সৌদির জেলে ২০ বছর! ৩৪ কোটির ‘ব্লাড মানি’তে বাঁচলেন নাবালক হত্যায় মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত কেরলের তরুণ
বছরের পর বছর ধরে আইনি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ আবদুল রহিমকে ক্ষমা করে মুক্তি দেয়। আবদুল মুক্তি পেয়েছেন ৩৪ কোটি টাকার বিনিময়ে। টাকা দিয়ে মধ্যস্থতা করে অপরাধের বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ার এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ব্লাড মানি’।
দীর্ঘ ২০টা বছর কেটেছে বিদেশ-বিভুঁইয়ের কারাগারে। নাবালক হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া ঝুলছিল কেরলের কোঝিকোড়ের বাসিন্দা আবদুল রহিমের মাথায়। অবশেষে মুক্তি মিলতে চলেছে সৌদি আরবের কারাগার থেকে। সুদীর্ঘ কারাবাসের পর পিতৃদত্ত প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরছেন আবদুল। সৌদির ভারতীয় দূতাবাসের এক্স হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করে আবদুলের দেশে ফেরার বিমান ধরার কথা জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোরবেলা রিয়াধ থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে কোঝিকোড়ে কারিপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছোন তিনি। সাক্ষাৎ মৃত্যুর দরজা থেকে ছেলে ঘরে ফিরতেই মাচিলাকাথয় আবদুলের পৈতৃক বাড়িতে আনন্দের জোয়ার।
আবদুল মুক্তি পেয়েছেন ৩৪ কোটি টাকার বিনিময়ে। টাকা দিয়ে মধ্যস্থতা করে অপরাধের বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ার এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ব্লাড মানি’। ইরানের মতো সৌদি আরবেও এর চল রয়েছে। নিহতের পরিবারকে দিতে হবে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ বাবদ ‘ব্লাড মানি’। সেইমতো ১৫ লক্ষ সৌদি রিয়াল দেওয়া হয়েছে নাবালকের পরিবারকে। ইসলামি আইনে এটি ‘দিয়াহ’ নামে পরিচিত।
বছরের পর বছর ধরে আইনি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ আবদুলকে ক্ষমা করে, মুক্তি দেয়। কারাগারে থাকাকালীন সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ক্রমাগত আবদুলের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছিল। নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নেওয়া চলত।
সৌদিতে বসবাসকারী ভারতীয়েরা আবদুলের মুক্তির জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ‘ক্রাউড ফান্ডিং’-এর মাধ্যমে ভারতীয় তরুণের মুক্তির জন্য অর্থ সংগ্রহ করা শুরু হয়। হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মালয়ালিরাও। সেই অর্থ দিয়ে দীর্ঘ কারাবাসের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে কেরলের বাসিন্দা আবদুলের।
আরও পড়ুন:
কী ভাবে পাকেচক্রে হত্যার মতো ঘটনায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন আবদুল তা জানতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে ২০০৬ সালে। সেই বছর সৌদি আরবে পৌঁছোনোর পর আবদুল অটোচালক হিসাবে কাজ করতেন। সেই উপার্জনে মন ভরেনি আবদুলের। বেশি রোজগারের আশায় একটি চাকরি নেন তিনি।
১৫ বছর বয়সি পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক নাবালকের ব্যক্তিগত চালক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে চাকরি পান আবদুল। কিশোরের মানসিক সমস্যার পাশাপাশি একটি জটিল শারীরিক অসুস্থতাও ছিল। সে কারণে কিশোরকে শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত একটি বাহ্যিক যন্ত্রের মাধ্যমে শ্বাস নিতে হত।
সংবাদসংস্থা এএনআই-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনাবশত ছেলেটির সঙ্গে থাকা চিকিৎসা সহায়ক যন্ত্রে রহিমের হাত লেগে যায়। এর ফলে কিশোরটি পরে অচেতন হয়ে পড়ে এবং মারা যায়। সৌদি আরবে পৌঁছোনোর মাত্র ২৮ দিন পর আবদুলকে গ্রেফতার করা হয়। অবশেষে ২০১১ সালে সৌদির একটি আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত করে।
আবদুল আদালতে সপক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জানিয়েছিল গাড়ি চালানোর সময় কিশোর তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। অস্থির হয়ে ওঠে। তাকে শান্ত করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত হাত পড়ে যায় যন্ত্রে। ফলে যন্ত্রটি সংযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
আরও পড়ুন:
