তৈরি রাখুন জমির দলিল-গাড়ির নথি, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র টাকা পেতে দিতে হবে শ্বশুর-শাশুড়ি-মা-বাবার কী কী তথ্য?
১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম পূরণের কাজ। এই সরকারি আর্থিক প্রকল্পের সুবিধা পেতে লাগবে কী কী নথি?
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মাসিক ৩,০০০ টাকার সরকারি আর্থিক সহায়তা পেতে হলে তা পূরণ করতে হবে এ রাজ্যের মহিলাদের। ১১ পাতার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম ভরতে লাগছে কী কী নথি? কোন পদ্ধতিতে ফর্ম পূরণের পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে নথিভুক্ত হবে গ্রাহকের নাম? আনন্দবাজার ডট কম-এর এই প্রতিবেদনে রইল তার হদিস।
চলতি বছরের ২৭ মে, বুধবার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। সেখানেই সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পটির ১১ পাতার ফর্ম প্রকাশ করেন তিনি। অনলাইন এবং অফলাইন, দু’টি পদ্ধতিতেই তা পূরণ করতে পারবেন আবেদনকারী। অনলাইনে আবেদনের ওয়েবসাইট হল annapurnabhandarwb.com। সেখান থেকেই ডাউনলোড করে অফলাইনের ফর্ম পাবেন এ রাজ্যের মহিলারা।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম বুঝতে বা পূরণ করতে যাঁদের অসুবিধা হবে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাঁদের সাহায্য করবেন সরকারি কর্মীরা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিধায়কদেরও দায়িত্ব নিতে হবে বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। উল্লেখ্য, এই ফর্মের মাধ্যমেই নাগরিকদের পারিবার সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবে রাজ্য প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে নবান্নে শুভেন্দু বলেন, ‘‘সেই কারণেই ফর্মটি দীর্ঘ হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনও সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এই ফর্মের নথি এবং তথ্য বিবেচনা করা হবে।’’
রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় আবেদনকারী একটি পরিবার একটি ফর্ম পাবে। তবে সেখানে একাধিক নামের জায়গা থাকবে। ফর্মের শুরুতেই পরিবারের প্রধানের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, লিঙ্গ, আধার নম্বর, আধারের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল ফোনের নম্বর লিখতে হবে। এর পর পরিবারের বাকি সদস্যদের তথ্য এবং গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের কী সম্পর্ক, সেটা ফর্মে উল্লেখ করবেন তাঁরা।
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্মে পরিবারের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর উল্লেখ করতে হবে। ওই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার নম্বর যুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া আবেদনকারীর পরিবারের প্রধান-সহ সমস্ত সদস্যের ভোটার কার্ডের (এপিক) নম্বর, বিধানসভার নাম এবং অংশ (পার্ট) নম্বর লিখতে হবে। পাশাপাশি, ডিজিটাল রেশন কার্ড এবং প্যান কার্ড থাকলে সেই সংক্রান্ত তথ্য বিশদে দিতে হবে।
আরও পড়ুন:
সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পটির ফর্মের তৃতীয় অংশে সম্পত্তির খতিয়ান দেবেন আবেদনকারী। সেখানে তাঁকে লিখতে হবে বাড়ির ধরন, অর্থাৎ তিনি যে বাড়িতে থাকছেন সেটা পাকা না কাঁচা। বাড়িতে সিমেন্টের দেওয়াল ও ছাদযুক্ত তিন বা তার বেশি পাকা ঘর আছে কি না। সেই সঙ্গে সব সদস্যের মোট জমির পরিমাণ, মিউটেশন এবং রেজিস্ট্রেশনের নথি ফর্মে উল্লেখ করতে হবে।
পরিবারের কারও ব্যক্তিগত চার চাকার গাড়ি থাকলে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্মে সেটা লিখতে হবে। তা ছাড়া আবেদনকারী বর্তমানে রাজ্য সরকারি কোনও প্রকল্পের সুবিধা পেলে এবং পরিবারের কোনও সদস্যের স্বাস্থ্যবিমা, কিসান ক্রেডিট কার্ড, মৎস্যজীবী ক্রেডিট কার্ড ও শিক্ষার্থী ক্রেডিট কার্ড থাকলে সেই তথ্যও দিতে হবে। লিখতে হবে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের পেশা।
শিক্ষিত সদস্যদের প্রত্যেককে তাঁদের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ফর্মে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। সেই সংক্রান্ত নথি বা শংসাপত্র জমা দিতে হবে। বাড়িতে ছোট ছেলে-মেয়ে থাকলে তাঁরা স্কুলের কোন শ্রেণিতে পড়ে, তাও জানাতে হবে। ফর্মে পরিবারের মোট বার্ষিক আয়ের পরিমাণ লিখবেন আবেদনকারী।
এ ছাড়া কোনও সদস্য আয়কর বা পেশাগত কর দেন কি না, কী ধরনের চাকরি করছেন, পরিবারের কোনও সদস্য সরকারি পেনশনভোগী কি না, ব্যবসা থাকলে জিএসটি দিচ্ছেন কি না এবং বার্ষিক আয় কত, সেটা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্মে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। পরিবারের কেউ সাংবিধানিক পদে থাকলে সেটাও লিখতে হবে।
আরও পড়ুন:
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্মে টিকা সংক্রান্ত তথ্যও নেবে সরকার। সম্প্রতি পরিবারের শিশু সন্তানদের কী ধরনের টিকা দেওয়া হয়েছে এবং পরিবারের কেউ ডিবিটি পেনশনের মতো কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেলে সেটা লিখতে হবে। এ বছরের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে নাম বাদ পড়ে থাকলে এবং মামলাটি ট্রাইবুনালে বিচারাধীন থাকলে, সেটা জানাতে বলা হয়েছে।
