রুপোর পালকিতে ‘বধূ’, আমন্ত্রিত দেড় লক্ষ! খরচ কোটি কোটি টাকা, পোষ্যের বিয়েতে তিন দিনের সরকারি ছুটিও দিয়েছিলেন নবাব
বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর দেড় লক্ষ মানুষের জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেছিলেন নবাব। আতশবাজির প্রদর্শনীও হয়েছিল। শুধুমাত্র কুকুরদের জন্যই নয়, নবাবের প্রেম ছিল গির অরণ্যের এশীয় সিংহদের প্রতিও।
অর্থের সমুদ্রে ভাসতে থাকলে শখও দামি হয়ে ওঠে। জুনাগড়ের নবাবের শখ ছিল কুকুর পোষার। কিন্তু পোষ্যপ্রীতির সঙ্গে নবাবের খামখেয়ালিপনা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে অধিকাংশ সময় অদ্ভুত রূপ ধারণ করত। তার ফলে কোষাগার খালি হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের লোকজনও বিড়ম্বনার শিকার হতেন। শোনা যায়, প্রিয় পোষ্যের বিয়ে উপলক্ষে তিন দিন ছুটি ঘোষণা করেছিলেন নবাব তৃতীয় মহাখত খান। এমনকি, পোষ্যের বিয়ে উপলক্ষে তিনি মাতিয়ে তুলেছিলেন সমগ্র শহরকে।
মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯১১ সালে জুনাগড়ের নবাব হিসাবে ঘোষিত হয়েছিলেন মহাবত। তিনি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশ কাউন্সিল শাসনকাজ পরিচালনার কাজ করত। পরবর্তী কালs ১৯২০ সালে পূর্ণ শাসকের ক্ষমতা হাতে পেয়েছিলেন মহাবত। বিপুল সম্পত্তি, বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং পশুপ্রীতির জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই নামডাক হয়ে গিয়েছিল তাঁর।
জুনাগড় ছিল তৎকালীন ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় রাজ্য। নবাবের ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির বহরও ছিল চোখধাঁধানো। তাঁর রাজপ্রাসাদগুলি ছিল ইউরোপীয় ও মুসলিম স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি, যা সোনা, রুপো এবং দামি হিরে-জহরতে ঠাসা ছিল। নবাবের কাছে ৩০০ থেকে ৮০০ রকমের খাঁটি শিকারি কুকুর ছিল। পোষ্য কুকুরগুলির জন্য ব্যবস্থাও ছিল রাজকীয়।
কুকুরগুলির থাকার জন্য রাজপ্রাসাদে আলাদা আলাদা ঘর ছিল। সেই ঘরগুলিতে আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং টেলিফোনের ব্যবস্থা ছিল! প্রত্যেকটি কুকুরের দেখভালের জন্য আলাদা পরিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল। আদরের কোনও পোষ্য কুকুর মারা গেলে তাকে মার্বেল পাথরের সমাধিতে কবর দেওয়া হত এবং রাজকীয় ভাবে ব্যান্ড বাজিয়ে শোকপ্রকাশ করা হত।
নবাবের খামখেয়ালিপনার সবচেয়ে বড় নিদর্শন ছিল তাঁর দু’টি প্রিয় কুকুরের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া। ইতিহাসবিদদের মতে, নবাবের পোষ্যের বিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পোষ্য-বিবাহ হিসাবে পরিচিত। রোশানারা ছিল ল্যাব্রাডর প্রজাতির স্ত্রী কুকুর। ববি ছিল গোল্ডেন রিট্রিভার প্রজাতির কুকুর। ১৯২০ সালে রাজকীয় কায়দায় রোশানারা এবং ববির বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন নবাব।
আরও পড়ুন:
পোষ্যের বিয়েতে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইন-সহ সারা দেশের সমস্ত রাজা, মহারাজাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নবাব। ব্যক্তিগত কারণে ভাইসরয় সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। বিয়ে উপলক্ষে জুনাগড়ের নবাব রাজ্যে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। ১৯২০ সালে এই বিয়ের জন্য প্রায় ২০ লক্ষ টাকা (যা বর্তমানে বেশ কয়েক কোটি টাকার সমতুল্য) খরচ করেছিলেন নবাব।
