চার লক্ষের রাইফেল, লাখ লাখ টাকার সোনা, কোটি কোটি টাকার জমি! কত সম্পত্তির মালিক বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট?
বিহারের দ্বিতীয় বৃহত্তম ওবিসি সমাজ কুশওয়াহাদের প্রতিনিধি বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি সম্পত্তি, সোনা এবং নানা ধরনের বিনিয়োগ মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার মালিক। গত বছর (২০২৫ সালে) নির্বাচনের জন্য দাখিল করা তাঁর সর্বশেষ হলফনামা অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক, বিনিয়োগ এবং সম্পত্তি মিলিয়ে সম্রাটের হাতে রয়েছে কত?
বিহারের কুর্সিতে নতুন ‘সম্রাট’। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নীতীশ কুমারের পদত্যাগের পর বুধবার স্থলাভিষিক্ত হলেন সম্রাট চৌধরি। নীতীশ ইস্তফা দেওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক মহলে। বিহারের শাসকজোটের বৃহত্তম শরিক বিজেপির তরফেই কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে, তা নিশ্চিত ছিল। পদ্মশিবিরের একাধিক বিধায়কের নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও শেষমেশ ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে সম্রাটের।
রাজনীতির আঙিনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত সম্রাট। বিজেপির তরফে সম্রাটই প্রথম, যিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন। ছোট থেকে রাজনৈতিক পরিবেশেই বড় হয়েছেন সম্রাট। আগের মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন নীতীশের ডেপুটি। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় এগিয়ে ছিলেন সম্রাট। শেষ পর্যন্ত তাঁর নামেই সিলমোহর পড়ল।
সম্রাটের বাবা-মা দু’জনেই পুরোদস্তুর রাজনীতি করেছেন। সম্রাটের বাবা শকুনি চৌধরি একসময় সমতা পার্টির সাংসদ ছিলেন। মা পার্বতী দেবী ছিলেন একই দলের বিধায়ক। পরে অবশ্য তাঁরা দু’জনেই লালুপ্রসাদ যাদবের দল আরজেডিতে যোগ দেন। সম্রাটের রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি আরজেডিতেই। বাবা-মাকে অনুসরণ করে ১৯৯০ সালে লালুর দলে যোগ দেন সম্রাট।
১৯৯৯ সালে লালু-পত্নী রাবড়ি দেবীর সময় কৃষিমন্ত্রী করা হয়েছিল সম্রাটকে। ২৫ বছরের কম বয়সেই মন্ত্রী হওয়ার অভিযোগ ওঠে সম্রাটের বিরুদ্ধে। সে নিয়ে বিহারের রাজ্য-রাজনীতিতে বেশ শোরগোল উঠেছিল। বিহারের তৎকালীন রাজ্যপাল সুরজ ভান সম্রাটকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত করেন।
সম্রাটের বিরুদ্ধে দলের মধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সম্প্রতি পটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে ‘গো ব্যাক স্লোগান’ শুনতে হয়। তবে বিকল্প হিসাবে একাধিক নাম এলেও, অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সম্রাটই শেষ চালে বাজিমাত করলেন।
আরও পড়ুন:
বিহারের দ্বিতীয় বৃহত্তম ওবিসি সমাজ কুশওয়াহাদের প্রতিনিধি বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট সম্পত্তি, সোনা এবং নানা ধরনের বিনিয়োগ মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার মালিক। গত বছর (২০২৫ সালে) নির্বাচনের জন্য দাখিল করা তাঁর সর্বশেষ হলফনামা অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক, বিনিয়োগ এবং সম্পত্তি মিলিয়ে সম্রাটের হাতে রয়েছে ১১ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ।
সম্রাট তাঁর অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তির যে হিসাব পেশ করেছিলেন, সেই নথি অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১.৩৫ কোটি টাকা। নির্বাচনের সময় তাঁর কাছে নগদ ১৩,৫০০ টাকা ছিল, আর তাঁর স্ত্রীর কাছে ছিল ৩৫,০০০ টাকা। বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তাঁর ২৭ লক্ষ টাকারও বেশি জমা ছিল।
প্রায় এক দশক আগে তাঁর ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৯ লক্ষ টাকা। ১০ বছরের মধ্যেই তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে বলে দাবি তুলেছিল বিরোধী দল। ২০২৫ সালের হলফনামা অনুসারে সম্রাটের কাছে নগদ ১,৩৫,০০০ টাকা ছিল।
