মরুভূমিতে রহস্যে মোড়া ‘অক্টোপাস’ দুর্গ! চিনের ‘তাকলামাকান প্ল্যানে’ ধ্বংস হবে আমেরিকা? কপালে ভাঁজ দিল্লিরও
তাকলামাকান মরুভূমির বুকে অষ্টভুজ দুর্গ তৈরি করছে চিনা লালফৌজ। উপগ্রহচিত্রে প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল। বড় কোনও চক্রান্তের জাল বুনছে বেজিং?
তাকলামাকানে তুলকালাম! অত্যন্ত গোপনে মরুভূমির বুকে ‘অক্টোপাস’ দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে চিন। এর প্রতিটা বাহুর তলায় মজুত করা হচ্ছে গণবিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্র। ‘গুপ্তচর’ কৃত্রিম উপগ্রহের তোলা সেই ছবি ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা রয়টার্স প্রকাশ্যে আনতেই আমেরিকার কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। উদ্বিগ্ন ভারতও। তবে কি বড় ধরনের কোনও ষড়যন্ত্রের ছক কষছে বেজিং? উঠছে সেই প্রশ্নও।
চলতি বছরের ২৯ মে, শুক্রবার একটি প্রতিবেদনে চিনের সামরিক পরিকাঠামোর একাধিক উপগ্রহচিত্র প্রকাশ করে রয়টার্স। সেখানে বলা হয়েছে, শিংজিয়াং প্রদেশে তাকলামাকান মরুভূমির দুর্গম এলাকায় ওই অষ্টভুজাকৃতি দুর্গ তৈরি করেছে বেজিং। এর মধ্যে রয়েছে কয়েকশো বাঙ্কার ও ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চপ্যাড। এ ছাড়াও সেখানে বানানো হচ্ছে সেনাছাউনি, সামরিক গাড়ি রাখার জায়গা এবং কমান্ড সেন্টার।
চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র কাছে শিংজিয়াং প্রদেশের তাকলামাকান মরুভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, এই এলাকার ভূগর্ভস্থ সাইলোয় পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) মজুত করেছে বেজিঙের লালফৌজ। তারই গা ঘেঁষে অক্টোপাসের মতো সামরিক পরিকাঠামো তৈরি হওয়ায় ভুরু কুঁচকোচ্ছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
রয়টার্স প্রকাশিত উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, স্থলভিত্তিক পরমাণু অস্ত্রভান্ডারকে আরও মজবুত করতে এই ধরনের সামরিক তৎপরতা নিয়েছে চিন। ‘অক্টোপাস’ দুর্গের বিশাল এলাকা জুড়ে ৮০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা লঞ্চপ্যাড নির্মাণ করেছে তারা। পাশাপাশি, ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান, আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা এবং ইলেক্ট্রনিক্স রণকৌশলের সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে সেখানে।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, তাকলামাকানে একটি নয়, দু’টি স্বতন্ত্র ‘অক্টোপাস দুর্গ’ রয়েছে বেজিঙের। সেগুলি মরুভূমির সাইলোর দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। সাইলো এলাকা থেকে একটির দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। দ্বিতীয়টি গড়ে উঠেছে ২৩০ কিমি দূরে। ভূগর্ভস্থ উল্লম্ব নলাকার কাঠামো বা লঞ্চপ্যাডের মধ্যে পরমাণু ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে রাখা হয়ে থাকে। এরই পোশাকি নাম ‘সাইলো’।
আরও পড়ুন:
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞেরা বলেছেন, ‘অক্টোপাস’ দুর্গগুলি তৈরি করতে অন্তত ছ’বছর সময় লেগেছে চিনা পিএলএ-র। তবে ইউক্রেন এবং ইরান যুদ্ধ চাক্ষুষ করার পর এই কাজে গতি আনে বেজিং। কারণ, দু’টি লড়াইয়েই ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চপ্যাড উড়িয়ে দিয়ে শত্রুকে পঙ্গু করার কৌশল নিতে দেখা গিয়েছে। ভবিষ্যতে সংঘাত পরিস্থিতিতে সেই বিপদ এড়াতেই এই পরিকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় লালফৌজ।
তবে চিনা ‘অক্টোপাস দুর্গ’গুলির বহু কিছুই এখনও রহস্য মোড়া। সাইলো ক্ষেত্রের সঙ্গে এর ভূগর্ভস্থ যোগাযোগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। সূত্রের খবর, এ বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ওই সামরিক পরিকাঠামোর আশপাশে তৎপরতা বৃদ্ধি পায় লালফৌজের। সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের বক্তব্য, কোনও হাতিয়ার, বিশেষত জীবাণু অস্ত্রের গোপন পরীক্ষার জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে ওই এলাকা।
অক্টাগন সামরিক কাঠামোগুলির আশপাশে জালির মতো সড়ক এবং জলের নালাও উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়েছে। সেখানে কত সৈনিক মোতায়েন আছে বা থাকতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এতে কৃত্রিম উপগ্রহের সিগন্যাল ধরার ডিশ অ্যান্টেনা এবং দু’-তিনটি উঁচু উঁচু টাওয়ার দেখতে পাওয়া গিয়েছে। ফলে আণবিক প্রত্যাঘাত ছাড়াও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই দুর্গগুলি যে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
১৯৬৪ সালে পরমাণু বোমার প্রথম সফল পরীক্ষা চালায় চিন। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কখনওই প্রথমে আণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না বলে ঘোষণা করেছে বেজিং। আর তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় ড্রাগনের পরমাণু অস্ত্রভান্ডার অনেক বেশি সীমিত। গোড়া থেকেই একটা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ শক্তি বজায় রাখার চেষ্টা করে গিয়েছে তারা। যদিও সে কথা মানতে নারাজ আমেরিকার যুদ্ধ দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার)।
আরও পড়ুন:
