স্বাধীনতা পায় ২০১০ সালে, জনসংখ্যা দিল্লির দেড়শো ভাগের এক ভাগ, সর্বকনিষ্ঠ দল হিসাবে বিশ্বকাপে খেলবে ‘ব্লু ওয়েভ’
এর আগে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসাবে বিশ্বকাপ খেলার নজির ছিল আইসল্যান্ডের। ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলেছিল সাড়ে তিন লক্ষের এই দেশ। সেই নজির ছাপিয়ে গিয়েছে কুরাসাও।
বাছাই পর্বে ফুটবল বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করে চমকে দিয়েছিল সাড়ে পাঁচ লক্ষের দেশ কেপ ভার্দে। সেই নজিরকে টপকে আরও চমক দেয় কুরাসাও। দেড় লক্ষ জনসংখ্যার দ্বীপরাষ্ট্রটি চলতি বছরের ফিফা বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে।
কুরাসাও হল ভেনেজ়ুয়েলার উত্তর উপকূলের কাছে, ঘূর্ণিঝড় বলয়ের ঠিক বাইরে অবস্থিত একটি প্রাণবন্ত ডাচ ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র। কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা দেড় লক্ষের সামান্য বেশি।
এর আগে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসাবে বিশ্বকাপ খেলার নজির ছিল আইসল্যান্ডের। ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলেছিল সাড়ে তিন লক্ষের এই দেশ। সেই নজির ছাপিয়ে গিয়েছে কুরাসাও।
কুরাসাওয়ের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ অনেকটা স্বপ্নের মতো। ‘ব্লু ওয়েভ’— এমনই এক ঈর্ষণীয় ডাকনাম দেওয়া হয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রটির জাতীয় ফুটবল দলকে। শীঘ্রই উত্তর আমেরিকার দিকে ধেয়ে যাবে তারা।
মাত্র দেড় লক্ষের কিছু বেশি জনসংখ্যার এবং মাত্র ৪৪৩ বর্গকিলোমিটার (১৭১ বর্গমাইল) আয়তনের এই ক্ষুদ্র ক্যারিবিয়ান দ্বীপটি আগামী ১১ জুন ২০২৬-এর টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সর্বকনিষ্ঠ দেশ হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুন:
দক্ষিণ ক্যারিবিয়ানের প্রাণবন্ত দ্বীপ কুরাসাও ফিফা বিশ্বকাপে নাম তুলে বিশ্ব জুড়ে শিরোনামে উঠে এসেছে। তবে তারা যে এই উচ্চতায় পৌঁছে যাবে, তেমনটা অনেকেই আশা করেনি। সম্ভবত আশা করেনি কুরাসাও-ও।
রঙিন ডাচ-শৈলীর ভবন, ফিরোজ়া পাথরের সৈকত এবং বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের জন্য পরিচিত কুরাসাও এখন তার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া সাফল্য উদ্যাপন করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মাত্র ১৬ বছর আগে, ২০১০ সালে ফিফায় যোগ দিয়েছিল দ্বীপরাষ্ট্রটি। ফলে দেশটির জন্য এই যোগ্যতা অর্জন বিশ্ব ফুটবলে এক নাটকীয় উত্থানের প্রতীক, যা গত এক দশকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ খেলোয়াড়দের নিষ্ঠা এবং একাগ্রতার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলসের বিলুপ্তির পর ২০১০ সালে দ্বীপটি নেদারল্যান্ডসের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। কয়েক দশক ধরে ডাচদের উপনিবেশ থাকা কুরাসাও এখন একটি সমৃদ্ধ পর্যটনকেন্দ্র এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
২০২৩ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যা ১,৫৬,১১৫ জন এবং লিঙ্গ অনুপাত প্রতি ১০০ জন নারীর জন্য ৮১.৯ জন পুরুষ। ক্ষুদ্র আকার সত্ত্বেও, কুরাসাও আশ্চর্যজনক ভাবে একটি শক্তিশালী ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যা এখন নতুন করে ইতিহাস লিখছে।
আরও পড়ুন:
একটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান হল, ভারতের রাজধানী দিল্লির জনসংখ্যা কুরাসাও-এর জনসংখ্যার প্রায় ১৫০ গুণ। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দিল্লির আনুমানিক জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। অন্য দিকে, কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা দেড় লক্ষের সামান্য বেশি।
গত বছরের নভেম্বরে কনকাকাফ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে জামাইকার সঙ্গে ০-০ ড্র করে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করে কুরাসাও। জামাইকার বিপক্ষে একটি টানটান ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করার পর কুরাসাও ফুটবলের অন্যতম অসাধারণ এক রূপকথার দুর্দান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে। ‘ব্লু ওয়েভ’ এই ম্যাচে নেমেছিল এটা জেনে যে ম্যাচ ড্র করলেই যথেষ্ট।
এর পর যা ঘটেছিল তা ছিল ডিফেন্সের এক অসাধারণ প্রদর্শনী, যেখানে তারা জামাইকার ক্রমাগত চাপ প্রতিহত করতে থাকে। পাল্টা চাপও দেয়। চূড়ান্ত বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে কুরাসাও ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজনীয় পয়েন্টটি অর্জন করে। ‘ব্লু ওয়েভ’ নামে পরিচিত দলটি ছ’টি ম্যাচ থেকে ১২ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘বি’-এর শীর্ষে থেকেছে, যা জামাইকার চেয়ে এক পয়েন্ট বেশি।
সেই সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী সর্বকনিষ্ঠ দেশ হিসাবে আইসল্যান্ডের রেকর্ডও ভেঙে দেয় কুরাসাও। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সময় আইসল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩,৫০,০০০, যা কুরাকাওয়ের জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।
বর্তমান ফিফা র্যানঙ্কিংয়ে ৮২তম স্থানে থাকা কুরাসাও বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সত্যিই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এবং দেখিয়েছে যে, শুধুমাত্র বড় সংখ্যা দিয়েই ক্রীড়াক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায় না। উল্লেখ্য, কুরাসাও ছাড়াও হাইতি এবং পানামাও ৫২ বছর পর প্রথম বারের মতো টুর্নামেন্টে তাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেছে।
হাইতি মাত্র দ্বিতীয় বারের জন্য বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এর আগে দলটি ১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল, যখন তারা প্রথম রাউন্ডেই ইটালি, পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার কাছে পরাজিত হয়ে বিদায় নিয়েছিল।
যেখানে কুরাসাও-এর মতো দেশগুলো ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে ক্রীড়াজগতে এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা করেছে, সেখানে ভারত বার বার এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে চলে।