ভাঙা বিয়ে, ধর্মবিদ্বেষ, না কি মানসিক অসুস্থতা? ধর্মীয় শোভাযাত্রায় কেন বিষ ক্যাপসুল বিলি করেন প্রেমজি? নেপথ্যে ইরান-যোগ?
প্রেমজি কেন হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, তা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্তে তাঁর ইরান ও ইরাকে বার বার যাতায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
মুম্বইয়ের এক ধর্মীয় শোভাযাত্রায় ক্যাপসুলে ইঁদুর মারার বিষ ভরে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার ছক কষেছিলেন ফৈয়াজ় প্রেমজি। পরিকল্পনা ‘সফল’ করতে পুণে থেকে মুম্বই এসেছিলেন তিনি। মুম্বইয়ের বাইকুলায় ধর্মীয় শোভাযাত্রায় বেশ কয়েক জনকে সেই ক্যাপসুল বিলিও করেন প্রেমজি। তাঁর বিলি করা ক্যাপসুল খেয়ে কয়েক জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন
ক্যাপসুলের মাধ্যমে বিষ দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নিকেশ করার ষড়যন্ত্রটি বানচাল হয়ে যায় শোভাযাত্রার তদারকিতে থাকা স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপরতায়। খেলে ব্যথা নিরাময় হবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্যাপসুলগুলি বিলি করছিলেন প্রেমজি। অনেকে তাঁর কথা বিশ্বাস করে সেই ক্যাপসুল নেন। কয়েক জন খেয়েও ফেলেন। কয়েক জন মহিলা স্বেচ্ছাসেবীর সন্দেহ হওয়ায় পুলিশকে জানান তাঁরা। পুলিশের জালে ধরা পড়েন ৩৯ বছর বয়সি ফৈয়াজ় নিসার হুসেন প্রেমজি।
বিষপ্রয়োগের ষড়যন্ত্রের তদন্তে নেমে পুলিশের হাতে উঠে এসেছে নতুন নতুন তথ্য। পুলিশ সূত্রে খবর, নিজে যে ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, সেই সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করতেন প্রেমজি। তাঁদের হত্যা করা নয়, বরং কিছুটা শিক্ষা দেওয়ার জন্যই এই কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। জেরায় প্রেমজি দাবি করেছেন, এটিকে হত্যা বলা ঠিক হবে না, তিনি ‘মহৎ কাজ’ করতে যাচ্ছিলেন।
পুলিশের কাছে প্রেমজি দাবি করেছেন, কাউকে হত্যা করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং কিছু মানুষকে শিক্ষা দিতে তাঁদের উপর এই বিষ প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। বিষের কতটা পরিমাণ ক্ষতিকর হতে পারে তা বুঝতে তিনি আগেই একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন বলে পুলিশকে জানান প্রেমজি। পরে তিনি এমন ক্যাপসুল তৈরি করেছিলেন, যেটি খেলে মানুষের মৃত্যু ঘটে না বলে পুলিশি জেরায় দাবি করেন প্রেমজি।
পুলিশ সূত্রে খবর, প্রেমজি এর আগে তাঁর ধর্মের কিছু রীতিনীতির বিরোধিতা করে প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, এর ফলে ধর্মীয় নেতারা তাঁর পরিবারকে একঘরে করে দেন। এই সামাজিক বয়কটের পর প্রেমজি মা, বড় ভাই মহম্মদ আব্বাস এবং দুই ছোট বোন সাকিনা ও রুবিনাকে নিয়ে পুণেয় সংসার পাতেন। তবে তিনি মাঝে মাঝে মুম্বই আসতেন।
আরও পড়ুন:
প্রেমজির বাড়ি পুণের বিমান নগরে। তাঁর বাবা একটি রং কারখানায় কাজ করেন। মা এবং বোন ইরানে থাকেন। তদন্তকারী সূত্রের খবর, গত বছর ইরান এবং ইরাকেও গিয়েছিলেন প্রেমজি। সেখানে মাস দুয়েক কাজকর্মও করেন। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বেশ কয়েক বার পশ্চিম এশিয়ার দুই দেশে যাতায়াত করেন প্রেমজি। এর পর পুণে ফিরে আসেন পাকাপাকি ভাবে।
তিনি ঠিক কী করতেন বা তাঁর বর্তমান পেশা কী সে বিষয়ে আলোকপাত করতে পারেনি পুলিশও। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি রঙের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে জানা গিয়েছে প্রেমজি বিবিএ (ব্যাচেলর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ডিগ্রিধারী ছিলেন।
প্রেমজি বিবাহিত। তবে প্রায় চার বছর আগে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তদন্তকারীদের ধারণা, পারিবারিক সমস্যার পাশাপাশি আত্মীয়দের কাছ থেকে অবহেলার অনুভূতি তাঁর মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
