রাষ্ট্রপুঞ্জের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে কড়া অবস্থান মুইজ্জুর, প্রতিবেশীর হাত থেকে চাগোসকে ‘বাঁচাতে’ সেনা নামাল মলদ্বীপ!
মলদ্বীপের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জুর তরফে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পরেই চাগোস এলাকার আঞ্চলিক জলসীমার একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে হইচই পড়েছে।
‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইবুনাল ফর দ্য ল অফ দ্য সি’ (আইটিএলওএস)-এর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে দ্বীপরাষ্ট্র মলদ্বীপ। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন সংস্থার রায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ভারত মহাসাগরে চাগোস এলাকার আঞ্চলিক জলসীমার একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিল সে দেশের সেনাবাহিনী।
সম্প্রতি ব্রিটেনের তরফে চাগোসের নিয়ন্ত্রণ মরিশাসের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানায় মলদ্বীপ। সেই আবহেই এ বার সেনা মোতায়েন করে চাগোসের একাংশের নিয়ন্ত্রণ নিল মলদ্বীপ।
মলদ্বীপের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জুর সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পরেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। এই নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে হইচই পড়েছে। প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু ঘোষণা করেছেন, মলদ্বীপের ভূখণ্ড রাষ্ট্রপুঞ্জের ট্রাইবুনালের দ্বারা মরিশাসকে বরাদ্দ করা জলসীমার মধ্যে রয়েছে। ফলে বিতর্কিত ওই এলাকায় টহল দেওয়ার জন্য উপকূলরক্ষী জাহাজ এবং ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে।
রবিবার শুরু হওয়া ‘নজরদারি’ অভিযান মলদ্বীপের দক্ষিণ বেসলাইন থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকা পর্যন্ত চালানো হবে বলেও মলদ্বীপের জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী (এমএনডিএফ) জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার সময় ২০২৩ সালে সমুদ্র আইনের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের ঠিক করা মলদ্বীপ এবং চাগোসের মধ্যে নির্ধারিত সমুদ্র সীমানা প্রত্যাখ্যান করেন মুইজ্জু। আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের ওই সীমানা ২০০-নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক জলসীমা (ইইজেড)-কে বিভক্ত করেছিল।
আরও পড়ুন:
মুইজ্জুর দাবি, চাগোসে বিতর্কিত ওই সামুদ্রিক এলাকা মলদ্বীপের। সেই এলাকায় মরিশাসের কর্তৃত্বও অস্বীকার করেছেন তিনি। মুইজ্জু বলেন, ‘‘আমি ঘোষণা করছি যে ওই এলাকা মলদ্বীপের অর্থনৈতিক জলসীমার মধ্যে রয়েছে।’’ ওই এলাকা নিজেদের হাতে রাখতে সরকার ১৯৯৬ সালের ‘মেরিটাইম জোনস’ আইন সংশোধন করবে বলেও মন্তব্য করেন মুইজ্জু।
পুরো বিষয়টি নিয়ে মলদ্বীপের পূর্ববর্তী প্রশাসনের দিকেও আঙুল তুলেছেন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। মুইজ্জুর অভিযোগ, মরিশাস যখন সমুদ্রসীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করছিল, তখন আইটিএলওএস-এর শুনানিতে মলদ্বীপের পূর্ববর্তী প্রশাসন ইচ্ছাকৃত ভাবে ভূখণ্ডের অধিকার ছেড়ে দিয়েছিল।
২০২৩ সালের নভেম্বরে সরকার পরিবর্তনের পর অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় মামলাটি পর্যালোচনা করার জন্য এবং ‘জোর করে’ বাজেয়াপ্ত করা মলদ্বীপের সামুদ্রিক ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন মুইজ্জু। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে, অ্যাটর্নি জেনারেল আহমেদ উশাম গত ২৫ জানুয়ারি পার্লামেন্টে নথি উপস্থাপন করেন। আর তার পরেই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুইজ্জু।
