৮১ বছর আগে রুশ ‘অধিকৃত’ এলাকা ফেরত চেয়ে ‘ঘুমন্ত দৈত্যের’ হুঙ্কার! ৫,৫০০ পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে দ্বীপরাষ্ট্র?
নতুন করে ফের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়া চারটি এলাকা ফেরত চেয়ে ইতিমধ্যেই সুর চড়িয়েছেন টোকিয়োর বিরোধী রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের পরমাণু শক্তি নিয়েও উদ্বিগ্ন বেজিং।
কখনও রাশিয়ার দখলে থাকা দ্বীপপুঞ্জ ফেরত চেয়ে হুঙ্কার! কখনও আবার পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রসঙ্গ উত্থাপন। পাশাপাশি, জাতীয় সুরক্ষা নিয়ে আমেরিকার বিষোদ্গার। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লাগাতার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে জাপান। ফলে আপাতশান্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কেউই।
সম্প্রতি, উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জের পুনর্দখলের দাবিতে মস্কোকে নিশানা করেন টোকিয়োর অন্যতম বিরোধী দল ‘রেইওয়া শিনসেনগুমি’র নেতা তারো ইয়ামামতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫) একেবারে শেষ লগ্নে যা জাপানের থেকে ছিনিয়ে নেয় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরবর্তী আট দশকে সেই রাশ এক বারের জন্যও আলগা করেনি ক্রেমলিন। আর তাই ইয়ামামতোর মন্তব্যে সিঁদুর মেঘ দেখছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
কিছু দিন আগে একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টি উত্থাপন করেন টোকিয়োর বিরোধী রাজনৈতিক নেতা। তাঁর কথায়, ‘‘জাপান কি সত্যিই স্বাধীন ও স্বতস্ত্র দেশ, না কি আমরা মার্কিন উপনিবেশে পরিণত হয়েছি? আমাদের যে কোনও এলাকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে আমেরিকা। সেই জন্যই হয়তো উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলি ফেরত দিচ্ছে না রাশিয়া। আর তাই এই নিয়ে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে।’’
ইয়ামামতোর দাবি তোলা উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে বিবাদের লম্বা ইতিহাস রয়েছে। কৌশলগত এলাকাটির অধিকার নিয়ে একাধিক বার মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়েছে দু’পক্ষ। প্রশাসনিক ভাবে সংশ্লিষ্ট দ্বীপগুলি মস্কোর দক্ষিণ কুরিল জেলার অংশ। এর এক দিকে রয়েছে ওখতস্ক সাগর ও অপর দিকে প্রশান্ত মহাসাগর। টোকিয়োর সরকারি নথিতে এলাকাটির নাম দক্ষিণ চিশিমা।
১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ অগস্ট জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু হামলা চালায় আমেরিকা। এর পরই বিনা শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আত্মসমর্পণ করে টোকিয়ো। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ দখলে নেমে পড়ে মস্কো। ওই বছরই ১৮ অগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে একরকম বিনা বাধায় চারটি দ্বীপ দখল করে নেয় ক্রেমলিন। সাবেক সোভিয়েতের কুর্সিতে তখন ছিলেন কিংবদন্তি জোসেফ স্ট্যালিন।
আরও পড়ুন:
মস্কোর দখলে চলে যাওয়া কুরিলের চারটি দ্বীপ হল ইতুরুপ, কুনাশির, শিকোতান এবং হাবোমাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বছরগুলিতে কূটনৈতিক পদ্ধতিতে মস্কোর থেকে এগুলি ফেরত পাওয়ার কম চেষ্টা করেনি টোকিয়ো। ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে রাশিয়া-সহ আত্মপ্রকাশ করে ১৫টি রাষ্ট্র। ওই সময় ক্রেমলিনের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। ফলে দ্বীপগুলি ফেরত চেয়ে চাপ বাড়ায় জাপান।
টোকিয়োর ‘অন্যায্য’ দাবিকে অবশ্য তার পরেও পাত্তা দেয়নি মস্কো। উল্টে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি শান্তিচুক্তি সেরে ফেলতে জাপানকে পাল্টা চাপ দেয় ক্রেমলিন। সেখানে ওই এলাকাটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করে রাশিয়া। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কূটনৈতিক পর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় আলোচনা। গত চার বছরের বেশি সময় ধরে যা স্থগিত রেখেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ফৌজ ইউক্রেন আক্রমণ করলে পূর্ব ইউরোপে বেধে যায় যুদ্ধ। চার বছর পেরিয়ে যা এখনও থামেনি। লড়াই শুরু হতেই মস্কোর উপর ১৬,০০০-এর বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। আমেরিকার ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র হিসাবে জাপান তাতে যোগ দিলে ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় টোকিয়োর। এই আবহে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ ফেরানোর দাবি পরিস্থিতিকে যে আরও জটিল করবে, তা বলাই বাহুল্য।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০১২ সালে ক্ষমতায় ফিরে উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলি ফিরে পেতে পুতিনের সঙ্গে বেশ কয়েক বার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন সাবেক জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজ়ো আবে। ওই এলাকায় কখনও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরি হবে না বলে মস্কোকে প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। কিন্তু, তার পরেও দ্বীপ হস্তান্তর করতে রাজি হননি রুশ প্রেসিডেন্ট। উল্টে এলাকার উপর ক্রেমলিনের আধিপত্য মেনে নিতে বলেন তিনি।