সেই সময় তাঁর বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যথাক্রমে ১,০১৮,৪৩৮ টাকা এবং ৩,০৯,৬৮৮ টাকা জমা ছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পে ৪ লক্ষ ১৮ হাজার ৩০ টাকা, ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ৯২ টাকা এবং ২২ লক্ষ ৪২ হাজার ৫৪৭ টাকা জমা করেছেন। জীবন বিমার পলিসিতে ৮ লক্ষ ৭ হাজার ৪২০ টাকা, পিপিএফে ১০ লক্ষ ২৮ হাজার ৫০২ টাকা এবং অন্যান্য বিমা পলিসিতে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
আরও পড়ুন:
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তারাপুরের বিধায়ক সম্রাটের কাছে প্রায় ২০০ গ্রাম সোনা রয়েছে, যার বর্তমান মূল্য ৩০ লক্ষ টাকা। এ ছাড়া, তাঁর স্ত্রী মমতা কুমারীর কাছেও সমপরিমাণ মূল্যের সোনা এবং প্রায় ৭৫ হাজার টাকার রুপো রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের দু’জনের কাছে মোট প্রায় ৬০ লক্ষ টাকার সোনা রয়েছে।
এ ছাড়াও স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে মুঙ্গেরের তারাপুর, মানিকপুর এবং খাজপুরায় ৮ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কৃষিজমি ও অন্যান্য জমির মালিকানা রয়েছে সম্রাটের হাতে। তাঁর স্ত্রীরও ৫০ লক্ষ টাকার কৃষিজমি রয়েছে। এ ছাড়াও, তাঁর স্ত্রীর নামে পটনায় একটি বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে। সেটির বাজারদর ৫৮ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সম্রাট বা তাঁর স্ত্রী মমতা কারওরই কোনও আবাসিক সম্পত্তি নেই।
‘মাইনেতা ডট কম’ নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর মালিকানায় একটি বোলেরো নিও গাড়ি রয়েছে। এটির মূল্য প্রায় ৭ লক্ষ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, তাঁর কাছে ৪ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি এনপি বোর রাইফেল রয়েছে। বাবার কাছ থেকে একটি রিভলবার উপহার পেয়েছেন তিনি। সেটির দাম ২ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালের হলফনামায় তাঁর মোট অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৯৯.৩২ লক্ষ টাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সম্রাট বিহারের অন্যতম ধনী রাজনীতিবিদ। সম্পদের নিরিখে বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এবং আরজেডির তেজস্বী যাদব উভয়কেই ছাড়িয়ে গিয়েছেন তিনি। সম্রাটের মোট সম্পত্তির ৮৫ শতাংশই স্থাবর সম্পত্তি।
সম্রাট চৌধরির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল গত বছর ভোটের সময়। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তিনি মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রি-ফাউন্ডেশন কোর্স (পিএফসি) করেছেন। এ ছাড়াও তিনি সাহিত্যে একটি সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন।
তবে তিনি আদৌ দশম শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়েছেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধী দল। সম্রাট জোর দিয়ে জানান, তিনি প্রি-ফাউন্ডেশন কোর্সটি (পিএফসি) সম্পন্ন করেছেন।
কৃষিমন্ত্রীর পদ খোয়ানোর পর ২০০০ সালে আরজেডি পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর আবার মন্ত্রীর চেয়ারে বসেন সম্রাট। সে বার অবশ্য তিনি পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদই শেষ করতে পেরেছিলেন। ২০০৫ এবং ২০১০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আরজেডির পরাজয়ের পরেও দলীয় আনুগত্য বদলাননি সম্রাট।
২০১৪ সালে দলের শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে নীতীশের দল জেডিইউ-তে যোগ দেন তিনি। জিতনরাম মাঁজি মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয় তাঁকে। তবে নীতীশ মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব ফের নিজের হাতে নেওয়ার পর মন্ত্রিত্ব যায় সম্রাটের। ২০১৭ সালে বিজেপির হাত ধরেন সম্রাট। ২০২৪ সালে নীতীশ ফের এনডিএ শিবিরে ফিরলে নতুন মন্ত্রিসভায় একাধিক দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয় সম্রাটকে।