বিষয়টি প্রসঙ্গে মলদ্বীপের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ভারত এবং শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ১৯৭৬ সালের মান্নার উপসাগরের ট্রাই-জংশন চুক্তির কথাও উল্লেখ করেছে, যা মলদ্বীপের ২০০ নটিক্যাল-মাইল অর্থনৈতিক জলসীমাকে মান্যতা দিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
কোথায় রয়েছে এই চাগোস দ্বীপপুঞ্জ? একে নিয়ে বিতর্কই বা কী? ভারত মহাসাগরের দক্ষিণে মোট ৬০টি ছোট ছোট প্রবালদ্বীপের একটি মালা তৈরি হয়েছে। এরই নাম চাগোস দ্বীপপুঞ্জ। এর অন্যতম হল দিয়েগো গার্সিয়া। অনন্ত জলরাশির মধ্যে ৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এটি গড়ে উঠেছে। আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে এই দ্বীপ অবস্থিত। হরমুজ প্রণালী থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি নয়। প্রবাল দ্বীপপুঞ্জটিকে পাশ কাটিয়ে চলে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের পরিবহণ।
ভারত মহাসাগরের বুকে প্রায় জনহীন প্রবাল দ্বীপ। এত দিন সেখানে টিমটিম করে টিকে ছিল ব্রিটিশরাজ। তবে সেই সূর্যও অস্ত যায়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক আদালত চাগোসে ব্রিটিশরাজকে অবৈধ বলে রায় দেয়। পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের ১১৬টি দেশ ব্রিটেনকে ছ’মাসের মধ্যে চাগোস মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানায়।
কিন্তু মলদ্বীপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইজ়রায়েল এবং হাঙ্গেরি সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। মলদ্বীপের দাবি ছিল, মরিশাসের কাছে চাগোসের হস্তান্তর মলদ্বীপ এবং চাগোসের মধ্যে সীমানা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে।
অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পর মরিশাসের তরফে আইটিএলওএস-কে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ করার আর্জি জানানো হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আইটিএলওএস-এর রায়ে চাগোসের ৪৭,২৩২ বর্গকিলোমিটার মলদ্বীপ এবং ৪৫,৩৩১ বর্গকিলোমিটার মরিশাসের হাতে যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এবং মরিশাসের মধ্যে চাগোস নিয়ে বিরোধে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিল মলদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মহম্মদ সোলির সরকার।
তার পরে প্রকাশ্যে আসে যে, মরিশাসের তরফে আইটিএলওএস-কে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ করতে বলার সময় ২০২২ সালের অক্টোবরে চাগোসকে মরিশাসে ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মলদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সোলি।
সেই নথি প্রকাশের পর রাজনৈতিক ঝড় শুরু হয়। বিরোধীরা সোলি প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং মলদ্বীপের অর্থনৈতিক জলসীমা বিক্রি করার অভিযোগ তোলেন। এর পর ২০২৩ সালের নভেম্বরে মুইজ্জু প্রেসিডেন্ট পদে বসার পর চাগোস নিয়ে নিজের মতামত স্পষ্ট করেন মুইজ্জু। জানিয়ে দেন, চাগোসকে মরিশাসের হাতে যেতে তিনি দেবেন না।
এর পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে মরিশাসের সঙ্গে একটি হস্তান্তর চুক্তিতে সই করে ব্রিটিশ সরকার। সেই চুক্তি অনুযায়ী দিয়েগো গার্সিয়া-সহ চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় তারা। ২০২৫ বছরের ১ এপ্রিল চুক্তিটি অনুমোদন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ, চাগোসে রয়েছে আমেরিকার কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি।
