নিজেকে যিশুর সঙ্গে তুলনা থেকে ইরানকে গালিগালাজ, সারা রাত জেগে নাগাড়ে পোস্ট! প্রশ্ন এ বার ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে
সারা রাত ধরে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একের পর এক পোস্ট করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পোস্টগুলির সময় এবং বিষয় বিশ্লেষণ করে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
এই হাসছেন তো পরমুহূর্তেই রেগে কাঁই! সকালে এক কথা বলছেন তো বিকেলেই সম্পূর্ণ অন্য মূর্তি। যুদ্ধের মধ্যে ‘তাড়িয়েছেন’ খোদ সেনাপ্রধানকে। ঐতিহ্যবাহী হোয়াইট হাউসের একাংশ ভেঙে তৈরি করছেন ‘নাচ-ঘর’ (পড়ুন বলরুম)। শুধু তা-ই নয়, নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে সারা রাত ধরে পর পর বিভিন্ন ধরনের পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। এর কোনওটায় আবার তিনি প্রভু যিশু! পোস্টগুলি নজরে আসার পর ‘সুপার পাওয়ার’ দেশের অন্দরে উঠছে একটাই প্রশ্ন। আদৌ কি সুস্থ তাঁদের প্রেসিডেন্ট? না কি ভুগছেন কোনও কঠিন মানসিক রোগে?
তিনি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রতিটা কাজকে আতশকাচের তলায় রেখে ‘মানসিক বিকারের’ হদিস পাচ্ছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। এই ইস্যুতে ইতিমধ্যেই বাজার গরম করতে মাঠে নেমে পড়েছেন বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। তাঁদের দাবি, রাতে ঘুমোচ্ছেন না রিপাবলিকান নেতা তথা দেশের প্রেসিডেন্ট। আর সেটা কোনও জটিল প্রশাসনিক কাজের জন্য নয়। ফলে ট্রাম্পের গায়ে অসুস্থতার তকমা এঁটে প্রচার শুরু করেছেন তাঁরা।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিনভর নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নানা ধরনের কথা লিখে থাকেন। রাতের বেলা সেখানে তিনি ঠিক কী কী পোস্ট দিচ্ছেন, সময় ধরে ধরে ইতিমধ্যেই তার একটা তালিকা তৈরি করেছেন বছর ২৩-এর ডেমোক্র্যাটিক নেতা হ্যারি সিসন। চলতি বছরের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পড়ে যায় হইচই। গণমাধ্যম থেকে আমজনতার আলোচনার ‘হট টপিক’ হয়ে দাঁড়ায় প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য, যা নিয়ে জল্পনা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সিসনের তৈরি করা তালিকা অনুযায়ী, কিছু দিন আগে রাত ৯টা ৪৯ মিনিটে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি ‘মহাকাব্যিক ছবি’ পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে বিছানায় এক ব্যক্তিকে শুয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। তাঁর কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পিছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা এবং ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’। আকাশে দেবদূতদের দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের পিঠে ঝুলছে লাল চাদর, বাঁ হাতে ঐশ্বরিক আলো! ছবিটির সঙ্গে রেনেসাঁ যুগে যিশু খ্রিস্টকে নিয়ে করা তৈলচিত্রের বেশ মিল রয়েছে।
এই ছবি পোস্টের ঠিক এক মিনিটের মাথায় ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ আর একটা ছবি দেন ট্রাম্প। সেখানে চাঁদে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ (গগনচুম্বী অট্টালিকা) তৈরি হচ্ছে বলে দেখিয়েছেন তিনি। এর পর রাত ১০টা ১০ মিনিটে তাঁর সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে ফুটে ওঠে মিম। ঠিক রাত ১০টা ৩২ মিনিট এবং ১০টা ৫৩ মিনিটে পর পর দু’টি খবরের ক্লিপ পোস্ট করেন তিনি। ক্রমতালিকায় পঞ্চম পোস্টে পারস্য উপসাগরের হরমুজ় প্রণালী অবরোধের কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার ঘড়িতে তখন রাত ১২টা ৪৩ মিনিট।