ফর্মের একেবারে শেষে একটি সম্মতি দেবেন উপভোক্তা। সেটা হল, ফর্মে লেখা সব তথ্য ও নথি সঠিক। কোনও তথ্য গোপন করা হয়নি। তথ্য-প্রমাণ অসত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। ফর্ম জমা হয়ে গেলে তা যাচাই করবে প্রশাসন। সেই প্রক্রিয়ায় উপভোক্তার নাম বাদ দিলে, তার কারণ লিখতে হবে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে।
শুভেন্দু জানিয়েছেন, প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক এবং আর্থিক ভাবে দুর্বল মহিলারা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র সঙ্গে যুক্ত হবেন। বর্তমানে যাঁরা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পাচ্ছেন, তাঁদেরও নতুন করে ফর্ম পূরণ করতে হবে। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে লক্ষ লক্ষ ‘বেনোজল’ মিশে রয়েছে। সে সব বাদ দিয়ে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের বিশুদ্ধ তালিকা তৈরি করা হবে। এমনটাই জানানো হয়েছে সরকারের তরফে।
নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সিএএতে নাগরিকত্বের আবেদনকারীরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। যত দিন না অন্নপূর্ণা যোজনা শুরু হচ্ছে, তত দিন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ চলবে। যাঁরা নতুন প্রকল্পের অধীনে ঢুকে যাবেন, তাঁদের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বন্ধ হয়ে যাবে।’’
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জিতে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ নামের একটি প্রকল্প চালু করেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এতে গোড়ার দিকে মাসে মাসে ৫০০ টাকা করে পেতেন এ রাজ্যের মহিলারা। পরে ধাপে ধাপে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে ঘাসফুল শিবির পরিচালিত রাজ্য সরকার। শেষ বাজেটে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকার পরিমাণ ১,৫০০ করেন মমতা। তফসিলি জাতি এবং অন্যান্য জনজাতির মহিলারা পেতেন মাসে ১,৭০০ টাকা।
তৃণমূল আমলে প্রবল জনপ্রিয়তা পায় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’। ফলে এ বছরের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার অস্ত্রেই তাঁকে হারানোর কৌশল নেয় পদ্মশিবির। ভোটের সঙ্কল্পপত্রে বিজেপি ঘোষণা করে, মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেবে তারা। নির্বাচনে জেতার পর সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে শুভেন্দু প্রশাসন।
চলতি বছরের ১৮ মে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন পশ্চিমবাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই অনুমোদন পায় ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। ওই দিনই এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন রাজ্যের নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ১৯ মে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি নিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে অর্থ দফতর।
সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পটি চালু করতে ইতিমধ্যেই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ পোর্টাল চালু করেছে রাজ্য প্রশাসন। গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর ফর্ম যাচাই করবেন ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক বা বিডিও। শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মহকুমাশাসক বা এসডিওকে। আবেদন পরীক্ষার কাজ শেষ হলে তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন জেলাশাসক বা ডিএম।
কলকাতাবাসীদের ক্ষেত্রে নিয়ম আবার কিছুটা আলাদা। সেখানে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র প্রতিটি আবেদন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবেন পুর আধিকারিক। তাঁদের যাচাইয়ের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুর কমিশনারকে। সব শেষে অনুমোদিত আবেদনগুলি পোর্টালে আপলোড করা হবে। তার পরে মহিলা গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে টাকা।
অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাজ্যের যে কোনও মহিলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় আর্থিক সুবিধা পাবেন, এমনটা নয়। আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার এবং কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার স্থায়ী চাকরিজীবী বা পেনশনভোগীরা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন না। পাশাপাশি, রাজ্য সরকার অনুমোদিত শিক্ষক, অশিক্ষক, পুর ও পঞ্চায়েত কর্মীদের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতার বাইরে রেখেছে শুভেন্দু প্রশাসন।
গত ২৭ মে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম প্রকাশের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, ১ জুন থেকে তিন মাস পর্যন্ত ফর্ম পূরণ প্রক্রিয়া চলবে। তাই তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। তবে ২ জুনের মধ্যে যাঁরা এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করিয়ে নিতে পারবেন, তাঁরা জুন মাস থেকেই টাকা পাবেন।