৬০ টাকা নয়, আরও বাড়তে পারে সিলিন্ডারের দাম? অশোধিত তেলের বদলে ‘অম্লরোগ’ বৃদ্ধির পথে গ্যাস!
অপরিশোধিত খনিজ তেল নয়, পশ্চিম এশিয়ার ইরান যুদ্ধের জেরে দেশে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের বাড়ছে উদ্বেগ। কারণ, এলএনজি এবং এলপিজি— দু’টি জ্বালানির ক্ষেত্রেই খুব বেশি বিকল্প হাতে নেই প্রশাসনের।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গোটা পশ্চিম এশিয়া। সেই আঁচ এসে লেগেছে ভারতের গায়েও। এত দিন উপসাগরীয় আরব মুলুকগুলি থেকে দিব্যি অপরিশোধিত খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (লিক্যুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) আমদানি করছিল নয়াদিল্লি। সংঘাত শুরু হওয়া ইস্তক ব্যাহত সেই সরবরাহ। পরিস্থিতির বদল না হলে এ দেশের আমজনতার হেঁশেলে উনুন জ্বলা যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য! আর তাই এই ইস্যুতে চওড়া হচ্ছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের কপালের ভাঁজ।
বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ইরান যুদ্ধের জেরে অপরিশোধিত খনিজ তেল নিয়ে তেমন চিন্তা নেই ভারতের। কারণ, তরল সোনার জন্য শুধুমাত্র পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল নয় নয়াদিল্লি। গত কয়েক বছর ধরে অন্তত ৪০টি দেশের থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল আমদানি করছে কেন্দ্র। কিন্তু তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের হিসাব একেবারে আলাদা। এ দেশে ব্যবহৃত এলএনজির সিংহভাগ আসে হাতে গোনা দু’-তিনটি আরব রাষ্ট্র থেকে। পাশাপাশি, এ ব্যাপারে একগুচ্ছ বিকল্পও যে সরকারের হাতে আছে, এমনটা নয়।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক সূত্রে খবর, ভারতে আমদানি করা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের বেশির ভাগটাই আসে পশ্চিম এশিয়ার তিনটি দেশ থেকে। সেগুলি হল কাতার, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। ঐতিহাসিক ভাবে নয়াদিল্লিকে সর্বাধিক এলএনজি সরবরাহ করে আসছে দোহা। পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে ব্যবহৃত তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় অর্ধেক আসে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি থেকে। কিন্তু, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এলএনজির উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কাতার।
এলএনজির অন্য সরবরাহকারীদের তালিকায় নাম আছে নাইজ়েরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সংঘাত পরিস্থিতিতে এই দেশগুলিই যে নয়াদিল্লির একমাত্র ভরসা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে দূরত্বের কারণে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলি থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি বৃদ্ধি করলে বাড়বে পরিবহণ খরচ। তা ছাড়া ভারতের পূর্ব উপকূলে এলএনজি পাঠিয়ে থাকে ক্যানবেরা। ফলে দেশের অভ্যন্তরে ওই গ্যাস পরিবহণে মেলা টাকা খরচ করতে হবে সরকারকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে বেশি পরিমাণে এলএনজি কেনায় আবার অন্য জটিলতা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের খরচ তুলতে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারে ওয়াশিংটন। সেটা নয়াদিল্লির পক্ষে একেবারেই স্বস্তিজনক নয়। লিক্যুইফায়েড পেট্রেলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির হিসাব আরও জটিল। এই জ্বালানির ৬৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে নয়াদিল্লি, যার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ আবার আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে।
আরও পড়ুন:
ভারতে এলপিজি সরবরাহকারী মূল দেশগুলি হল আমিরশাহি, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান এবং বাহরিন। তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের একমাত্র বিকল্প হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছর এ ব্যাপারে আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তি সেরেছে ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম। ফলে ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় এলাকা থেকে বছরে ২২ লক্ষ টন এলপিজি আমদানি করতে পারবে ওই তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা।
সূত্রের খবর, এলপিজির সঙ্কট মেটাতে ইতিমধ্যেই নরওয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। যুক্তরাষ্ট্রের থেকেও তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের আমদানি বৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারে মোদী প্রশাসন। তবে এলএনজির মতো এ ক্ষেত্রে পরিবহণ ও দাম, দু’দিক দিয়েই খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকছে। এত দিন পারস্য ও ওমান সাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ় প্রণালী দিয়ে গ্যাস ঘরে আনছিল নয়াদিল্লি। সংঘাত পরিস্থিতিতে তা পুরোপুরি বন্ধ করেছে ইরান।
তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম রফতানিকারী দেশ হল রাশিয়া। মস্কোর হাতে রয়েছে এলএনজির বিশাল ভান্ডার। এর বৃহত্তম ক্রেতা হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সংশ্লিষ্ট সংগঠনভুক্ত পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলিকে ৪৯ শতাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করে থাকে ক্রেমলিন। তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে চিন ও জাপান। গত কয়েক বছরে বেজিং ও টোকিয়োকে যথাক্রমে ২৩ ও ১৮ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করেছে একাধিক রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান।
ক্রেমলিনের মতো ‘বন্ধু’ থাকা সত্ত্বেও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে নয়াদিল্লির চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, অপরিশোধিত খনিজ তেলের তুলনায় এই জ্বালানি পরিবহণ করা বেশি বিপজ্জনক। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে এলএনজি সরবরাহে বিশেষ পাইপলাইন রয়েছে মস্কোর। একই রকমের ব্যবস্থা তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে চিন। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে চাহিদামাফিক এলএনজি সরবরাহে রুশ প্রশাসন কতটা রাজি হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই দানা বেঁধেছে সন্দেহ।
আরও পড়ুন:
জ্বালানি হিসাবে এলএনজি এবং এলপিজি, দু’ধরনের গ্যাস ব্যবহার হলেও, এগুলির রাসায়নিক গঠন, পরিবহণ পদ্ধতি এবং কার্যকারিতার মধ্যে ফারাক রয়েছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকৃতপক্ষে মিথেন। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস নীচে চলে গেলে সংশ্লিষ্ট গ্যাসটি তরলে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় নাটকীয় ভাবে হ্রাস পায় মিথেনের আয়তন। ফলে বিশেষ ভাবে তৈরি ক্রায়োজেনিক ট্যাঙ্কারে বিপুল পরিমাণে এলএনজি পরিবহণ করা সম্ভব।
বিদেশ থেকে আমদানির পর তরল থেকে ফের গ্যাসীয় অবস্থায় মিথেনকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর বিতরণ শুরু করে ভারতের একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। এলএনজি মূলত সার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়া একাধিক মেট্রো শহরে পাইপযুক্ত প্রাকৃতিক গ্যাস বা পিএনজি (পাইপ্ড ন্যাচরাল গ্যাস) সরবরাহ করছে গ্যাস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (গেল)। ওই জ্বালানিও প্রকৃতপক্ষে এলএনজি।
এর পাশাপাশি অটো, বাস ও হাইব্রিড গাড়ি-সহ একাধিক যানবাহনে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে সঙ্কুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজি (কমপ্রেস্ড ন্যাচরাল গ্যাস)। এটি তৈরির মূল উৎস হল এলএনজি। অন্য দিকে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় বাড়ি, হোটেল-রেস্তরাঁ বা মিষ্টির দোকানের রান্নাঘরে। এর উৎপত্তির মূলে রয়েছে প্রোপেন এবং বিউটেনের মিশ্রণ। এককথায় এলপিজিকে পেট্রোপণ্যের উপজাত দ্রব্য বললে অত্যুক্তি হবে না।
এলএনজির মতো পেট্রোলিয়াম গ্যাসের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য তাপমাত্রার হেরফের করা হয় না। মাঝারি চাপে এলপিজি তরল অবস্থায় চলে এলে এটিকে সংরক্ষণ করে এ দেশের একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। মূলত সিলিন্ডারে ভরে বাড়ি বাড়ি বা হোটেল-রেস্তরাঁয় এই গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর আবার দু’টি ভাগ রয়েছে। একটি হল বাণিজ্যিক সিলিন্ডার। অপরটিকে সবাই চেনে ঘরোয়া সিলিন্ডার নামে।
এলএনজি এবং এলপিজি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে আঁচ করে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। হোটেল-রেস্তরাঁয় বাণিজ্যিক সিলিন্ডার সরবরাহে প্রশাসনিক স্তরে টানা হয়েছে লাগাম। ফলে ওই ব্যবসায় যে বড় ধাক্কা লাগতে চলেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গ্যাসের ক্ষেত্রে দ্রুত বিকল্প উৎসের সন্ধান না পেলে গ্যাসে চলা যানবাহনগুলির চাকাও থেমে যেতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
কিন্তু, পেট্রল-ডিজ়েল বা অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের (পড়ুন বিমানের জ্বালানি) এই সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশ কম। কারণ, ইতিমধ্যেই পশ্চিম এশিয়া বাদ দিয়ে অন্যান্য দেশ থেকে তরল সোনা আমদানি শুরু করে দিয়েছে ভারত। সূত্রের খবর, ৪০টা দেশ থেকে ঘুরপথে জ্বালানি নিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ল।
মোদী সরকারের বাণিজ্য ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক সূত্রে খবর, বর্তমানে আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজ়িল, ব্রুনেই, কানাডা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, মিশর, নিরক্ষীয় গিনি, ঘানা, গ্রিস, গিনি, ইরাক, ইজ়রায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া), কুয়েত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া, নরওয়ে, ওমান, পানামা, কাতার, সেনেগাল, টোগো, তুরস্ক, আমিরশাহি, ব্রিটেন, আমেরিকা এবং ভেনেজ়ুয়েলা-সহ ৪০টি দেশ থেকে ঘুরপথে তেল আনা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে রাশিয়ার নামও।
প্রসঙ্গত, আগে ২৭টি দেশ থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল কিনত নয়াদিল্লি। সেটাই বাড়িয়ে ৪০ করা হয়েছে। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী গোয়লের দাবি, অন্যান্য দেশে যে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হচ্ছে, ভারতের ক্ষেত্রে এখনও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা তাই মনে করেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তরল সোনার ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যায় পড়বে না নয়াদিল্লি। প্রয়োজনে বেশি টাকা খরচ করে জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারবে কেন্দ্র। গ্যাসে কিন্তু সেই সুবিধা নেই। আর তাই ইতিমধ্যেই ঘরোয়া সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। সঙ্কট আরও তীব্র হলে দাম যে আরও বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।