আরও পড়ুন:
হরমুজ় অবরোধের পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘‘১৩ এপ্রিল সকাল ১০টায় ইরানের বন্দরগুলিতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া সমস্ত পণ্যবাহী জাহাজকে আটকাবে আমাদের ফৌজ।’’ তিনি যখন এ কথা জানাচ্ছেন, তখন গভীর ঘুমে যুক্তরাষ্ট্র। তাতে অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট চুপ করে গিয়েছেন, এমনটা নয়। রাত ২টো ৩৫ মিনিটে পূর্বসূরি তথা সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর দেওয়ালে তুলে ধরেন তিনি।
সিসনের তৈরি ক্রমতালিকা অনুযায়ী, ২টো ৩৬ মিনিটে হরমুজ়ের নৌ অবরোধ নিয়ে আরও একটি প্রবন্ধ পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে মার্কিন ফৌজের রণকৌশল সংক্রান্ত একাধিক তথ্য দেন তিনি। এর ঠিক এক মিনিটের মাথায় এরিক সোয়ালওয়েলকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর দেওয়াল ভরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বছর ৪৫-এর এই ডেমোক্র্যাটিক নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদের নির্বাচনী প্রচার স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
এর পর বাইডেনকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটি পুনরায় ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করেন ট্রাম্প। আমেরিকার স্থানীয় সময় তখন রাত ২টো ৩৭ মিনিট। রাত ২টো ৩৮ মিনিটে হোয়াইট হাউসের বলরুম নিয়ে লেখা প্রবন্ধ ফুটে ওঠে তাঁর সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে। সিসনের তালিকায় শেষ পোস্ট ভোর ৪টে ১০ মিনিটে করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাতে ছিল ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ। ফলে ২টো ৩৮ মিনিটের পর কিছু ক্ষণের জন্য তিনি ঘুমিয়ে পড়েন বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
ট্রাম্প-বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক দলের ‘তরুণ তুর্কি’ সিসনের দাবি, ‘‘প্রেসিডেন্টের চোখে ঘুম নেই। আর তাই তিনি যিশু সাজার ভান করছেন। সারা রাত ধরে পাগলের মতো পোস্ট করে চলেছেন।’’ প্রায় একই কথা শোনা গিয়েছে মার্কিন পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এর নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েনটেটিভ’-এর সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পোলোসির গলায়। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে একটি সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
ন্যান্সি বলেছেন, ‘‘অবিলম্বে মানসিক চিকিৎসকদের দিয়ে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো উচিত। নইলে এই ধরনের ছবি কোনও সুস্থ মানুষ পোস্ট করতে পারেন না। আমি তো দেখলাম ছবিতে তাঁর হাত দিয়ে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। ২১ শতকে এ রকম কল্পনা করাও বেশ কষ্টকর।’’ নিজেকে প্রভু যিশু হিসাবে তুলে ধরায় কট্টর রিপাবলিকান সমর্থকদের একাংশও ট্রাম্পের উপর চটেছেন বললে অত্যুক্তি হবে না। ফলে ওই পোস্ট পরে সরিয়ে দেন তিনি।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের স্লোগান ছিল ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা। এই একটা কথাতেই ভোটের খেলা পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজেকে যিশু হিসাবে তুলে ধরায় মাগা সমর্থকদের একাংশও তাঁর উপর চটেছেন। কারণ, ওই দলে কট্টরপন্থীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সংশ্লিষ্ট পোস্টকে ‘ধর্মদ্রোহিতা’ হিসাবে বলে দেগে দিয়েছেন তাঁরা।
