প্রবালদ্বীপেই ‘জিয়নকাঠি’! তৈলভান্ডার লুট করতে ইরানি ‘প্রাণভোমরা’য় মারণ ঘা দেবেন ট্রাম্প? কেন এত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ?
ইরানের খনিজ তেলের ভান্ডার দখল করার কথা গণমাধ্যমের সামনে সরাসরি বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই লক্ষ্যে প্রবালদ্বীপ খার্গ আক্রমণের মধ্যে দিয়ে স্থল অভিযান শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ?
আর আকাশপথে হামলা নয়। সাবেক পারস্য মুলুকে এ বার ‘গ্রাউন্ড অপারেশনের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন ফৌজ। সেই লক্ষ্যে পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমাগত সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধিতে মন দিয়েছে ওয়াশিংটন। এ-হেন পরিস্থিতিতে ইরানের খনিজ তেল নিয়ে প্রথম বার বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গেল যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেছেন, ‘‘আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ হল, ইরানের খনিজ তেল দখল করা।’’ তাঁর এই মন্তব্যের জেরে দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
‘গ্রাউন্ড অপারেশনে’ তেহরানের খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ যে যুক্তরাষ্ট্র নিজের হাতে নিতে চায়, ইতিমধ্যেই সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের জ্বালানি অর্থনীতিতে ওই এলাকার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, বর্তমানে সেখান দিয়েই ৯০-৯৪ শতাংশ তরল সোনা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করছে তেহরান। সাবেক পারস্যের সংশ্লিষ্ট প্রবালদ্বীপটি তাদের বুশেহর প্রদেশের অংশ। এখান থেকে মূল ভূখণ্ডের দূরত্ব মেরেকেটে ২৫-৩০ কিলোমিটার।
এ-হেন খার্গের দক্ষিণ অংশে রয়েছে পারস্য উপসাগর, যা হরমুজ় প্রণালী হয়ে ওমান সাগরে গিয়ে মিশেছে। ইরানের বুশেহর সমুদ্রবন্দরের প্রায় ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থান করছে ওই প্রবালদ্বীপ। বিশ্ববাজারে তেল বিক্রির জন্য সেখানে আছে তেহরানের অন্যতম বড় ‘অয়েল টার্মিনাল’, যা ছুঁয়ে অন্যান্য দেশে চলে যায় তাদের অপরিশোধিত তেল। আর তাই খার্গের পতন হলে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে উপসাগরীয় শিয়া মুলুকটির অর্থনীতি, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে ইরানি তেল কব্জা করতে ট্রাম্প কিন্তু শুধু ওই প্রবালদ্বীপের কথা বলেননি। সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, ‘গ্রাউন্ড অপারেশনের’ প্রাথমিক পর্বে সাফল্য এলে খার্গে চুপ করে বসে থাকবে না মার্কিন ফৌজ। উপসাগরীয় শিয়া মুলুকটির তরল সোনার সব ক’টা খনিরই দখল নিতে চাইবে তারা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে আটকাতে তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির সামনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা ছাড়া দ্বিতীয় রাস্তা খোলা নেই।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি তরল সোনায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজর পড়া কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। কারণ, সাবেক পারস্যের মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ হাইড্রোকার্বনের ভান্ডার। অপরিশোধিত খনিজ তেলের ক্ষেত্রে এর আনুমানিক পরিমাণ ২০ হাজার ৮৬০ কোটি ব্যারেল বলে জানা গিয়েছে। এককথায় বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তরল সোনার মজুত আছে তেহরানের হাতে।
আরও পড়ুন:
একটা উদাহরণের সাহায্যে গোটা বিষয়টার একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, খনিজ তেলের রফতানি বন্ধ রাখলে ২৯০ বছর পর্যন্ত জ্বালানি সমস্যা হবে না ইরানের। কারণ, বিশ্ব জুড়ে মজুত থাকা তরল সোনার ১২ শতাংশের অধিকারী তেহরান। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে খোলা বাজারে সে ভাবে এই সম্পদ বিক্রি করতে পারে না তারা। বর্তমানে সাবেক পারস্যের তেলের সবচেয়ে বড় খদ্দের হল চিন।
বর্তমানে দিনে প্রায় ৩০-৪৫ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে ইরান, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তরল সোনার সরবরাহের মাত্র ৪-৫ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে প্রথম বার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়ে তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ছিলেন বিল ক্লিন্টন। ক্ষমতা হাতে পেয়ে ২০১৮ সালে এই নিষেধাজ্ঞাকে আরও কঠোর করেন ট্রাম্প। তত দিনে অবশ্য গোপনে পরমাণু হাতিয়ার তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সেঁটে গিয়েছে সাবেক পারস্যের গায়ে।
