‘ডেথ জ়োন’-এ থাকা মৃতদেহের সারি কি পথ চেনায় পর্বতারোহীদের? কেন এভারেস্টের এই এলাকা সাক্ষী এত মৃত্যুর?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এভারেস্টে পর্বতারোহীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কারণেই কি ‘ডেথ জ়োন’-এ মৃতদের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, না কি নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে কোনও রহস্য?
প্রতি বছর এপ্রিলের শুরুতে নেপালে ভিড় জমান বিশ্বের নানা প্রান্তের পর্বতারোহীরা। তাঁদের সকলের চোখে একটাই স্বপ্ন থাকে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টে পায়ের ছাপ ফেলার।
তাঁদের সবাইকেই যে নেপাল সরকার এভারেস্টে ওঠার অনুমতি দেয় তা নয়। অনেককেই ফিরে যেতে হয়। অনেকে আবার ১ কি ২ নম্বর বেস ক্যাম্পে পৌঁছে হাল ছেড়ে দেন। শরীর আর সঙ্গ দেয় না। যদিও বর্তমানে আগের থেকে অনেক বেশি মানুষকে এভারেস্টের পথে হাঁটতে দেখা যায়।
চলতি বছরও দেখা যাচ্ছে মানুষের ঢল। অনেকেই স্বপ্নপূরণ করেছেন। বেশির ভাগই পারেননি। বরফের চাদরে মোড়া পাহাড় সাক্ষী থেকেছে বহু মৃত্যুরও। তাঁদের মধ্যে তেলঙ্গানার পর্বতারোহী অরুণকুমার তিওয়ারির মৃত্যু আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সমাজমাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে তাঁর পরিবারের নেওয়া সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
৫৩ বছর বয়সি এই প্রযুক্তিবিদ অবশ্য বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গে পা রেখেছিলেন। এটাই হয়তো মৃত্যুর পূর্বে তাঁর জীবনের সেরা প্রাপ্তি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই প্রাপ্তি তিনি পরিবারের মানুষজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারলেন না। সেখান থেকে নামার আগেই প্রাণ হারালেন তিনি।
এভারেস্ট থেকে নামার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন অরুণকুমার। চূড়ার ঠিক নীচে হিলারি স্টেপের কাছে মারা যান তিনি। নেপাল-ভিত্তিক অভিযাত্রী সংস্থা ‘পায়োনিয়ার অ্যাডভেঞ্চার্স’ জানায়, তাঁকে সহায়তা করছিলেন চার জন শেরপা। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মৃতদেহ উদ্ধারের চরম ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তাঁর পরিবার মরদেহটি পর্বতেই রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অরুণের পরিবারের সিদ্ধান্তকে অনেকেই নজিরবিহীন বলে মনে করছেন। কিন্তু বহু মানুষ জানেন না যে, প্রতি বছরই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ছুঁয়ে দেখার নেশা অনেকের প্রাণ কাড়ে। তাঁদের মধ্যে নানা মানুষের মৃতদেহই আর ঘরে ফেরে না। সাদা বরফের চাদরে ঢাকা পড়ে যান তাঁরা।
পরবর্তী কালে এভারেস্টের পথে পাড়ি দেওয়া বহু পর্বতারোহী সে সমস্ত মৃতদেহের দর্শন পান। তাঁদের পরনে থাকা উজ্জ্বল বর্ণের জুতো, গ্লাভস প্রভৃতি বরফের তলা থেকে উঁকি মারে। এ ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন যে সেই মৃতদেহগুলিই নাকি শৃঙ্গে পৌঁছোনোর পথ দেখায়। কোন পথে গেলে বিপদ হতে পারে, কোন পথে শৃঙ্গে পৌঁছোনো যেতে পারে তা নাকি সে সমস্ত মৃতদেহ দেখে ঠিক করেন পর্বতারোহী এবং শেরপারা।
এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজার ডট কম-এর তরফ থেকে ‘ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন’-এর পূর্ব শাখার চেয়ারম্যান দেবরাজ দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি নিজে ২০১৬ সালে এভারেস্টের শৃঙ্গে পা রেখেছেন। এভারেস্টের পথে দিকনির্দেশের ক্ষেত্রে মৃতদেহের ভূমিকা ঠিক কতটা সেটা জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছেন যে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এ ক্ষেত্রে মৃতদেহের কোনও ভূমিকাই নেই।