সৌদি আরবের আদালত অবশ্য আবদুলের আবেদনে গলেনি। আদালত তাঁকে নাবালক হত্যার দায়ে দণ্ডাদেশ দেয়। ২০২২ সালে আপিল আদালত এই রায়ই বহাল রাখে। পরবর্তী কালে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত আবদুলের আবেদনটি পুনর্বিবেচনা করে। বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের পর, ২০২৪ সালে নাবালকের পরিবার দেড় কোটি সৌদি রিয়াল (প্রায় ৩৪.৩৫ কোটি টাকা) ‘ব্লাড মানি’ বা দিয়াহ গ্রহণের বিনিময়ে রহিমকে ক্ষমা করতে সম্মত হয়।
ইসলামি আইন অনুসারে, অনিচ্ছাকৃত ভাবে হত্যা, শারীরিক আঘাত বা সম্পত্তির ক্ষতির ক্ষেত্রে মৃত বা ক্ষতিগ্রস্তের উত্তরাধিকারীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরব, ইরান, পাকিস্তান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলিতে এটি আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ বলে বিবেচিত হয়।
পারস্পরিক সমঝোতার পর, সৌদি আদালত ২০২৪ সালের ২ জুলাই আবদুলের মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। সৌদি প্রশাসন অবশ্য আবদুলকে তাঁর ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করার নির্দেশ দেয়। আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০ মে সাজার মেয়াদ শেষ হয়।
একই ঘটনা ঘটেছে কেরলের বাসিন্দা পেশায় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ক্ষেত্রেও। ২০১৭ সালে ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদি নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে নিমিশার। ২০১৮ সালে ইয়েমেনের আদালত তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
কেরলের পালক্কড় জেলার বাসিন্দা নিমিশা নার্সের কাজ নিয়ে ২০০৮ সালে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। স্বামী টমি থমাস এবং মেয়েকে নিয়ে ইয়েমেনে থাকতেন তিনি। ২০১৪ সালে তাঁর স্বামী এবং ১১ বছরের কন্যা ভারতে ফিরে এলেও নিমিশা ইয়েমেনেই থেকে গিয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল নিজের ক্লিনিক খুলবেন। ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদির সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর দু’জনে মিলে ক্লিনিক খোলেন তাঁরা।
পরে নিমিশার টাকা এবং পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছিলেন মাহদি। মারধর করে নাকি নিমিশাকে মাদকসেবনেও বাধ্য করেছিলেন তিনি। আইনি কাগজপত্রে নিমিশাকে স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়ার পথও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পাসপোর্ট উদ্ধার করে দেশে ফিরতে মরিয়া নিমিশা বাধ্য হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই মাহদিকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেন। ওভারডোজ়ের কারণে মৃত্যু হয় মাহদির।
ইয়েমেন ছেড়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে যান নিমিশা। মাহদিকে হত্যার দায়ে ২০১৮ সালে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ইয়েমেনের আদালত। সেই থেকে ইয়েমেনের জেলেই বন্দি রয়েছেন ভারতের যুবতী। ভারত সরকারের কাছে মেয়ের প্রাণভিক্ষা চেয়ে তাঁকে উদ্ধার করার আবেদন করেছে নিমিশার পরিবার। তরুণীকে দেশে ফিরতে হলে নিহতের পরিবারকে দিতে হবে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ বাবদ সেই ‘ব্লাড মানি’।
নিহত ব্যক্তি মাহদির পরিবার প্রাণভিক্ষা দিলে তবেই মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পাবেন নিমিশা। সেই টাকার অঙ্ক ছিল দেড় কোটি। এ ছাড়াও উকিল চেয়েছিলেন দেড় কোটি টাকা। নিমিশার মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের আর্জিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে ‘সেভ নিমিশা প্রিয়া অ্যাকশন কাউন্সিল’ নামে একটি সংগঠন। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল নিমিশার।
পরে সেই সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয় ইয়েমেন সরকার। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত নিমিশার মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে পরবর্তী কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি ইয়েমেন প্রশাসন। পরে ১৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র জানায়, নিমিশাকে ফেরানোর চেষ্টা করছে সরকার। সরকারি ভাবে যা কিছু করা সম্ভব, তা করা হচ্ছে।