জলখাবারের টেবিলে প্রথম কথা, গুগ্ল করে জেনেছিলেন ‘গোপন কথা’, রাঘবের সঙ্গে গভীর রাতে লুকিয়ে দেখা করতেন পরিণীতি
একই জায়গায় পড়াশোনা, সেখানে কিছু দিন কাজ করে আবার দেশে ফিরে আসা— জীবনের অধ্যায়ে মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও রাঘব চড্ঢা এবং পরিণীতি চোপড়ার আলাপ ছিল না সেই সময়। অথচ কয়েক বছর পর সেই শহরই আবার মিলিয়ে দিল রাঘব-পরিণীতিকে।
রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁকে বিয়েই করবেন না— ছবির প্রচার করার সময় এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন বলি অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া। সেই সাক্ষাৎকার দেওয়ার চার বছরের মধ্যেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন অভিনেত্রী। তাঁর জীবনসঙ্গী অরবিন্দ কেজরীবালের আম আদমি পার্টির রাজ্যসভার সাংসদ রাঘব চড্ঢা। এখন অবশ্য সেই পদের আগে ‘প্রাক্তন’ শব্দটি জুড়ে বসেছে। আম আদমি পার্টি ছেড়ে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন পরিণীতির রাজনীতিবিদ স্বামী রাঘব।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে লন্ডনে গিয়েছিলেন পরিণীতি। ম্যাঞ্চেস্টার বিজ়নেস স্কুলে ব্যবসা, অর্থনীতি এবং বিনিয়োগ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তিনটি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর সেখানে গানবাজনা নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন নায়িকা।
কলেজের পড়াশোনা শেষ করে লন্ডনেই চাকরি খুঁজতে শুরু করেছিলেন পরিণীতি। কিন্তু ২০০৯ সালে ব্রিটেনে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে চাকরির আকাল দেখা যায়। ফলে সেখানে হাজার চেষ্টা করেও চাকরি পাচ্ছিলেন না তিনি। বাধ্য হয়ে তাঁকে মুম্বইয়ে ফিরে আসতে হয়।
কাকতালীয় ভাবে, রাঘবও উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন লন্ডনে। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করার পর সেখানকার এক সংস্থায় কিছু দিন চাকরিও করেছিলেন তিনি। তার পর ২০১১ সালে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে এসে রাজনীতিতে যোগ দেন রাঘব। একই জায়গায় পড়াশোনা, সেখানে কিছু দিন কাজ করে আবার দেশে ফিরে আসা— জীবনের অধ্যায়ে মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও রাঘব এবং পরিণীতির আলাপ ছিল না সেই সময়। অথচ কয়েক বছর পর সেই শহরই আবার মিলিয়ে দেয় রাঘব-পরিণীতিকে।
২০২২ সালের ঘটনা। রাঘব তখন রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। অন্য দিকে, অভিনয়জীবনেও ন’বছর অতিক্রম করে ফেলেছেন পরিণীতি। লন্ডনে এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে আমন্ত্রিত ছিলেন নায়িকা। একই অনুষ্ঠানে জনসেবামূলক কাজে গিয়েছিলেন রাঘব।
আরও পড়ুন:
অনুষ্ঠানের দিন রাঘব এবং পরিণীতির দেখা হলেও তাঁদের আলাপ হয়নি। পরের দিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল অতিথির জন্য বিলাসবহুল হোটেলে জলখাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। জলখাবারের টেবিলেই রাঘবের সঙ্গে পরিচয় হয় পরিণীতির।
আধ ঘণ্টার আলাপে পেশাজীবন থেকে জীবনদর্শন— প্রায় সব কিছু নিয়েই রাঘবের সঙ্গে আলোচনা করে ফেলেছিলেন পরিণীতি। ক্ষণিকের পরিচয়ে রাঘবকে ভাল লেগে যায় তাঁর। রাজনীতিবিদের ব্যক্তিজীবন নিয়েও কৌতূহলী হয়ে পড়েন অভিনেত্রী।
রাঘবের পেশাগত জীবন নিয়ে বিস্তারে জানতে বাড়ি ফিরে তাঁর সম্পর্কে গুগ্ল করেছিলেন পরিণীতি। রাঘব ‘সিঙ্গল’ রয়েছেন না কি অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছেন— গুগ্লের মাধ্যমে রাঘবের ‘গোপন জীবনে’ও উঁকিঝুঁকি দিয়েছিলেন নায়িকা। রাঘব যে ‘সিঙ্গল’ রয়েছেন, তা জানার পর রাজনীতিবিদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন পরিণীতি।