দেবরাজ জানিয়েছেন, এভারেস্ট চড়ার পথ অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। সেই পথে যদি মৃতদেহ পড়েও থাকে তা চোখে না পড়ারই কথা। কারণ হিসাবে তিনি দায়ী করছেন সর্বোচ্চ শৃঙ্গের আবহাওয়াকে। সেখানে বরফের চাদরের তলাতেই বেশির ভাগ মৃতদেহ ঢাকা পড়ে যায়। ফলত চোখে পড়ার উপায় থাকে না। বরফমুক্ত পাহাড়ে যদি কোনও মৃতদেহ দেখাও যায়, সেগুলি দিকনির্দেশে কোনও সাহায্য করে না। এত বছরে প্রায় ৩৫০টি মৃতদেহ এভারেস্টের আনাচকানাচে লুকিয়ে রয়েছে বলেও মত দেবরাজের, যাদের সিকিভাগও পর্বতারোহীরা দেখতে পান না।
আরও পড়ুন:
একই সুর শোনা গিয়েছে পর্বতারোহী মলয় মুখোপাধ্যায়ের গলায়। তিনি ২০১৬ সালের ২১ মে মাউন্ট এভারেস্টের শৃঙ্গে পা রেখেছিলেন। মৃতদেহ দেখে পথ চেনার ব্যাপারে এমন কিছু হয় না বলেই জানিয়েছেন তিনিও।
এভারেস্ট আরোহণ মানুষের মনে তৈরি করেছে আরও নানা সংশয়। তার মধ্যে এভারেস্টের ‘ডেথ জ়োন’ আর ‘ট্রাফিক জ্যাম’ (পর্বতারোহীদের ভিড়) অন্যতম।
‘ডেথ জ়োন’ বলতে এভারেস্টের চতুর্থ বেসক্যাম্প বা সর্বশেষ বেসক্যাম্পের পর থেকে শৃঙ্গ পর্যন্ত রাস্তাকে বোঝানো হচ্ছে। এভারেস্টের ‘ডেথ জ়োন’ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৬ হাজার ২৪৭ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। প্রায় ৮০০০ মিটার থেকে শুরু হয় এই ‘জ়োন’। শেষ হয় গিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে।
এভারেস্টের এই অংশ ‘ডেথ জ়োন’ হিসাবে পরিচিত কেন? কারণ হিসাবে দেবরাজ জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের বাতাসের চাপ অত্যন্ত কম। বায়ুর ঘনত্ব কমে যায়। এর ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্রয়োজন পড়ে বাড়তি অক্সিজেনের। যদিও বহু পর্বতারোহী বাড়তি অক্সিজেন ছাড়াই এভারেস্ট চড়েন বলে জানিয়েছেন দেবরাজ।
চতুর্থ বেসক্যাম্প পেরিয়ে মৃত্যুর পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণ, সেই অংশে আমাদের শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। বদলে সে ভাবে নতুন কোষ তৈরিও হয় না। সেই পথে তাড়াতাড়ি এগোনোও এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার বলে জানিয়েছেন দেবরাজ।
চতুর্থ বেসক্যাম্প থেকে এভারেস্টের শৃঙ্গের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। হাঁটা শুরু করলে একেবারে শৃঙ্গে গিয়ে থামতে হয়। কারণ মাঝে কোনও ক্যাম্প থাকে না। ব্যালকনি বলে একটা জায়গা রয়েছে যেখানে কয়েক মিনিট বসে জিরোতে পারেন পর্বতারোহীরা। অনেকে এই জায়গায় অক্সিজেন সিলিন্ডার বদলে নেন বলেও জানিয়েছেন দেবরাজ। সর্বশেষ বেস ক্যাম্পের পর পর্বতারোহীদের সাধারণত তিনটি অক্সিজেন সিলিন্ডার দেওয়া হয়। তার মধ্যে দু’টি তাঁরা যাওয়ার সময় ব্যবহার করেন এবং তিন নম্বরটি রাখা থাকে ফিরতি পথে ব্যবহারের জন্য।
শুনতে এক কিলোমিটার লাগলেও সেই পথ অতিক্রম করতে পেরিয়ে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সামনে যদি পর্বতারোহীদের ভিড় থাকে তা হলে তো কথাই নেই। সেই সঙ্কীর্ণ পথে একে অপরকে টপকে আগে চলে যাওয়ার বিশেষ উপায়ও থাকে না বলে জানিয়েছেন এভারেস্টজয়ী দেবরাজ। সেই পথ ধরেই এভারেস্টের শৃঙ্গ ছুঁয়ে নেমে আসেন পর্বতারোহীরা। তখন তাঁদের আগে নামার জায়গা করে দিতে হয়।
শৃঙ্গে পৌঁছোনোর পর পুনরায় ফিরে আসার সময় হয় আরও বেশি কষ্ট। কিন্তু তাতেও থামার উপায় থাকে না পর্বতারোহীদের। পুনরায় বেসক্যাম্পে ফিরে এসে স্বস্তি মেলে। পর্বতারোহীরা সুযোগ পান গলা ভেজানোর।
‘ট্রাফিক জ্যাম’ প্রসঙ্গে এভারেস্ট ছুঁয়ে আসা পর্বতারোহী মলয় জানিয়েছেন, এটি আটকানোর একমাত্র উপায় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আরোহণের অনুমতি কম মানুষকে দেওয়া। কারণ, প্রতি বছর চার দিন বা পাঁচ দিন এভারেস্ট আরোহণ করা যায়। ফলত সেই পথে ভিড় হওয়া স্বাভাবিক।
এভারেস্ট চড়ার নেশা দিন দিন বাড়ছে বলেই যে ‘ডেথ জ়োনে’ মৃতদেহের সংখ্যা বাড়ছে, এ কথাকে পুরোপুরি ভুল বলা যায় না। এ নিয়ে আগামী দিনে নেপাল সরকার কোনও কঠিন সিদ্ধান্ত নেবে কি না তা সময়ই বলতে পারবে।