কনে রোশানারাকে বিয়ের দিন সকালে দামি শ্যাম্পু ও সুগন্ধি দিয়ে স্নান করানো হয়েছিল। রত্নখচিত গয়না এবং সোনা-রুপোর ব্রোকেড পোশাকে সাজানো হয়েছিল তাকে। কনের সাজে রোশানারাকে একটি রুপোর পালকিতে বসিয়ে দরবারে আনা হয়েছিল।
অন্য দিকে, ববির পায়ে পরানো হয়েছিল সোনার ব্রেসলেট। ববি যখন রেলস্টেশনে এসে পৌঁছোয়, তখন তাকে স্বাগত জানাতে ২৫০টি কুকুর এবং একটি মিলিটারি ব্যান্ড উপস্থিত ছিল। স্টেশন থেকে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত ২৫০টি কুকুরের শোভাযাত্রা হয়েছিল। প্রতিটি কুকুরের পরনে ছিল জমকালো দামি পোশাক।
বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর দেড় লক্ষ মানুষের জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেছিলেন নবাব। আতশবাজির প্রদর্শনীও হয়েছিল। শুধুমাত্র কুকুরদের জন্যই নয়, নবাবের প্রেম ছিল গির অরণ্যের এশীয় সিংহদের প্রতিও। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন ভারতে রাজকীয় শিকারের কারণে জঙ্গলে সিংহের সংখ্যা কমে যাচ্ছিল, তখন নবাব অত্যন্ত কঠোর কিছু পদক্ষেপ করেছিলেন।
আরও পড়ুন:
তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের খুশি করতে ভারতের রাজারা বাঘ বা সিংহ শিকারের আয়োজন করতেন। কিন্তু জুনাগড়ের নবাব এতটাই কঠোর ছিলেন যে, ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং ভাইসরয়দেরও গির অরণ্যে সিংহ শিকারের অনুমতি দিতেন না।
সিংহদের চোরাশিকারিদের হাত থেকে বাঁচাতে এবং কেউ লুকিয়ে জঙ্গল থেকে কাঠ কাটছে কি না তা দেখতে নবাব নিজের কোষাগারের অর্থ খরচ করে বিশেষ রক্ষীবাহিনী নিয়োগ করেছিলেন। এই বাহিনী দিনরাত গিরের জঙ্গল পাহারা দিত। সিংহেরা অনেক সময় জঙ্গলঘেঁষা গ্রামের গবাদি পশু শিকার করত। গ্রামবাসীরা রাগের বশে সিংহদের যেন মেরে না ফেলেন, সে কারণে রাজকোষ থেকে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন নবাব।
ইতিহাসের বিভিন্ন নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, আজীবন পশুপ্রেমী এই নবাবের মৃত্যু হয়েছিল জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ফলে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় জুনাগড়কে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন নবাব। কিন্তু জুনাগড়ের সিংহভাগ মানুষ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে চাওয়ায় পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নবাব তাড়াহুড়ো করে করাচির উদ্দেশে বিমানে উঠে পড়েছিলেন। ডমিনিক ল্যাপিয়ারের বিখ্যাত ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাড়াহুড়ো থাকায় নবাব নাকি তাঁর কয়েক জন স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রাসাদে ফেলে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রিয় কুকুরদের ও রাজকোষের সোনাদানা সঙ্গে নিতে ভোলেননি।
শোনা যায়, করাচিতে নির্বাসিত জীবন কাটানোর সময় নবাবের এক পোষ্য তাঁকে কামড়ে দিয়েছিল। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হওয়ার কারণে তিনি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৪৭ সালে জুনাগড় ছাড়ার পর তিনি করাচিতে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন এবং সেখানেই তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি কেটেছিল। পরে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন জুনাগড়ের শেষ নবাব।