ইরান অবশ্য কোনও দিনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সে ভাবে পরোয়া করেনি। তেল বিক্রি করতে চুটিয়ে ‘ছদ্ম জাহাজ’ (পড়ুন শ্যাডো ফ্লিট) ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে তাদের। অর্থাৎ, অন্য দেশের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারে তরল সোনা বেজিং বা হংকঙের বন্দরে পাঠায় তারা। এই ধরনের জাহাজের বহরকেই বলা হয় ‘শ্যাডো ফ্লিট’। গত ৩০ বছর ধরে এর অবাধ যাতায়াত আটকাতে আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছে বলা যেতে পারে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে দিনে ১১-১৫ লক্ষ ব্যারেল তরল সোনা বিদেশের বাজারে বিক্রি করেছে তেহরান। এর সিংহভাগই গিয়েছে (পড়ুন ৮০-৯০ শতাংশ) বেজিঙে। যদিও ‘শ্যাডো ফ্লিটে’ তেল কেনায় আপত্তি ছিল দিল্লির। ফলে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে ২০১৯ সালের পর পারস্য থেকে তরল সোনা আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় নয়াদিল্লি।
আরও পড়ুন:
১৯৭৯ সালে ইসলামীয় বিপ্লবের এক বছরের মাথায় ইরান আক্রমণ করে বসেন ইরাকের কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। পরবর্তী আট বছর চলেছিল সেই যুদ্ধ। ওই লড়াইয়ে একাধিক এলাকায় হামলা চালালেও কখনও খার্গকে নিশানা করেনি বাগদাদ। ফলে দিব্যি তেল বিক্রি করে সংঘর্ষের খরচ উঠিয়ে নেয় তেহরান। এর জেরে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় ইরাকি ফৌজ।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, ইরাক-ইরান যুদ্ধের উপর ভাল রকম নজর রেখেছিলেন ট্রাম্প। খার্গ যে তেহরানের ‘জিয়নকাঠি’, তা বুঝতে খুব একটা সমস্যা হয়নি তাঁর। ১৯৮৮ সালে একটি সাক্ষাৎকারে সংশ্লিষ্ট প্রবালদ্বীপটিকে উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে। ওই সময় প্রেসিডেন্ট হওয়ার ধারেকাছেও ছিলেন না তিনি।
১৯৮৮-তে গণমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমাদের উপর ইরান যদি একটাও গুলি চালায়, তা হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। আমরা ওদের খার্গ দ্বীপটাকেই ধ্বংস করে দেব। তখন আর তেল বিক্রি করতে পারবে না তেহরান।’’ ৩৮ বছর পর সেই স্বপ্নই কি তিনি সত্যি করতে চলেছেন, উঠছে প্রশ্ন।
চলতি বছরের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের থেকেই খার্গ দ্বীপের প্রসঙ্গ তোলেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘হয়তো আমরা ওই প্রবালদ্বীপটা নিয়ে নেব। হয়তো নেব না। আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। তার মানে আমাদের সেখানে (খার্গে) গিয়ে কিছু সময়ের জন্য থাকতেও হবে। আমেরিকায় বসে কিছু বোকা লোকজন প্রশ্ন তুলছেন, কেন আমি এটা করছি! ওরা বোকা লোক।’’
ইরানের প্রধান তৈলভান্ডার খার্গে ইতিমধ্যেই হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের দাবি, ওই দ্বীপের সামরিক ঘাঁটিগুলি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তবে তেলে এখনও হাত দেওয়া হয়নি। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহণে বাধা দেওয়া বন্ধ না করলে তৈলভান্ডারেও হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন তিনি। বিশ্লেষকদের দাবি, সে ক্ষেত্রে তরল সোনার আন্তর্জাতিক বাজারে পড়বে আরও বড় প্রভাব। লাগামছাড়া হতে পারে দাম।
ইরানে স্থল অভিযান শুরু করতে ইতিমধ্যেই পশ্চিম এশিয়ায় ইউএসএস ত্রিপোলি নামের একটি রণতরী পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। যুদ্ধজাহাজটি উভচর আক্রমণে পটু। তাতে ৩,৫০০ সৈনিক মোতায়েন আছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। এ দিকে আবার যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের মাধ্যমে দু’পক্ষের মধ্যে চলছে আলোচনা।
পশ্চিম এশিয়ায় লড়াই থামাতে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ইরানকে ১৫টি শর্ত দিয়েছে আমেরিকা। ট্রাম্পের দাবি, সেগুলির বেশির ভাগই মেনে নিয়েছে তেহরান। অন্য দিকে সাবেক পারস্যের প্রশাসন জানিয়েছে, এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তারা বসতে রাজি নয়। ফলে দ্রুত লড়াই থামার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
এই যুদ্ধের গোড়াতেই বিশ্বের তেলবাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক রুট হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে আইআরজিসি। এই রাস্তায় দুনিয়ার ২০ শতাংশ তরল সোনা রফতানি করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য আরব রাষ্ট্র। ফলে হরমুজ় খুলতে তেহরানকে বার বার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন। সেই লক্ষ্যেই মার্কিন ফৌজ স্থল অভিযানে নামতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
অতীতে ‘গ্রাউন্ড অপারেশনে’ নেমে আফগানিস্তান এবং ভিয়েতনামে নাকানিচোবানি খাওয়ার ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর। ইরানের পাথুরে মরুভূমিতে তাদের সাফল্যের উপরই নির্ভর করবে ট্রাম্পের তেল দখলের স্বপ্ন। আর ব্যর্থ হলে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুখ পুড়বে আমেরিকার।