মহাশূন্যের চৌকাঠ থেকে আঘাত হানবে দানবীয় ‘পাখি’! এক লক্ষ টনের চিনা ‘মহাকাশ যুদ্ধজাহাজ’ কি স্রেফ ভাঁওতা?
মহাকাশের প্রান্তে উড়ে বেড়াবে বিমানবাহী নভোযান। অতিকায় সেই মহাকাশ ‘যুদ্ধজাহাজের’ ওজন ১ লক্ষ ২০ হাজার টন। উড়ন্ত বিমানবাহী নভোযানটির পোশাকি নাম লুয়ানিয়াও। এটি ন্যান্টিয়ানমেন নামের একটি প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত কাল্পনিক আকাশযান। আকাশ ও মহাকাশে প্রতিরক্ষার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা তৈরির একটি বড় পরিকল্পনা নিয়েছে বেজিং।
ঠিক যেন কল্পবিজ্ঞানের পাতা থেকে উঠে আসা এক অতিকায় বিমানবাহী নভোযান। ডানা মেলবে মহাকাশে! কল্পকাহিনি নির্ভর সেই আকাশযানকে বাস্তব রূপ দিতে চায় ড্রাগনের দেশ। ‘মহাকাশ যুদ্ধজাহাজের’ যে কাল্পনিক কাঠামোর ঝলক প্রকাশ্যে এসেছে তা দেখে মনে হয়েছে স্টার ওয়ার্স ফিল্ম বা মার্ভেলের দ্য অ্যাভেঞ্জার্সের দেখানো বিমানগুলির থেকে কোনও অংশে কম নয়।
লুয়ানিয়াও বা লুয়ান নিয়াও চিনের প্রতিরক্ষা গবেষণার অংশ। লুয়ানিয়াওয়ের অর্থ লুয়ান পাখি। পৌরাণিক কালের ফিনিক্স-সদৃশ প্রাণী হল লুয়ান। বিষয়টি মূলত চিনের লালফৌজের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নির্ভর পরিকল্পনার অংশ। সম্প্রতি চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) এই পরিকল্পিনা সংক্রান্ত ভিডিয়ো এবং আকাশযানটির বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ্যে আনতেই তা নজর কেড়েছে বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির।
লুয়ানিয়াও হল ন্যান্টিয়ানমেন নামের একটি প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত একটি কাল্পনিক আকাশযান। আকাশ ও মহাকাশে প্রতিরক্ষার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা তৈরির একটি বড় পরিকল্পনা নিয়েছে বেজিং। চিনের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা এমন একটি ধারণার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন, যেটি বাস্তবায়িত করতে অন্তত ৩০ বছর সময় লাগতে পারে।
চিনের সংবাদমাধ্যমে দাবি, এটি কোনও সাধারণ সামরিক পরিকল্পনা নয়। বরং শি জিনপিং সরকারের ‘স্ট্র্যাটেজিক সায়েন্স ফিকশন প্রোডাকশন’-এর অংশবিশেষ। চিনের বিমান মহাকাশ বিজ্ঞান ও শিল্প কর্পোরেশনের একটি বিশেষ প্রদর্শনী বা প্রচার কৌশল। এর মাধ্যমে চিন অদূর ভবিষ্যতে তাদের সম্ভাব্য উন্নত প্রযুক্তি এবং আকাশপথে আধিপত্য বিস্তারের একটি কাল্পনিক রূপরেখা তুলে ধরতে চায়।
সেই ভিডিয়ো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিমানবাহী এই নভোযানটি মহাকাশের প্রান্তে উড়ে বেড়াবে। মনুষ্যবিহীন সেই আকাশযানটি জেট এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম। যদিও অনেকেই এটিকে চিনের প্রতিরক্ষা প্রচারের কৌশল বলে দাবি তুলেছেন। যদিও উড়ন্ত বিমানবাহী রণতরীটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে বেজিংয়ের কমপক্ষে তিন দশক সময় লাগবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
আরও পড়ুন:
লুয়ানিয়াও হল একটি বিশালকৃতির এয়ারবোর্ন এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার বা মহাশূন্যে ভাসমান বিমানবাহী ‘মহাকাশ যুদ্ধজাহাজ’। সহজ কথায়, এটি এমন একটি দানবীয় যান যা আকাশেই অবস্থান করবে এবং সেখান থেকে যুদ্ধবিমান বা ড্রোন ওঠানামা করতে পারবে।
কাল্পনিক নকশা অনুযায়ী বিমানবাহী নভোযানটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪২ মিটার এবং এর ডানার বিস্তার প্রায় ৬০০ মিটারের মতো হবে বলে জানা গিয়েছে। এক লক্ষ টনেরও বেশি ওজনের বিমানটি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে এটি দেখতে হবে ডানাওয়ালা ধূসর ত্রিভুজের মতো। বর্তমানে ব্যবহৃত যে কোনও বিমানবাহী জাহাজের চেয়ে কয়েক গুণ ভারী।
চিনের কাল্পনিক নভোযানটি বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনার ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের দ্বিগুণ লম্বা এবং তিন গুণ চওড়া হবে বলে জানা গিয়েছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের ওজন এক লক্ষ টন। ডানার বিস্তার সাতটি ফুটবল মাঠের আকার যোগ করলে যা দাঁড়ায় তার চেয়েও বেশি প্রশস্ত।
চিনের এই প্রস্তাবিত ‘স্টার ওয়ার্স স্পেসশিপ’ ৮৮টি মনুষ্যবিহীন স্টিলথ ফাইটার ড্রোন বহন করার জন্য নকশা করা হবে। এর নাম জুয়ান নু, যার অর্থ ‘রহস্যময়ী নারী’। শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে এতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেজ়ার বন্দুক এবং পার্টিকেল এক্সিলারেটর কামানও থাকবে। হাইপারসনিক (যে অস্ত্রগুলি শব্দের চেয়ে কমপক্ষে পাঁচ গুণ বেশি জোরে ছুটতে পারে) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দিয়ে সজ্জিত করা হবে ড্রোনগুলিকে।
আরও পড়ুন:
