ছেড়েছেন বড় চাকরি, উন্নত দেশের নাগরিকত্ব, সেই প্রাক্তন ব্যাঙ্কারই শেষ ভরসা পাকিস্তানের
পাকিস্তান মুসলিম নিগ-নওয়াজ় (পিএমএল-এন)-এর সদস্য নন অওরঙ্গজ়েব। রাজনীতিতে একেবারেই নবাগত। এ হেন অওরঙ্গজ়েবের দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।
ধুঁকছে অর্থনীতি। দেশে জরুরি পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। পাকিস্তানের ইতিহাসে অর্থনীতির এত খারাপ অবস্থা আগে হয়নি। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর পদে বসলেন মহম্মদ অওরঙ্গজ়েব। তিনি কি পারবেন দেশকে টেনে তুলতে?
পাকিস্তানের শাসকদল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ় (পিএমএল-এন)-এর সদস্য নন অওরঙ্গজ়েব। রাজনীতিতে একেবারেই নবাগত। এ হেন অওরঙ্গজ়েবের দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা পাকিস্তান। সে দেশের অর্থনীতির হাল ফেরাতে তাঁর উপরেই ভরসা করছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
পাকিস্তানে কর্পোরেট কর্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অওরঙ্গজ়েব। বিশাল অঙ্কের বেতন পেতেন তিনি। সেই চাকরি ছেড়ে যোগ দিয়েছেন পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায়। দেশের মন্ত্রী হওয়ার জন্য ছেড়েছেন ডাচ নাগরিকত্ব।
এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানে মূল্যবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। আর্থিক বৃদ্ধির হার সব থেকে কম। পাশাপাশি, কর আদায়ের পরিমাণও কম সে দেশে। ভোগান্তি বৃদ্ধি করেছে জলবায়ুর পরিবর্তন। তার জেরে বন্যা, খরায় বিধ্বস্ত দেশ। ফলে ধাক্কা খাচ্ছে অর্থনীতি।
এ সবই এখন বড় চ্যালেঞ্জ প্রাক্তন ব্যাঙ্কার অওরঙ্গজ়েবের কাছে। পাশাপাশি, জুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার (আইএমএফ)-এর সঙ্গে অন্তত তিন বছরের চুক্তি সারতে হবে। পাকিস্তানের জন্য কোটি কোটি টাকার সাহায্যের আশ্বাস আদায় করতে হবে। আর সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য অনেক কিছু ছেড়েছেন অর্থমন্ত্রী। সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল জীবন ছেড়েছেন। বড় চাকরি ছেড়েছেন।
আরও পড়ুন:
অওরঙ্গজ়েবের জন্ম লাহোরে। বাবা ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। পাকিস্তানের অভিজাত অ্যাটকিনসন কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষার জন্য অওরঙ্গজ়েব পাড়ি দেন আমেরিকা। সেখানে পেনসিলভেনিয়ার হোয়ার্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বিশেষ বৃত্তিও পান।
পড়াশোনা শেষ করে যোগ দেন নিউ ইয়র্কের সিটিগ্রুপ সংস্থায়। পরে এবিএন আমরো ব্যাঙ্কের চাকরি নিয়ে পাকিস্তানে ফেরেন তিনি।
ওই ব্যাঙ্কের সদর দফতর আমস্টারডামে। কয়েক বছর পর ফের সেখানে বদলি হন অওরঙ্গজ়েব। তার পর যোগ দেন জেপি মরগ্যান ব্যাঙ্কে।
আরও পড়ুন:
জেপি মরগ্যান ব্যাঙ্কের সিঙ্গাপুর শাখায় শীর্ষপদে নিযুক্ত হন তিনি। ২০১৮ সালে সেই চাকরি ছেড়ে পাকিস্তানে ফেরেন। সে দেশের সব থেকে বড় ব্যাঙ্ক হাবিব ব্যাঙ্ক লিমিটেডের সিইও হন।
তার কয়েক দিন আগেই হাবিব ব্যাঙ্ক কয়েক সপ্তাহের জন্য আমেরিকায় কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। অর্থ তছরুপের অভিযোগে ২২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার জরিমানা হয় ওই ব্যাঙ্কের। ভারতীয় মুদ্রায় যা ২০০০ কোটি টাকারও বেশি।
এ হেন ব্যাঙ্কে যোগ দেওয়ার জন্য অওরঙ্গজ়েব যখন জেপি মরগ্যানের চাকরি ছাড়েন, তখন তাঁর সহকর্মীরা বিস্মিত হন। সিঙ্গাপুর ছাড়ার সিদ্ধান্তে আরও হতবাক হন। এ কথা ব্লুমবার্গকে জানিয়েছিলেন তাঁরই এক সহকর্মী।
কিন্তু অওরঙ্গজ়েব ছিলেন নাছোড়। তাঁর পরিচিতেরা বলেন, ছোট থেকেই প্রাক্তন এই ব্যাঙ্কার দেশকে খুব ভালবাসেন। দেশের জন্য কিছু করতে চাইতেন দুই সন্তানের বাবা।
২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আর্থিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন অওরঙ্গজ়েব। তখন থেকেই নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে শুরু করেন তিনি। তাঁর উপর ক্রমে ভরসা বৃদ্ধি পেতে থাকে শাহবাজের।
একটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগেই অওরঙ্গজ়েবের সঙ্গে কথাবার্তা বলা শুরু করেছিলেন শাহবাজ। বার বার পাকিস্তানের বাণিজ্যিক কেন্দ্র করাচি থেকে ইসলামাবাদ ছুটে যেতেন অওরঙ্গজ়েব।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হয়। বিভিন্ন সমীকরণের পর আবার ক্ষমতায় আসে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ়। প্রধানমন্ত্রী হন শাহবাজ। দুই শরিক দল নির্দিষ্ট ইস্যুতে শাহবাজের দলকে সমর্থনে রাজি হয়। সূত্রের খবর, অওরঙ্গজ়েবকে অর্থমন্ত্রী করার বিষয়ে কোনও শরিক দলই আপত্তি তোলেনি।
অওরঙ্গজ়েবের সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ। সেটা রাজনীতি নয়, বরং অর্থনীতি। তিনি জানিয়েছেন, এখন তাঁর পাখির চোখ পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ, নিজের অতীতের কৃতিত্ব নিয়ে পড়ে থাকা নয়। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আপনাকে ঠেলে এগোতেই হবে। নিজের কমফোর্ট জ়োন থেকে বার হতেই হবে। তবেই সাফল্য।’’