অন্য দিকে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ নেমে অন্য যুক্তি দিয়েছে ট্রাম্পের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর টিম। তাঁদের দাবি, কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) সাহায্যে তৈরি করা ওই ছবিতে নিজেকে মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসক হিসাবে তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কোনও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। যদিও তাতে সে ভাবে চিঁড়ে ভেজেনি। উল্টে আমেরিকা জুড়ে উঠেছে নিন্দার ঝড়।
ট্রাম্পকে প্যাঁচে ফেলতে ডেমোক্র্যাটদের ‘তরুণ তুর্কি’ সিসন আবার লাগাতার প্রকাশ করে চলেছেন প্রেসিডেন্টের রাতের পোস্টের ‘টাইমলাইন’। তিনি জানিয়েছেন, ১৫ এপ্রিল রাত ১১টা ৩৪ মিনিটে পোপ চতুর্দশ লিওকে বেনজির আক্রমণ করেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। রাত ১১টা ৩৯ মিনিটে তাঁর নিশানায় ছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটো। এই তোপ দাগার সবটাই চলেছে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ।
সিসনের দেওয়া তথ্য মোতাবেক, ওই তারিখে রাত ১২টা ১ মিনিটে ‘এপস্টিন ফাইল’ সংক্রান্ত মামলার এক আইনজীবীকে উদ্ধৃত করে প্রবন্ধ পোস্ট করেন ট্রাম্প। একই সময়ে বাইডেনকে নিয়ে একটি লেখা ভেসে ওঠে তাঁর সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে। রাত ১২টা ২ মিনিট থেকে ১২টা ৩ মিনিটের মধ্যে আরও তিনটি প্রবন্ধ পর পর চলে আসে সেখানে। এর মধ্যে ছিল বিচারক বোয়াসবার্গ, অ্যাক্টব্লু এবং ইরান সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
এ ছাড়া গত ১৫ এপ্রিল রাত ১২টা ৮ মিনিটে ফক্স নিউজ়ে নিজের সাক্ষাৎকারের কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। রাত ১টা ১০ মিনিট থেকে ১টা ১২ মিনিটের মধ্যে মোট তিনটি মিমে ভরে ওঠে তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর দেওয়াল। সেগুলিতে পোপ লিও এবং পূর্বসূরি তথা সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক হুসেন ওবামাকে খোঁচা দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। পাশাপাশি, নিজের এআই ছবির সমর্থনেও মিম পোস্ট করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের এ-হেন কাজকর্মের জেরে তাঁর উপর চাপ বাড়াচ্ছেন বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। পোপকে নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের জেরে মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের দাবি তুলেছেন তাঁরা। সেই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট শারীরিক ভাবে অক্ষম হলে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে। যদিও কোনও কিছুকেই পাত্তা দিতে নারাজ ‘পোটাস’। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই ইরানকে ‘পাগল এবং বদমায়েশ’ বলে গালিগালাজ় করতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে অবশ্য এগুলির পাল্টা যুক্তি রয়েছে। তাঁদের দাবি, ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর প্রতিটা পোস্ট ট্রাম্প নিজে করছেন, সেই প্রমাণ নেই। এ ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব দল থাকতে পারে যাঁরা নির্ধারিত সময়ে সারা রাত ধরে বিভিন্ন বিষয়ে সাজিয়ে রাখছেন ‘পোটাস’-এর সমাজমাধ্যমের দেওয়াল। হয়তো বিরোধীদের বিভ্রান্ত করতেই এই কৌশল নিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প সমর্থকেরা মুখে যা-ই বলুন না কেন, ইতিমধ্যেই এর প্রভাব আমেরিকার আমজনতার মনে পড়তে শুরু করেছে। এ বছর যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন’ (মিড টার্ম ইলেকশন)। সেখানে রিপাবলিকানরা সুবিধা করতে না পারলে মার্কিন কংগ্রেসের দখল যাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। তখন ইচ্ছামতো বিদেশনীতি চালানো প্রেসিডেন্টের পক্ষে বেশ কঠিন হতে পারে।