বায়ুমণ্ডলের একেবারে শেষ সীমানায় বা মহাকাশের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করবে এই ‘লুয়ান পাখি’, যেখানে সাধারণ রেডার বা ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছোনো প্রায় অসম্ভব। ভূমি থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরিসরের বহু উপরে গিয়ে আঘাত হানতে পারবে এই দানবীয় যানটি। শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এতে অদৃশ্য রক্ষাকবচ বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক শিল্ডের কথা ভাবা হয়েছে।
ভবিষ্যতের এই বিমানবাহী মহাকাশ যুদ্ধবিমানটি চালানোর জন্য নিউক্লিয়ার ফিউশন ড্রাইভের মতো উচ্চতর প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে। এটি এমন একটি মহাকাশযান প্রপালশন প্রযুক্তি, যা ডিউটেরিয়াম এবং হিলিয়াম-৩-এর মতো হালকা পরমাণু থেকে উৎপন্ন বিপুল শক্তি ব্যবহার করে প্রচণ্ড থ্রাস্ট বা ধাক্কা তৈরি করা হয়। কম জ্বালানি খরচ করে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সৌরজগতে মহাকাশযান পাঠানোর আধুনিক পদ্ধতি বলে ধরা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন ড্রাইভকে।
‘স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইক ক্লাস্টার’ দিয়ে সজ্জিত থাকবে এই যানটি। থাকবে বাইডি নামের একটি ষষ্ঠ বা সপ্তম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার জেট, যেটির প্রোটোটাইপ বা মডেল ২০২৪-’২৫ আর্থিক বছরের ঝুহাই এয়ার শো-তে প্রদর্শিত হয়েছে। এটি মহাকাশ এবং আকাশ উভয় জায়গা থেকে আঘাত হানতে সক্ষম। থাকবে জিহুয়ো নামের একটি ভার্টিক্যাল টেক-অফ এবং ল্যান্ডিং ড্রোনও। ড্রোনগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
মহাকাশের দ্বারপ্রান্ত থেকে উৎক্ষেপণের পর এই ড্রোনগুলি প্রায় সমস্ত বর্তমান সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলকে ফাঁকি দিতে পারে। ঘন বায়ুমণ্ডলের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুকে বাধা দেওয়ার জন্য মূলত এই ড্রোনগুলির নকশা করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা গবেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ১ লক্ষ ২০ হাজার টন ওজনের একটি প্ল্যাটফর্ম উত্তোলন করতে যে থ্রাস্ট দরকার তার জন্য প্রায় ৩৫,০০০ টন বল বা ৩৪০ মেগানিউটন শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। এই প্রয়োজনীয়তাকে প্রাসঙ্গিক ভাবে বিবেচনা করলে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে ব্যবহৃত প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি এফ১২৫ ইঞ্জিন ১৯১ কিলোনিউটন শক্তি উৎপাদন করে। এর অর্থ ‘লুয়ান পাখি’কে ওড়ানোর জন্য ১,৭০০টিরও বেশি এফ১২৫ ইঞ্জিনের প্রয়োজন হবে। ৬৪০ টন ওজনের তৈরি সবচেয়ে ভারী বিমান, আন্তোনভ আন-২২৫ ম্রিয়ার থেকেও প্রায় ২০০ গুণ বেশি শক্তি প্রয়োজন হবে।
চিনের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই রণতরীটি প্রচলিত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং আধুনিক যুদ্ধবিমানের নাগালের বাইরে থাকবে। মহাকাশের কাছাকাছি থেকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক পিটার লেটনের বক্তব্য উদ্ধৃতি করে বলা হয়েছে, পূর্ব এশিয়ার মহাশক্তিধর রাষ্ট্রটি যদি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করে ফেলে তা হলে এই ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য চাপে ফেলতে পারে।
প্রতিরক্ষা-কেন্দ্রিক একটি প্রতিবেদন ‘এন্ড টাইম হেডলাইনস২’-এ বলা হয়েছে, চিন এমন একটি মহাকাশযানের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রান্ত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম। তাও আবার মনুষ্যবিহীন যুদ্ধবিমান থেকে।
মজার বিষয় হল, জনসাধারণের মধ্যেও প্রকল্পটি নিয়ে কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ছে। ৪০,০০০ বর্গমিটার আয়তনের নান্টিয়ানমেন প্রকল্পের ‘সাই-ফাই পার্ক’ বর্তমানে সাংহাইতে নির্মাণাধীন। ২০২৭ সালের ১ অগস্ট এই পার্কটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে খবর।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে এই ধরনের ক্ষমতা চিনকে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চিন সাগরের মতো সম্ভাব্য সংঘর্ষস্থলে কৌশলগত সুবিধা প্রদান করতে পারে। এই অঞ্চল জুড়ে আমেরিকা ও চিনের দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিদ্যমান। দুই শক্তিধর রাষ্ট্রই এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। তবে এই পরিকল্পনাটি আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না তা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের শেষ প্রান্তে এমন বিশালাকৃতির একটি প্ল্যাটফর্ম স্থাপন বা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, জ্বালানি দক্ষতা এবং উৎক্ষেপণের পরিকাঠামো বর্তমানে কোনও দেশের হাতেই নেই। ১ লক্ষ ২০ হাজার টনের একটি যান আকাশে ভাসিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করছেন তাঁরা।