পুলিশের তদন্তকারী আধিকারিকদের মতে, তাঁর বিয়ে ভাঙা, সম্প্রদায়ের সদস্যদের দ্বারা তাঁর পরিবারকে হেনস্থা করার পর তিনি সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এই সমস্ত ঘটনার চাপে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। একই সঙ্গে একাধিক ওষুধ সেবন করতেন তিনি।
আরও পড়ুন:
একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেমজি শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য। এই সম্প্রদায়টি ছোট হলেও গুজরাত ও কচ্ছ অঞ্চলে তাঁদের ঐতিহাসিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও অনলাইন আলোচনায় প্রেমজি জানিয়েছেন, পুণে আসার আগে তাঁর পরিবারের শিকড় গুজরাতেই ছিল। আবার কিছু ক্ষেত্রে তিনি হায়দরাবাদের সঙ্গেও তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন।
২০১৯ সাল থেকে নিজেকে ধর্ম ত্যাগকারী হিসাবে পরিচয় দিতেন প্রেমজি। প্রায়শই বিভিন্ন পডকাস্ট বা ইউটিউব চ্যানেলে ইসলাম, বিশেষ করে শিয়া মতাদর্শের সমালোচনা করতেন তিনি। ইউটিউবে এক বার তিনি বলেছিলেন যে, সব কিছুকে প্রশ্ন করার অভ্যাসটি তিনি তাঁর মায়ের পরিবার থেকে পেয়েছেন, যা পরবর্তী কালে তাঁকে দীর্ঘ দিনের ধর্মীয় বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহস জুগিয়েছিল।
পরবর্তী সাক্ষাৎকারগুলিতে প্রেমজি দাবি করেন যে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করার কারণে তাঁকে ক্রমাগত হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অভিযোগ করেন, ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। পুণেয় তাঁর ব্যবসা আক্রান্ত হয়েছিল এবং তাঁকে সামাজিক ভাবে বয়কট করে দেওয়া হয়েছিল।
ভারতে একঘরে হওয়ার পর ইরানে পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবেন প্রেমজি। দেশটি ধীরে ধীরে পরিবর্তন ও সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ইরানে গিয়েছিলেন বলে পডকাস্টে দাবি করেন প্রেমজি। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর দ্রুত আশাভঙ্গ হয়ে যায় তাঁর। ইরানে থাকাকালীন তিনি শেয়ারবাজারে বেচাকেনার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন।
ঘটনার ১৫ দিন আগে মুম্বইয়ে আসেন প্রেমজি। ডোংরির একটি স্বল্পমূল্যের হোটেলে ওঠেন তিনি। পরে এই হোটেল থেকেই তাঁকে পুলিশ গ্রেফতার করে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, হোটেলে বসেই গোটা পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ৩০,০০০ খালি ক্যাপসুল এবং প্রায় ৫০ কিলোগ্রাম জিঙ্ক ফসফাইড অর্ডার দেন প্রেমজি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বেশ কয়েক দিন ধরে তাঁর হোটেলের ঘরের ভিতরে ক্যাপসুলগুলি তৈরি করেন।
প্রেমজির কাছ থেকে ১৪,৯০০টি ক্যাপসুল উদ্ধার হয়েছে। এগুলিই বিলি করার লক্ষ্য ছিল তাঁর। কিন্তু একা হাতে এই কাজ করা সম্ভব নয় বলে জানতেন তিনি। তদন্তকারীদের সন্দেহ, কয়েক জনকে এই ক্যাপসুল বিলি করার কাজে লাগান তিনি। কিন্তু কাদের নিয়োগ করেছেন, কত ক্যাপসুল তাঁরা বিলি করেছেন, তা খুঁজে বার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ পুলিশের কাছে। প্রেমজিকে জেরা করে সব তথ্য আদায়ের চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
প্রেমজি কেন এই হামলার পরিকল্পনা করেছিল, তা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্তে তাঁর ইরান ও ইরাকে বার বার যাতায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর মা ও বোন ইরানে থাকেন। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি একাধিক বার এই দুই দেশে গিয়েছেন। গত এক বছরেই তিনি ১৯ বার ইরান ও ইরাক সফর করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ, যা তদন্তকারীদের সন্দেহকে ঘনীভূত করেছে।
তিনি একাই এই কাজ করেছেন, না কি অন্য কেউ বা কোনও সংগঠন এর সঙ্গে জড়িত ছিল, তা জানতে পুলিশ তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ফোনের তথ্য, অনলাইন যোগাযোগ ও পরিচিতদের সম্পর্কে তদন্ত করছে। পুলিশের দাবি, প্রেমজি স্বীকার করেছেন যে তিনি ১৫,০০০ মানুষকে নিশানা করেছিলেন। তবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে তদন্ত চলছে।