অধিকাংশ সময় রাঘবের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন পরিণীতি। কম সময়ের মধ্যে তাঁদের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। পরস্পরকে ভালবেসে ফেলেন তাঁরা। কিন্তু এই সম্পর্কের কথা আ়ড়ালে রাখতে চেয়েছিলেন দু’জনেই। নিয়ম করে দেখাসাক্ষাৎ করা চললেও তা ঘটছিল অতি সন্তর্পণে।
আরও পড়ুন:
শোনা যায়, কখনও গভীর রাতে কোনও রেস্তরাঁয় রাঘবের সঙ্গে দেখা করতেন পরিণীতি। আবার কখনও গুরুদ্বারে একসঙ্গে যেতেন। গুরুদ্বারের ভিতর একসঙ্গে সময় কাটালেও সেখান থেকে বেরোতেন আলাদা ভাবে।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, একটি হিন্দি ছবির শুটিংয়ের জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন পরিণীতি। প্রেমিকাকে ‘সারপ্রাইজ়’ দিতে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন রাঘবও। সম্পর্কের কথা গোপন রাখার চেষ্টা করলেও তা বেশি দিন আড়ালে থাকেনি। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন রেস্তরাঁয় একসঙ্গে দেখা যেতে থাকে পরিণীতি এবং রাঘবকে।
রাঘবের প্রসঙ্গে পরিণীতি মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও রাজনীতিবিদকে একই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমায় রাজনীতি নিয়ে যাবতীয় প্রশ্ন করতে পারেন। আমি আপত্তি জানাব না। কিন্তু পরিণীতিকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন করবেন না।’’
এক বছর সম্পর্কে থাকার পর ২০২৩ সালের মে মাসে নয়াদিল্লির কপূরথলা হাউসে রাঘবের সঙ্গে বাগ্দান সেরে ফেলেন পরিণীতি। সেই সময় নায়িকার দেওয়া একটি পুরনো সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যে আসে। ২০১৯ সালে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে পরিণীতি স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘‘রাজনীতিবিদকে আমি কখনওই বিয়ে করব না। বেছে নেওয়ার মতো বহু সুযোগ্য পাত্র রয়েছেন। তবুও আমি কোনও রাজনীতিককে বিয়ে করব না।’’ যদিও সাক্ষাৎকার দেওয়ার চার বছরের মাথায় নিজের মত পরিবর্তন করে ফেলেন অভিনেত্রী।
বাগ্দানের চার মাস পর সেপ্টেম্বরে রাজস্থানের উদয়পুরে লেক পিচোলার ধারে রাঘব এবং পরিণীতির চারহাত এক হয়। বিয়ের এক মাস পর প্রেক্ষাগৃহে পরিণীতির একটি ছবি (‘মিশন রানিগঞ্জ’) মুক্তি পায়। ২০২৪ সালে ওটিটির পর্দায় দিলজিৎ দোশাঞ্জের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘অমর সিংহ চমকিলা’ ছবিতে অভিনয় করেন নায়িকা। তার পর আর কোনও ছবিতেই দেখা যায়নি পরিণীতিকে।
বিয়ের দু’বছরের মাথায় পুত্রসন্তানের জন্ম দেন পরিণীতি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পুত্র নীরের জন্ম হয়। এক মাস পর রাঘব এবং পরিণীতি দু’জনেই তাঁদের পুত্রের নাম ঘোষণা করেন সমাজমাধ্যমের পাতায়।
বেশ কয়েক দিন ধরেই আম আদমি পার্টির সঙ্গে রাঘবের অন্দরের সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছিল। রাঘবকে পদচ্যুত করেছিল দল। রাজ্যসভার উপদলনেতার পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার পরেই রাঘবের বিজেপিতে যোগ দেওয়া নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। কেন্দ্রের শাসকদলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথাও শোনা যাচ্ছিল।
একসময় রাঘব বিজেপিকে ‘ওয়াশিং মেশিন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘‘বিজেপিতে যোগ দিলে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা পরিচ্ছন্ন হয়ে যান।’’ শুক্রবার দিল্লি থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কথা নিজেই ঘোষণা করলেন রাঘব।