গত বছরের (২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদর দফতর পেন্টাগনের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে পরমাণু অস্ত্রভান্ডার ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে চিন। ২০৩০ সালের মধ্যে ১,০০০ আণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বেজিং। শুধু তা-ই নয়, দেশের তিনটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে প্রায় ১০০টি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে সর্ব ক্ষণ প্রস্তুত রেখেছে ড্রাগনের লালফৌজ।
পিএলএ-র বহরে এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যার সাহায্যে অনায়াসেই আমেরিকার একাধিক শহরকে নিশানা করতে পারবে তারা। তা ছাড়া জল, স্থল এবং আকাশ— তিনটি জায়গা থেকেই আণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে বেজিঙের লালফৌজের। তার পরেও ভূমি থেকে পরমাণু আক্রমণের পাকা বন্দোবস্ত ড্রাগন সেরে ফেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কপালের ভাঁজ যে চওড়া হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
গত ৩০ মে, শনিবার সিঙ্গাপুরের ‘শাংরি-লা সংলাপে’ অংশ নিয়ে এ ব্যাপারে মুখ খোলেন মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। তিনি বলেন, ‘‘চিন যে ভাবে সামরিক সম্প্রসারণ করছে, তাতে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। আমরা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বেজিংয়ের আধিপত্যবাদ আমেরিকা এবং আমাদের বন্ধুদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেললে জবাব দেবে ওয়াশিংটন।’’
এই পরিস্থিতিতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকে সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই তালিকায় নাম আছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) এবং ফিলিপিন্সের। এই দেশগুলি তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টস) ৩.৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করবে বলে আশাবাদী ওয়াশিংটন।
‘শাংরি-লা সংলাপে’ হেগসেথ বলেছেন, ‘‘আমরা চিনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছি। তাদের সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক হচ্ছে। কিন্তু, তার পরেও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’’ কিছু দিন আগেই বেজিং সফর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাতে অবশ্য সাবেক ফরমোজা তথা তাইওয়ানকে (রিপাবলিক অফ চায়না) নিয়ে দুই ‘সুপার পাওয়ার’-এর মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা এতটুকু কমেনি।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ তাইওয়ানকে পৃথক দেশ মানতে নারাজ চিন। এই এলাকাকে বরাবরই নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে বেজিং। আর তাই গত কয়েক বছরে প্রায়ই দ্বীপটিকে ঘিরে সামরিক মহড়া চালাতে দেখা গিয়েছে ড্রাগনের লালফৌজকে। অন্য দিকে সাবেক ফরমোজাকে আগ্রাসী পিএলএ-র থেকে বাঁচানোর একরকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে আমেরিকা।
তাইওয়ান দখলে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বার বার হুমকি দেওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে বিপুল পরিমাণ হাতিয়ার সরবরাহ করেছে আমেরিকা। বিষয়টি নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে বেজিং। সাবেক ফরমোজা ড্রাগনের দখলে গেলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় প্রভাব কমবে যুক্তরাষ্ট্রের। আর তাই রিপাবলিক অফ চায়নাকে বাঁচাতে এতটা আগ্রহ দেখাচ্ছে ওয়াশিংটন।
এই পরিস্থিতিতে উপগ্রহচিত্রে চিনের সামরিক তৎপরতা প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে হুলস্থুল পড়ে গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ‘হাওয়াই প্যাসিফিক ফোরাম’ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সদস্য আলেকজ়ান্ডার নিল। তাঁর কথায়, মরুভূমির মাঝে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অস্ত্রভান্ডারের ‘পাতাললোক’ তৈরি করছে বেজিং, যুদ্ধের সময় যা ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, চিনা পিএলএ-র হাতে রয়েছে ‘হুয়োইয়ান-১’ নামের কৃত্রিম উপগ্রহের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এর সাহায্যে শত্রুর পাঠানো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে উৎক্ষেপণের ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে চিহ্নিত করতে পারবে বেজিঙের লালফৌজ। এর পর তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে সতর্কতামূলক তথ্য পাবে তাদের কমান্ড সেন্টার। সেটাই হয়তো মরুভূমির ‘অক্টোপাস’ দুর্গের ভিতরে গড়ে তুলছে মান্দারিনভাষীরা।
চিনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ভারতের জন্যও উদ্বেগের। কারণ, বেজিঙের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সীমান্ত বিবাদ রয়েছে নয়াদিল্লির। ২০২০ সালে লাদাখের ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা’ বা এলএসিতে আগ্রাসী মনোভাব দেখায় ড্রাগনের লালফৌজ। যদিও তা রুখে দিতে দেরি করেনি এ দেশের সেনা। তার পর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমনটা নয়।
‘আগ্রাসী’ চিনকে ঠেকাতে ভারত আবার অন্য কৌশল নিয়েছে। বেজিঙের সঙ্গে সীমান্ত বিবাদ থাকা ফিলিপিন্সকে ইতিমধ্যেই ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছে নয়াদিল্লি। ‘শাংরি-লা সংলাপে’ প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিংহ জানিয়েছেন, এই হাতিয়ারের চুক্তি সেরেছে ভিয়েতনামও। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ‘ব্রহ্মস’ চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ‘সাপে নেউলে’ সম্পর্ক রয়েছে ড্রাগনের।