Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

চিত্র সংবাদ

First Kashmir War - Unsung Hero: ২৬ টাকা ‘চুরি’ করে জেল, প্রেমে পড়ে ধর্ম বদল, পাকিস্তানের লাদাখ দখল রুখেছিলেন ইনি

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ২১ নভেম্বর ২০২১ ১২:৪৯
‘থ্রি ইডিয়টস’-এর শ্যুটিং হত না। হয়তো কোনও ‘ফুংশুক ওয়াংড়ু’ও তৈরি হত না লাদাখে। যদি তিনি না থাকতেন।

নাম সেতান ফুন্টসোগ। লাদাখ যে আজও ভারতে তার কারণ তিনিই।
Advertisement
পাকিস্তানের লাদাখ দখল আটকেছিলেন। তাঁর সাহায্য পেয়েই লাদাখ সীমান্তে চরম বিপদের মুহূর্তে বলবৃদ্ধি হয়েছিল ভারতীয় সেনার। তারপরও সেতানকে খুব কম মানুষই চেনেন।

ভারতীয় সেনা অবশ্য সেতানের ঋণ ভোলেনি। যুদ্ধের সময়ে ভারতীয় বাহিনীর দায়িত্বে থাকা এক মেজর জেনারেল কর্নেল ঠাকুর পৃথ্বী চাঁদ তাঁর বইয়ে লিখে গিয়েছেন, কী ভাবে সেতান সাহায্য করেছিলেন, পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কঠিন সময়ে।
Advertisement
১৯৪৮ সাল। ভারতভুক্তি আইনে কিছুদিন আগেই স্বাক্ষর করেছেন কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংহ। সেই পদক্ষেপে ক্ষিপ্ত পাকিস্তান লাদাখ দখল করতে আসে। গিলগিট বাল্টিস্তানের স্কার্ডু ততদিনে পাকিস্তানের দখলে। লাদাখ নিয়েও বেশ অনিশ্চিত সরকার। শেষ চেষ্টা হিসেবেই সেনা পাঠানো হয় নুব্রা ভ্যালিতে।

পাকিস্তান থেকে লাদাখের প্রবেশ পথ নুব্রা। সেতান সেখানকার প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন।

পেশায় সরকারি আধিকারিক। অথচ এই ঘটনার কয়েক বছর আগে সরকারই জেলে ভরেছিল সেতানকে।

মাত্র ২৬ টাকা চুরির দায়ে শাস্তি হয়েছিল। পরে অবশ্য নির্দোষ প্রমাণিত হন। তাঁকে সসম্মানে ফিরিয়েও আনা হয় কাজে।

তবে সেতানের জীবন বরাবরই ঘটনাবহুল। নানা ওঠাপড়ার সমাবেশ। বারবার ধাক্কা খেয়েছেন। উঠে দাঁড়িয়েওছেন।

লাদাখের অভিজাত পরিবারের সন্তান। লাদাখি রাজার মন্ত্রী-সান্ত্রীরা সব সেতানেরই পরিবারের সদস্য। যদিও সেতান নিজে রাজকাজে আগ্রহী ছিলেন না।

সেতানের বাবা ছিলেন বৌদ্ধ গুম্ফা রিজংয়ের প্রধান শিষ্য। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছে ছিল সেতানেরও। ছোট থেকেই গুম্ফায় শুরু হয় তাঁর সন্ন্যাসী হওয়ার প্রশিক্ষণ।

কিন্তু সেতানের জীবন বদলে যায় লাদাখের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জোসেফ গারগাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর।

বৌদ্ধ মঠে সেতানের প্রশিক্ষণ ততদিনে অনেকদূর এগিয়েছে। জ্ঞানী বলে নাম ডাকও হয়েছে লাদাখে। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে প্রায়শই আসছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। ঠিক এই সময়েই তাঁর দেখা হয় জোসেফের সঙ্গে।