আরও পড়ুন:
সাক্ষাৎকারে এই বিষয়টিরও উল্লেখ করেন ইয়ামামতো। তাঁর কথায়, ‘‘রাশিয়া খুব ভাল করেই জানে, আমাদের এই প্রতিশ্রুতির কোনও দাম নেই। কারণ, মার্কিন সরকার এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। আর তাই মস্কোর পক্ষে আমাদের বিশ্বাস করে কঠিন। জাপান উপনিবেশমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির বদল সম্ভব নয়। সেটা টোকিয়োর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে।’’
উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলির পাশাপাশি সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে তীব্র হচ্ছে চিন-জাপান সংঘাত। প্রশান্ত মহাসাগরের ওই দ্বীপরাষ্ট্রের সরকারি পরিচয় অবশ্য ‘রিপাবলিক অফ চায়না’ বা আরওসি, যাকে দেশ হিসাবে মানতে নারাজ বেজিং। সাবেক ফরমোজ়াকে ড্রাগনভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই মনে করে মান্দারিনভাষীদের সরকার। তাদের সাফ কথা, বিশ্বে একটাই চিন রয়েছে, যার সরকারি নাম ‘পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না’ বা পিআরসি।
বেজিঙের এই ‘এক চিন’ নীতির বরাবরই বিরোধিতা করে এসেছে টোকিয়ো। গত বছরের (২০২৫ সাল) নভেম্বরে তাইওয়ানকে নিয়ে বিবৃতি দেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্রকে চিন কব্জা করতে চাইলে তাঁদের পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। প্রয়োজনে সাবেক ফরমোজ়াকে সামরিক সাহায্যের কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। সামুরাই প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই পারদ চড়ায় ড্রাগন।
গত বছর (২০২৫ সাল) তাকাইচির হুঙ্কারের পর চিনা উপকূলরক্ষী বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ জাপানের সেনকাকু দ্বীপ ঘিরে ফেলতে আরও উত্তপ্ত হয় পরিস্থিতি। তাইওয়ান সংলগ্ন ওই এলাকার নাম হঠাৎ করেই বদলে দিয়াওয়ু করে দিয়েছে বেজিং। ওই সময় আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে টোকিয়োর জলসীমায় ঢোকে ড্রাগনের রণতরী। শুধু তা-ই নয়, অন্যায় ভাবে সংশ্লিষ্ট দ্বীপটি সামুরাই যোদ্ধারা দখল করে রেখেছে বলে পাল্টা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে মান্দারিনভাষীদের সরকার।
এই পরিস্থিতিতে সব হিসাব উল্টে দিতে পাল্টা ‘আক্রমণাত্মক’ নীতি নিয়েছেন জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি। তাঁর নির্দেশে ফিলিপিন্স এবং মার্কিন নৌসেনার সঙ্গে সামরিক মহড়ার সংখ্যা বাড়িয়েছে টোকিয়ো। পাশাপাশি, অত্যাধুনিক হাতিয়ার নির্মাণেও জোর দিতে দেখা যাচ্ছে তাঁদের, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেজিং। ড্রাগনের অভিযোগ, বিপজ্জনক ভাবে প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে ‘উদীয়মান সূর্যের দেশ’।
চলতি বছরের মার্চে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে হংকংয়ের গণমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর কাছে মুখ খোলেন চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র এক মুখপাত্র। তাঁর কথায়, ‘‘২০২৪ সালের শেষ নাগাদ জাপানের মজুত করা প্লুটোনিয়ামের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪.৪ টন, যেটা ব্যবহার করে অনায়াসেই ৫,৫০০টিরও বেশি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে টোকিয়ো। আর সেই পরিকাঠামোও রয়েছে তাদের।’’
পিএলএ মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘‘জাপানের পরমাণু নীতি তিনটি বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হল আণবিক অস্ত্র নির্মাণে সরকারি অনুমোদনে টোকিয়োর কঠোর বিধিনিষেধ। কিন্তু, সেটা সরে গেলে খুব অল্প দিনের মধ্যেই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরি করে ফেলবে সামুরাই যোদ্ধাদের দ্বীপরাষ্ট্র, যেটা সারা পৃথিবীর জন্যে বিপজ্জনক।’’
পিএলএ মনে করে বেসরকারি প্রযুক্তির আড়ালে ক্রমশ শক্তিশালী হাতিয়ার তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে টোকিয়ো। আগামী দিনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র রফতানিতেও সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে জাপানি প্রশাসন। যদিও এর উল্টো যুক্তি রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, পরমাণু হাতিয়ার তৈরির মতো পরিকাঠামো এখনও সামুরাই যোদ্ধাদের হাতে নেই। যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে তাঁদের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমেরিকার সঙ্গে একটি কৌশলগত সামরিক চুক্তি করে জাপান। সেখানে টোকিয়োর জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় ওয়াশিংটন। ফলে গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকের পর থেকে আর কখনওই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা বড় সেনাবাহিনী তৈরির দিকে নজর দেয়নি টোকিয়ো। সেটাই ২১ শতকে তাঁদের বিপদ যে বাড়াচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।