচ্ছে আমেরিকা। ঘটনাচক্রে, যে ‘লুকাস’ ড্রোনকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে আমেরিকা, সেই ড্রোন ইরানেরই ঘাতক ড্রোন ‘শাহেদ ১৩৬’-এর আদলে তৈরি। ইরানের সেই প্রযুক্তি ‘নকল’ করে আমেরিকা বানিয়ে ফেলেছে সস্তার ড্রোন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পেন্টাগন ঘোষণা করেছিল, তারা ইরানের ড্রোন ‘কপি’ করেছে।
তেহরানের সঙ্গে সংঘাতে ‘প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সিস্টেম’ বা ‘প্যাট্রিয়ট’ও ব্যবহার করেছে ওয়াশিংটন। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কী? ‘প্যাট্রিয়ট’ শব্দটি আসলে ‘ফেজ়ড অ্যারে ট্র্যাকিং রাডার ফর ইন্টারসেপ্ট অন টার্গেট’-এর সংক্ষিপ্তকরণ। এর মূল লক্ষ্য স্থলভাগ থেকে আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্রহানা ঠেকানো।
আরও পড়ুন:
রেথিয়ন টেকনোলজিস কর্পোরেশনের তৈরি এই প্যাট্রিয়ট সিস্টেমকে আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মধ্যে অন্যতম বলে ধরা হয়। নব্বইয়ের দশক থেকেই একে কাজে লাগিয়েছে আমেরিকা। আমেরিকার দাবি, ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে সৌদি আরব, কুয়েত এবং ইজ়রায়েলকে রক্ষা করতে প্যাট্রিয়টের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল।
আমেরিকান সেনাবাহিনীর টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স, সংক্ষেপে টিএইচএএডি বা থাডও ব্যবহৃত হচ্ছে ইরানের উপর মার্কিন হামলায়। ‘থাড’ ব্যবহার করে ‘হিট-টু কিল’ প্রযুক্তি। ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে তা আঘাত করতে সক্ষম। ‘থাড’ ব্যবহারে প্রয়োজন ৯৫ জন সৈন্য, ছ’টি ট্রাকবাহিত লঞ্চার। প্রতি লঞ্চারে থাকে আটটি করে ইন্টারসেপ্টর। এ ছাড়া একটি রেডার, একটি অগ্নি নির্বাপক এবং একটি যোগাযোগের ইউনিট থাকে এতে।
পাশাপাশি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমেরিকার বায়ুসেনার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-১৮, এফ-১৬, এফ-২২, এফ-৩৫ স্টেল্থকে কাজে লাগানো হয়েছে বলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে।
এ ছাড়াও ইরানের সঙ্গে সংঘাতে আমেরিকার তরফে ব্যবহার করা হয়েছে ইএ-১৮জি ইলেকট্রনিক অ্যাটাক এয়ারক্রাফ্ট, এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফ্ট, পি-৮ মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফ্ট, আরসি-১৩৫ রিকনাইস্যান্স এয়ারক্রাফ্ট, সি-১৭ গ্লোবমাস্টার কার্গো এয়ারক্রাফ্ট এবং সি-১৩০ কার্গো এয়ারক্রাফ্টের মতো আধুনিক সামরিক বিমান।
ইরানের উপর হামলায় এমকিউ-৯ রিপারের মতো অত্যাধুনিক ড্রোন এবং মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (এম-১৪২ হিমার্স)-এর ব্যবহারও করেছে ওয়াশিংটন। ব্যবহার করা হয়েছে কিছু আত্মঘাতী ড্রোন এবং পরমাণুচালিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী। জ্বালানি ভরার জন্য ব্যবহৃত জাহাজ এবং বিমানও ব্যবহৃত হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় শত্রুদেশের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরী বা গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলা প্রতিহত করার জন্য কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেমও ব্যবহার করেছে আমেরিকা।
সরকারি এক্স হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অস্ত্রতালিকা দিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। তালিকার শেষে আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড এ-ও জানিয়েছে, এর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ‘বিশেষ কিছু অস্ত্র’ও প্রয়োগ করা হয়েছে, যা তালিকাভুক্ত করা যাবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম মেধা বা এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিককে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে ঘোষণা করার এক দিন পর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালানো হয়েছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার সরকারকে এআই স্টার্ট-আপ সংস্থাটির সঙ্গে সব রকম কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে কী ধরনের এআই সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এর আগে গোয়েন্দা এবং সশস্ত্র পরিষেবাগুলিতে ব্যবহৃত হয়েছে অ্যানথ্রপিকের এআই ক্লড। প্রকৃতপক্ষে, গোপন তথ্য নিয়ে কাজ করা সমকক্ষ এআই সংস্থাগুলির মধ্যে এটিই প্রথম সংস্থা যা এই ধরনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।