শিক্ষাবিদ জোসেফ ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মীয়।  বাইবেলের তিব্বতী সংস্করণের অনুবাদ করেছিলেন তিনি। সেতানের জীবন দর্শন বদলে যায় জোসেফের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর।

পরে জোসেফের কন্যার প্রেমেও পড়েন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। কিন্তু বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম। জোসেফ জেদ ধরেন বিয়ে করতে হলে সেতানকে ধর্মান্তরিত হতে হবে। বাধ্য হয়েই খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন সেতান।

বিয়ে হয়। তবে এবার নিজের পরিবারের কোপে পড়েন সেতান। তাঁকে সমস্ত সম্পত্তি এবং সম্পর্ক থেকে চ্ছিন্ন করা হয়। তারপরও সেতান হাল ছাড়েননি। সরকারি কাজে যোগ দেন তিনি। দেশের হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন বছর খানেক পরই।

ঠিক কী করেছিলেন সেতান? প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে স্কার্ডু জয়ের পর  তখন পাকিস্তানের হামলাকারীরা ক্রমশ এগোচ্ছে লাদাখ লক্ষ্য করে। পাকিস্তানের আক্রমণকারীদের ঠেকাতে কর্নেল পৃথ্বীকে পাঠানো হয়েছে নুব্রায়। তার সঙ্গে মাত্র ১৪ জনের একটি দল। আর রাজ্যের এক প্লাটুন অর্থাৎ ৩০ জন সৈন্য।  কিন্তু  এই কয়েকজন সৈন্য নিয়ে কী ভাবে আক্রমণ ঠেকাবেন, তার কূল কিনারা পাচ্ছেন না পৃথ্বী।

নুব্রায় তখন বেশ প্রতিপত্তি সেতানের। পৃথ্বী তাঁর বইয়ে লিখেছেন, সেতানের কথায় নুব্রার গ্রামের ছেলেরা যোগ দিয়েছিলেন বাহিনীতে। তৈরি হয়েছিল প্রায় ২০০ জনের নুব্রা গার্ডস বা নুব্রা সুরক্ষা বাহিনী। সেতান সেই বাহিনীর দিনরাত খেয়াল রাখতেন। তাঁরা ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে কি না, অস্ত্র পাচ্ছে কি না, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না সব দেখতেন সেতান।

পৃথ্বী লিখেছেন, ‘‘সকালে হয়ত দেখলাম তিনি সেনা শিবিরে কাজ করছেন। বিকেলে দেখা গেল যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের যানবাহনের বিষয়গুলি দেখা শোনা করছেন।’’

এমনকি বহুবার সেতানের যোগাযোগ মারফত পাওয়া খবরেই অনেক বড় হামলার হাত থেকে বেঁচেছেন বলেও ওই বইয়ে লিখেছেন পৃথ্বী।

শেষপর্যন্ত যুদ্ধ জিতেছে ভারতীয় সেনা। যার অনেকটা কৃতিত্ব পৃথ্বী দিয়েছেন সেতানকেই।

এরপরেও অনেক কিছু হয়েছে সেতানের জীবনে। জন ব্রে নামের এক ঐতিহাসিক তাঁর কথা লিখেছেন। জন জানিয়েছেন, যখনই সুযোগ পেয়েছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন সেতান। কখনও তিব্বতের শরণার্থীরা তাঁর থেকে উপকৃত হয়েছেন তো কখনও খ্রিস্টান মিশনারিরা। সেতানের সাহায্য রথ থামেনি। পরে ছোটদের জন্য বিনামূল্যের স্কুলও খুলেছেন।

১৯৭৩ সালে মৃত্যু হয় সেতানের । পৃথ্বী লিখেছেন, ‘‘আমার কাছে সেতান সেরা লাদাখি। তার মতো মানুষ দেখিনি। সেতানের মৃ্ত্যু অনেকের কাছেই দুঃখের। তবে আমি আমার এক বন্ধু আর একইসঙ্গে একজন আদর্শ মানুষকে হারিয়েছিলাম।’’