হস্তান্তর চুক্তি অনুযায়ী, ৯৯ বছরের লিজ়ে চাগোস পাচ্ছে মরিশাস। তবে এই দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত দিয়েগো গার্সিয়াতে রয়েছে আমেরিকা ও ব্রিটেনের নৌঘাঁটি। এই ঘাঁটি অবশ্য ব্যবহার করতে পারবে দুই দেশের ফৌজ। চাগোসের অধিকার ত্যাগের পরও ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সেখান থেকে সেনাঘাঁটি সরাতে না চাওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণের কথা বলেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের এ হেন হস্তান্তর চুক্তির প্রবল সমালোচনা করেছেন আমেরিকা ও ব্রিটেনের পদস্থ সেনাকর্তারা। তাঁদের যুক্তি, এর ফলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় বৃদ্ধি পাবে চিনের প্রভাব। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে পশ্চিম এশিয়া হোক বা দূরে কোথাও, যুদ্ধ পরিচালনা করতে গেলে সমস্যার মুখে পড়বে নেটো বাহিনী। আর তাই কোনও অবস্থাতেই সেখান থেকে নৌঘাঁটি সরাতে নারাজ তারা।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন। সেই চুক্তিকে ‘মহা বোকামি’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তিনিও দাবি করেছেন, এই চুক্তিকে কাজে লাগাতে পারে চিন এবং রাশিয়া। জানুয়ারির গোড়ার দিকে লন্ডনে বসবাস করা চাগোসের বাসিন্দারা তাঁদের মাতৃভূমি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বঞ্চিত থাকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেছিলেন।
সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের পূর্ব উপনিবেশ মরিশাসকে চাগোস হস্তান্তরের পরিকল্পনার উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির মধ্যেই মুইজ্জু পদক্ষেপ করলেন। রবিবার সংবাদমাধ্যম নিউজ়উইক-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুইজ্জু জানান, চাগোস মলদ্বীপের হাতে এলে দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় থাকবে।
মুইজ্জু এ-ও যুক্তি দিয়েছেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ পরিচালনার ক্ষেত্রে মরিশাসের থেকে অনেক অনুকূল অবস্থানে রয়েছে মলদ্বীপ। চাগোস থেকে মলদ্বীপের নৈকট্যের কথা এবং দেশটির সামুদ্রিক এলাকা পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর আগে চাগোসের দখল পাওয়া নিয়ে মলদ্বীপের ঐতিহ্যের কথাও উল্লেখ করেছেন মুইজ্জু। তিনি বলেন, ‘‘মলদ্বীপের চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে, যা ‘ফোয়ালহাওয়াহি’ নামে পরিচিত। এই সংযোগগুলি প্রমাণের উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং আমরা বিশ্বাস করি যে মলদ্বীপ অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে চাগোসের বেশি দাবিদার।’’
মুইজ্জু বেশ কিছু ‘প্রমাণ’ উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন, চাগোস দ্বীপে দিভেহিতে খোদাই করা ৯০০ বছরের পুরনো সমাধিফলক রয়েছে। ১৬ শতকে মলদ্বীপের এক রাজাও দ্বীপপুঞ্জের উপর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছিলেন। এ ছাড়াও, ডিএনএ পরীক্ষায় নাকি প্রমাণ হয়েছে যে, আধুনিক চাগোসিয়ানেরা একসময় মলদ্বীপে ছিলেন। এ ছাড়াও মলদ্বীপ এবং চাগোসের সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু লোককথাও প্রচলিত রয়েছে।
আইটিএলওএস-এর রায় চূড়ান্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আইনত বাধ্যতামূলক হলেও এর কোনও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা নেই। প্রায় এক দশক ধরে দক্ষিণ চিন সাগর নিয়ে আইটিএলওএস-এর রায় উপেক্ষা করে আসছে চিন। একই দিকে পা বাড়াল মলদ্বীপও।
প্রেসিডেন্টের ভাষণের পর দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ঘোষণা করে, দক্ষিণ জলসীমা পর্যবেক্ষণের জন্য উপকূলরক্ষী জাহাজ ‘ধরুমাবন্ত’ এবং একাধিক সামরিক ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। এমএনডিএফও জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুসারে সামুদ্রিক ওই এলাকা সুরক্ষিত রাখার জন্য ‘প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে তারা।