Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

প্যারিসকে নাৎসিমুক্ত করলেন ‘পাপা’

ওরফে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। বাষট্টি বছর আগে তাঁর লেখা একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হল সম্প্রতি। যুদ্ধক্লান্ত সৈনিকদের হাসিঠাট্টা, ক্ষোভ-হতাশা যেন সাহিত

১৯ অগস্ট ২০১৮ ০০:৩৬
Save
Something isn't right! Please refresh.
সপ্রাণ: সেনাদের সঙ্গে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ১৯৪৪। ছবি: গেটি ইমেজেস

সপ্রাণ: সেনাদের সঙ্গে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ১৯৪৪। ছবি: গেটি ইমেজেস

Popup Close

বন্ধু প্রকাশককে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর পরে লেখাগুলো ছাপাতে পারো।’ মৃত্যুর পরে কেন? কারণ লেখাগুলোতে যুদ্ধের কথা, অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের কথা আছে। নিয়মিত যোদ্ধা নন, যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এমন ক’টি চরিত্র নিয়ে তৈরি হয়েছিল গল্পের বুনোট। তাঁর নিজের কাছেই লেখাগুলো ছিল ‘শকিং’!

সেই লেখাগুলোর একটিই প্রকাশিত হয়েছে ‘স্ট্র্যান্ড’ পত্রিকায়। প্রকাশ পাওয়ামাত্রই শোরগোল। এ যেন আবারও নোবেলজয়ী লেখকের জনসমক্ষে আসা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘আ রুম অন দ্য গার্ডেন সাইড’ ছোটগল্পে অনতিক্রম্য আর্নেস্ট হেমিংওয়েই ধরা পড়েছেন!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও প্যারিস থেকে নাৎসি বাহিনীর পিছু হঠা, হেমিংওয়ে লিখেছেন তাঁর গল্পে। যুদ্ধে ধ্বস্ত জীবন কী ভাবে পাল্টে যায়, তা খুঁজতে গিয়ে লেখক যেন নিজেকেই খুঁজেছেন প্যারিসের মাটিতে।

Advertisement

এমনিতে হেমিংওয়ের লেখায়, স্মৃতিচারণায় ঘুরে-ফিরে এসেছে প্যারিস। এই গল্পেও প্রবলভাবে উপস্থিত এই শহর আর সেখানকার রিৎজ় হোটেল! বলে রাখা ভাল, রিৎজ় হোটেলের পানশালাকে তিনি নাৎসিমুক্ত করেছিলেন বলে এমনিতেই তাঁর প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল! ছিল ফিরে দেখার টান। এই রিৎজ় হোটেলেই কথক রবার্ট গল্প বুনেছে। তার ডাকনাম ‘পাপা’। হেমিংওয়ের ডাকনামও পাপা। অনেকেই তাই মনে করছেন, রবার্টকে মুখ্য চরিত্র করে এ আসলে হেমিংওয়েরই আত্মকথন।

গল্পের সময়কাল ১৯৪৪ সালে নাৎসিদের হাত থেকে ফ্রান্স মুক্ত হওয়ার অব্যবহিত পরে। ক্লান্ত সৈনিকরা তখন নিজেদের অস্ত্র পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখছে। পর দিন হোটেল ছেড়ে যাবে তারা। মদ্যপানের আসরে চলছে আড্ডা, হাসিঠাট্টা। রবার্ট ক্লান্তি দূর করার জন্য বোদলেয়ারের কবিতা পড়ছে। সঙ্গে মার্সেল প্রুস্ত ও ভিক্টর উগো। নিজে লেখক হয়েও কেন সে অস্ত্র তুলে নিয়েছে, তার কারণটা নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য রবার্ট বলছে, ‘‘আই ডিড ইট টু সেভ দ্য লাইভস অব পিপল হু হ্যাড নট হায়ার্ড আউট টু ফাইট।’’ যুদ্ধশ্রান্তির সঙ্গে কবিতার অনুষঙ্গ বোধহয় হেমিংওয়েই মেলাতে পারেন!

১৯৫৬ সালে লেখা এই গল্পের পরতে পরতে হেমিংওয়ে দেখিয়েছেন, কী ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া বাহিনীর মধ্যেও শ্রেণিবিভাজন, উঁচু-নিচু ভেদ থাকে। ধোপদুরস্ত এক কর্নেল সম্পর্কে রবার্ট বলছে, ‘‘উনি আমাদের দিকে তাকিয়েও দেখেন না। কেন না, আমরা অভব্য, নিয়মানুবর্তিতা না জানা আমেরিকান। উনি ভাবেন, গ্যারেজের মিস্ত্রি হওয়া ছাড়া অন্য যোগ্যতা আমাদের নেই।’’

আসলে যুদ্ধ হেমিংওয়ের প্রেরণা। যে লেখার জন্য হেমিংওয়ে হেমিংওয়ে, তার সব কিছুর মূলেই যুদ্ধ-ক্ষত-মৃত্যু। ‘আ রুম অন দ্য গার্ডেন সাইড’ও তার ব্যতিক্রম নয়। সদ্য জয়ী সেনাদের আড্ডাতেও কোথাও মৃতদের জন্য বিষাদ। রয়েছে ফ্যাসিবাদের আগ্রাসনে প্যারিসের সংস্কৃতি অক্ষত রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ও।

ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধ, আজীবন এই দুইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন হেমিংওয়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে কখনওই তিনি ‘প্যাসিভ ওয়াচার’ নন, বরং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। কখনও সরাসরি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, কখনও আবার সাংবাদিক হিসেবে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রেড ক্রস-এর হয়ে এক জন অ্যাম্বুল্যান্স চালক হিসেবে ইতালিতে যাওয়া, সেখানে মর্টারের আঘাতে গুরুতর জখম। বাড়িতে লেখা চিঠিতে সে দিন তিনি জানিয়েছিলেন, দেহে মোট ২২৭টি ক্ষত রয়েছে! হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীনই রেড ক্রস-এর নার্স অ্যাগনেসের সঙ্গে প্রেম। দুজনে বিয়ে করবেন বলে যখন স্থির, তখনই অ্যাগনেসের চিঠি, তিনি অন্য কারও প্রেমে পড়েছেন।

পরবর্তী কালে যুদ্ধ-প্রেম-প্রত্যাখানের সেই ধারাবিবরণীই উঠে এসেছে প্রেম ও যুদ্ধের মহাকাব্যিক অ্যাখ্যান ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এ! একই ভাবে স্পেনের গৃহযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে আর এক উপন্যাস ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’-এ। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র জ্যাক বার্নেস (দ্য সান অলসো রাইজ়েস), হ্যারল্ড ক্রেবস (সোলজার’স হোম), নিক অ্যাডামস (বিগ টু-হার্টেড রিভার)— সকলেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে-আসা এক-এক জন মানুষ।

যুদ্ধক্ষেত্রই হয়ে উঠেছিল তাঁর আমরণ প্রেমিকা। ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম যেমন তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি (চার বার বিয়ে করেছেন), তেমনই তাঁকে স্থিতি দেয়নি যুদ্ধও। সে জন্য তাঁকে বিতর্কের মুখেও পড়তে হয়েছিল। এক জন যুদ্ধ সংবাদদাতা সক্রিয় ভাবে যুদ্ধে অংশ নিতে পারবেন না, জেনিভা কনভেনশনের এই নীতি লঙ্ঘন করেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কী ভাবে তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্যারিস গিয়েছিলেন ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল প্রবল।

কিন্তু সে সব কিছুকেই বিশেষ আমল না দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আই হ্যাড আ সার্টেন অ্যামাউন্ট অব নলেজ অ্যাবাউট গেরিলা ওয়ারফেয়ার।’’ আসলে বরাবর ওই স্পর্ধাটা ছিল তাঁর মধ্যে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি থেকে ফিরে আসার পরেই তিনি ‘ওয়ার হিরো’, আফ্রিকায় এক জন দক্ষ শিকারি, কিউবায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় রীতিমতো বিশেষজ্ঞ এক মানুষ, স্পেনে ষাঁড়ের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমে পড়া— বহুমুখী ধারায় প্রবহমান জীবন!

যদিও নিজের ‘সুপার ম্যাসকিউলিন’ ভাবমূর্তি সরিয়ে রেখে হেমিংওয়ে বরাবর বিশ্বাস করতেন, এক জন লেখকের কাজ আসলে নিভৃতে, একাকী। ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের জন্য ১৯৫৪ সালে নোবেল পেয়েছিলেন। কিন্তু পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুষ্ঠানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে হেমিংওয়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি। ওই অনুষ্ঠানের জন্য তিনি যে লেখাটা পাঠিয়েছিলেন সেখানে এক জন প্রকৃত লেখক সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘‘এক জন লেখকের যা বলার, তা লিখে বলা উচিত।’’ সেই কথা মেনেই যখনই নতুন কোনও অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তখনই ফসল ফলিয়েছেন নিজের লেখায়।

আজীবন ওই দুর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চারিজমের মধ্যেও কোথাও একটা ‘বিপন্ন বিস্ময়’ কাজ করত হেমিংওয়ের। তাই ১৯৬১ সালে নিজের শিকার করার বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রেই তিনি এই আত্মহত্যাপ্রবণ মানসিকতা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও জল্পনা, বিতর্ক রয়েছে। লেখকের বাবা-ভাই-বোন, সকলেই আত্মহত্যা করেছিলেন। ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ লেখাকালীন বাবার আত্মহত্যার খবর পেয়ে তিনি এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘আমিও বোধহয় এ ভাবেই চলে যাব!’’

তাঁর তীব্র গতিময় জীবনের শেষ মাইলফলকে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটার জুড়ে থাকা নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি রেখে গিয়েছেন যুদ্ধ-ক্ষত, ধ্বংস, বিপন্নগাথার মধ্যেও হার-না-মানা মানুষ, অনন্ত জীবনকে। কে ভুলতে পারে ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের সেই শব্দগুলো: ‘মানুষকে পরাস্ত করা যায় কিন্তু হারানো যায় না!’



Tags:
Story Nazi Ernest Hemingwayআর্নেস্ট হেমিংওয়ে
Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement