×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

মুগুরের ওজন ২৫ সের

সায়ন্তনী সেনগুপ্ত
কলকাতা ৩১ মার্চ ২০১৯ ০০:০১
বর্ষীয়ান: গোবর গোহ, বৃদ্ধ বয়সে। ছবি সৌজন্য: গোহ পরিবার।

বর্ষীয়ান: গোবর গোহ, বৃদ্ধ বয়সে। ছবি সৌজন্য: গোহ পরিবার।

অম্বিকাচরণ গুহর বাড়িতে খুব ধুমধাম। উত্তর কলকাতায় বিরাট বাড়ি। পৈতৃক জমিজমা, পয়সাকড়ির অভাব নেই। গাড়ি, বাড়ি, লোকলস্কর, ভারী নামডাক। কলকাতার বড় বড় সাহেব কোম্পানির মুৎসুদ্দি এই গুহরা। সাহেবদের মুখে মুখে ‘গুহ’ পদবি কালে হয়ে গিয়েছে ‘গোহ’। উদার হৃদয়, দরাজ হাত অম্বিকাচরণকে লোকে বলে ‘রাজামশাই’। এই রাজামশাইয়েরই বড় ছেলে রামচরণ গোহ-র ঘর আলো করে এসেছে পুত্রসন্তান। ১৮৯২ সালের ১৩ মার্চ। দোলপূর্ণিমার দিন। অম্বিকাচরণের স্ত্রীর খুশি আর ধরে না। আঁতুড়ে গোলগাল স্বাস্থ্যবান বাচ্চাটিকে দেখে তিনি বললেন, ‘‘এ যে দেখি গোবরের তাল!’’ পাশ থেকে মুচকি হেসে দাই বলে উঠল, গোবরের তাল না গো, গোবর গণেশ। বড় হয়ে এই ছেলে একেবারে গোবর গণেশ হবে দেখো। তখন কে জানত, ছোটবেলার এই নাদুসনুদুস গোবরের তালই এক দিন ধারালো চেহারা আর পেটানো স্বাস্থ্য নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ায় শোরগোল ফেলে দেবেন! তাঁর শারীরিক ক্ষমতা, দুর্দান্ত স্কিল আর কুস্তির প্যাঁচপয়জার তাক লাগিয়ে দেবে বিশ্বকে! যতীন্দ্রচরণ গোহ ওরফে গোবর গোহই প্রথম পেশাদার কুস্তিবিদ যিনি বিদেশে যান কুস্তি লড়তে। তিনিই প্রথম ভারতীয় পালোয়ান যিনি কুস্তিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব জিতে নিয়ে আসেন। বস্তুত সেই প্রথম কোনও অশ্বেতাঙ্গ মল্লবিদ গোরাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন সেরার শিরোপা।

ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পথটা অবশ্য কখনওই সুগম ছিল না গোবরের পক্ষে। যে খেতাব বিদেশিরা নিজেদের কব্জায় রেখে দিয়েছিলেন এত দিন ধরে, হঠাৎ এক হিন্দু পালোয়ান কোথা থেকে এসে সেই খেতাব জিতে যাবে, এটা হজম করা সম্ভব ছিল না তাঁদের পক্ষে। প্রতি পদে বাধা দেওয়া হয়েছে গোবরকে, অনৈতিক ভাবে জিতিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীকে। মার্কিন খবরের কাগজগুলি দিনের পর দিন আজগুবি গালগল্প লিখে গিয়েছে তাঁকে নিয়ে। অসীম নিস্পৃহতায় সব কিছু দেখে গিয়েছেন গোবর। প্রতিপক্ষ বারবার খেলার নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। সাচ্চা খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তির গোবর ভরসা রেখেছেন বিচারকের রায়ের ওপর। নিজে কখনও জেতার জন্য অনৈতিক পন্থা নেননি।

তবে এ সব অনেক পরের কথা। পেশাদার মানসিকতা আর দৃঢ় নৈতিক চরিত্র অর্জনের শিক্ষা তাঁর শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, মা নির্মলাসুন্দরী দেবী এবং কাকা ক্ষেত্রচরণ গোহর কাছে। বাড়িতে কুস্তির চর্চা আগে থেকেই ছিল। গোবর নাড়া বাঁধলেন কাকার কাছে। ক্ষেতুবাবু নিজে দক্ষ মল্লবিদ ছিলেন। তাঁর নিজের এমন কিছু কুস্তির কৌশল ছিল যা পঞ্জাবি বা পাঠান কুস্তিগিরদের জানা ছিল না। তিনি যত্ন করে সেগুলি শিখিয়েছিলেন শিষ্যকে। পরে গোবর তালিম নেন খোসলা চৌবে এবং রহমানি পালোয়ানের কাছ থেকে। লাহৌরের ওস্তাদ পালোয়ান কলিকা বাগলা রোজকার রুটিনের তদারকি করতেন। দক্ষ তালিমের জোরে সাত-আট ঘণ্টা লাগাতার কুস্তি চালিয়ে যাওয়ার পরও গোবরের দম ফুরোত না। তাঁর ওজন ছিল ২৪৫ পাউন্ড, মানে ১১১ কিলোর একটু বেশি। পায়ের শক্তি বৃদ্ধির জন্য তিনি ১৫ মণ ওজনের পাথরের নেক কলার গলায় পরতেন। তাঁর মুগুরের ওজন ছিল ২৫ সের। গামা পালোয়ান, ইমাম বক্স, আলি সাই আহমেদ বক্স কাল্লুর মতো বাঘা বাঘা পালোয়ানরা গোবরের সঙ্গে কুস্তি লড়া শুরু করলেন। এতে সুবিধা হল গোবরের। বিভিন্ন ঘরানার পালোয়ানের সঙ্গে লড়ার ফলে তিনি কুস্তির কায়দাগুলি আরও ভাল করে রপ্ত করলেন। কিন্তু বাধা এল অন্য দিক থেকে। গোবরকে সবাই বলেন ‘রইস কা লড়কা’। এই বাড়ি থেকেই কুস্তির মাসোহারা পান যাঁরা, তাঁরা কি না লড়বেন মালিকের ছেলে গোবরের সঙ্গে? কুস্তির সময় ইচ্ছে করেই পূর্ণশক্তি প্রয়োগ করতেন না তাঁরা। বরং খেয়াল রাখতেন যাতে গোবর কোনও ভাবে চোট না পান। আখড়ায় নেমে গোবর দিব্যি বুঝতেন সে কথা। তাঁর তখন সতেরো-আঠারো বছর বয়েস। গায়ে মত্ত হাতির বল। কুস্তি লড়ে যখন সাধই মিটছে না, তখন আর শুধু শুধু এখানে পড়ে থাকা কেন? তা ছাড়া বড়লোকের ছেলে পেশাদার কুস্তিবিদ হয়ে দঙ্গলে নামলে সমাজের চোখরাঙানির ভয়ও কম ছিল না। সব ভেবেচিন্তে জামাইবাবু শরৎচন্দ্র মিত্রের পরামর্শে কুস্তি লড়ার জন্য বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন গোবর। ১৯১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বড় গামা, আহমেদ বক্স, ইমাম বক্সকে সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দিলেন তিনি। কালাপানি পেরোনো তখন সাংঘাতিক ব্যাপার। গোবর বিত্তবান পরিবারের ছেলে বলে তাঁকে অর্থের কথা ভাবতে হয়নি। কিন্তু সেই সময় রাজ পৃষ্ঠপোষকতাতেও কুস্তিবিদরা বিদেশে যেতে চাইতেন না। ১৮৮৬ সালে নৃসিংহগড়ের রাজা বিদেশি পালোয়ানদের সঙ্গে লড়ার জন্য মল্লসম্রাট বুটাকে লন্ডনে পাঠাতে চেয়েছিলেন। শোনা যায় বুটা বিরাট জিভ কেটে বলেছিলেন, ‘‘হুজুর, বিদেশে যেতে হলে শুনেছি কালাপানি পাড়ি দিতে হয়। আর কালাপানি পাড়ি দেওয়া মানেই তো জাত যাওয়া। জাতই যদি যায় তা হলে রুপেয়া-উপেয়া দিয়ে কী হবে?’’ আরও অনেকের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটেছিল। নিষ্ঠাবান কায়স্থ পরিবারের সন্তান গোবর কুস্তির কাছে সমস্ত সংস্কারকে তুচ্ছ করেছিলেন।

Advertisement



গোবর গোহ। বাঙালি তাঁকে মূলত চেনে পালোয়ান হিসেবে। কিন্তু তাঁর মধ্যে শক্তির সঙ্গে মিশেছিল প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম, সঙ্গীতবোধও। ছবি সৌজন্য: গোহ পরিবার।

ইউরোপ-আমেরিকার কুস্তিবিদরা ভারতীয় মল্লবিদদের তখন বেশ তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখতেন। অথচ ১৮৯২ সালেই কলকাতায় পঞ্জাবি পালোয়ান করিম বক্স আয়ারল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন মল্লবিদ টম ক্যানন-কে শোচনীয় ভাবে পরাস্ত করেছেন। টমের সঙ্গী, গ্রিক চ্যাম্পিয়ন আন্তোনিয়ো পিরি-রও একই দশা হয়েছিল। কিন্তু এঁরা দুজনেই স্বদেশে নিজেদের পরাজয়ের কথা সম্পূর্ণ গোপন করেন। ফলে কুস্তি লড়ার জন্য গোবররা যখন ইংল্যান্ডে এসে পৌঁছন, তাঁদের নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি হয়। এর পরেই আমেরিকার বেনজামিন রোলার, পোল্যান্ডের স্তানিসলস সিবিস্কো, সুইটজ়ারল্যান্ডের জন লেম ধরাশায়ী হলেন গামা আর ইমাম বক্সের হাতে। প্রথম বার বিলেতে আসামাত্র গোবরকে ফিরে যেতে হয়েছিল বাড়ির জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে— মা অসুস্থ। ভারতীয়দের হাতে সাহেবদের পরাজয়ে উৎসাহিত গোবর কিছু দিনের মধ্যেই ফের ইংল্যান্ডে এসে শুরু করলেন জয়ের অভিযান। ১৯১৩-র অগস্টে এডিনবরায় স্কটিশ চ্যাম্পিয়ন জিমি ক্যাম্বেলকে এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটে চিৎ করেছিলেন গোবর। কিছু দিন পরেই লন্ডনে জিমি এসনকে হারিয়ে ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতলেন তিনি। কুস্তিতে চ্যাম্পিয়ন হলেন বটে, কিন্তু রেসলিং চ্যাম্পিয়নের প্রাপ্য ‘জন বুল বেল্ট’ তাঁকে দেওয়া হল না, কারণ তিনি ‘যদিও ব্রিটিশ প্রজা, কিন্তু জন্মসূত্রে ব্রিটিশ নন’। আসলে ব্রিটিশদের অধীনে থাকা ভারত থেকে এক জন এসে তাঁদের গর্বের খেতাব কেড়ে নিল, এটা মানতে পারেননি ইংরেজরা। ওই বছরই প্যারিসে মল্লযুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ছিল। সারা পৃথিবীর বাঘা বাঘা চ্যাম্পিয়নরা এসেছিলেন সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সেখানে বেলজিয়ামের হ্যানসন আর জার্মানির কার্ল জাফট-কে অবলীলায় পরাজিত করেন গোবর।



শৈশব: ছোটবেলায় গোবর গোহ

ডাক পড়ল আমেরিকা থেকে। আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ এবং মল্লবিদের দেশে খেতাব এবং অহমিকার রক্ষায় তখন মল্লক্রীড়ায় যে কোনও নীতিকে এ দিক-ও দিক করতেও প্রস্তুত সে দেশের মানুষ। ১৯২০-র ২৬ অক্টোবর গোবর আমেরিকার উপকূলে হফম্যান বন্দরে এসে পৌঁছলেন বটে, কিন্তু তখনই তাঁকে নিউইয়র্কে ঢুকতে দেওয়া হল না, ‘কোয়ারান্টাইন’ করে রাখা হল। দেড় মাস পরে যখন ছাড়া পেলেন, তখন তিনি ক্লান্ত, বিরক্ত। আশ্চর্য, দশ দিনের মাথাতেই তাঁকে জোর করে ডাচ কুস্তিবীর টমি ড্রুক-এর বিরুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হল! প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, অনুশীলনে দীর্ঘ ছেদ— এই সমস্ত কথা টেকেনি। তবুও জয় গোবরেরই নিশ্চিত ছিল, যদি না রেফারি অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করতেন। এক বার বিখ্যাত আমেরিকান মল্লবিদ এডওয়ার্ড স্ট্র্যাঙ্গলার লুইস-এর সঙ্গে কুস্তিতে নামবেন গোবর। প্রথম দুটি রাউন্ড ড্র হওয়ায় তৃতীয় রাউন্ডে গোবরকে ফাউল করে হারালেন লুইস। নির্বিকার রইলেন রেফারি। পরে অবশ্য লুইসকে হারিয়েছিলেন গোবর। এক ঘণ্টারও কম সময়ে চিৎ করেছিলেন তাঁকে। তবে লুইসকে গোবরের বিরুদ্ধে খেলতে নামানো আমেরিকার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত ছিল। কোনও বিভাগে চ্যাম্পিয়ন থাকাকালীন অবস্থায় আমেরিকানরা তাদের মল্লবিদকে সুনাম এবং খেতাব হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে গোবরের বিরুদ্ধে নামাতেন না। এতটাই ছিল তাঁদের গোবর-ভীতি। অথচ বিদেশে সম্পূর্ণ অচেনা পদ্ধতিতে খেলতে হয়েছে গোবরকে। ভারতে যেখানে মাটিতে খেলা হয়, বিদেশে সেখানে খেলা হত ম্যাটের ওপর। সেখানে কুস্তির স্বীকৃত নিয়ম ছিল গ্রেকো রোমান পদ্ধতি। এই নিয়মে প্রতিপক্ষের কোমরের নীচে ধরলে ফাউল ধরা হত। ফ্রি-স্টাইল কুস্তিতে অভ্যস্ত গোবর এই নিয়মে আগে কখনও খেলেননি। তবে কোনও বাধাই দমাতে পারেনি তাঁকে। ১৯২১ সালে সানফ্রান্সিসকোতে তৎকালীন লাইট হেভিওয়েট রেসলিং চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যান্টেলকে গোহারা হারিয়ে পদক জিতে নেন তিনি। কুস্তিতে কোনও ভারতীয়ের সেই প্রথম বিশ্বজয়। মোহনবাগানের শিল্ড জয়ের পর ভীরু, দুর্বল অপবাদ ঘুচিয়ে সাহেবদের দেশে পরাধীন দেশের এক নাগরিকের জয়যাত্রা। বাঙালি তথা ভারতবাসীর কাছে এই জয়ের গুরুত্ব যে অপরিসীম ছিল তা বলাই বাহুল্য।



গোয়াবাগানে গোবর গোহের আখড়া। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই আখড়াই ধ্যানজ্ঞান ছিল তাঁর।

প্রায় ছয় বছর আমেরিকায় ছিলেন গোবর। এই সময়ে তিনি একের পর এক কুস্তিবিদকে চিৎ করেছেন। খ্যাতি যত বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁকে নিয়ে গুজবও। বিশ্বসেরা হওয়ার কিছু আগে বিখ্যাত আমেরিকান স্পোর্টস কার্টুনিস্ট রিপ্লে লিখলেন, শক্তি বাড়ানোর জন্য গোবর রোজ সোনা খান। লেখার সঙ্গে ছবি, মাটিতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে সোনা খাচ্ছেন গোবর। আমেরিকায় মহা হইচই পড়ে গেল মহাক্ষমতাশালী অ্যাথলিটের শক্তিবৃদ্ধির ‘সিক্রেট’ জানতে পেরে। শেষে লরি প্র্যাট নামে এক সাংবাদিক লিখলেন, ও সব কিছু না। গোবরের আসল ক্ষমতা তাঁর শ্বাস নিয়ন্ত্রণে। সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নিতে এসে বহু বার চেষ্টা করেছেন তাঁকে বেকায়দায় ফেলার। এক বার ইভলিন ওয়েলস নামে এক মহিলা সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, আমেরিকায় এসে নতুন কী কী শিখলেন? মুচকি হেসে গোবর জবাব দিয়েছিলেন, ‘‘জাঙ্ক, বাঙ্ক, বাম, আরও বেশ কিছু আমেরিকান স্ল্যাং।’’ উত্তর শুনে ইভলিন থতমত। পরের প্রশ্ন ছিল, হলিউডের কোনও সিনেমা দেখেছেন? গোবর বলেছিলেন, অবসর সময়ে এ দেশে কিছু করার নেই বলে সিনেমা দেখি। কিন্তু এখানকার সিনেমা খুব একঘেয়ে আর অবাস্তব। এই ইভলিনকেই গোবর বলেন বার্নার্ড শ’ এবং অস্কার ওয়াইল্ডের লেখার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা।



স্পোর্টস কার্টুনিস্ট রিপ্লে লিখলেন, শক্তি বাড়ানোর জন্য গোবর রোজ সোনা খান। লেখার সঙ্গে ছবি, মাটিতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে সোনা খাচ্ছেন গোবর।

তখনকার সংবাদপত্র কখনও তাঁকে বলেছে ‘হিন্দু মিনেস’, আবার কখনও তাঁর প্রজ্ঞা, ধীরস্থির স্বভাবের জন্য নাম দিয়েছে ‘জেন্টল জায়ান্ট’। আমেরিকা ও ভারতের জাতিভেদ প্রথা এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধেও কথা বলেছিলেন তিনি। সুদর্শন যুবক গোবর, উচ্চতা ছ’ফুট দুই ইঞ্চি। আয়ত চোখ, খড়্গ নাসা। যে পোশাকই পরেন, একটা চাদর উপরে ঘুরিয়ে নেন নিজেকে ভারতীয় বোঝাতে। বিদেশেও তাঁর পছন্দ দেশি পোশাক। নিউ ইয়র্কের এক সভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের জীবন ও শিক্ষা নিয়ে। গাঁধীর প্রতিও ছিল গভীর শ্রদ্ধা। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ যখন ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করছেন, তখন গোবর ইংল্যান্ডের মাটিতে দাঁড়িয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশদের। ‘স্ট্যান্ডার্ড এগজ়ামিনার’ কাগজে তিনি লেখেন, ইংল্যান্ড কোনও দিন ভারতে তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। বিশ্বযুদ্ধের সময় সে সহায়তা চেয়েছিল, আমাদের দেশ লোকবল অর্থবল দিয়ে তাকে সাহায্য করেছিল। বিনিময়ে কী পেলাম? রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বোঝা যায়, কতটা ক্ষিপ্ত আর পীড়িত হয়েছিলেন তিনি এই ঘটনায়।



স্মৃতি: গোবর গোহের ঘরের টেবিলে তাঁর ছবি, স্মারক ও অন্যান্য জিনিসপত্র।

দেশে ফিরে প্রথমে মসজিদবাড়ি স্ট্রিট, পরে গোয়াবাগানে আখড়া তৈরি করেন তিনি। বাইরের জগৎ থেকে এক রকম বিচ্ছিন্ন এই আখড়াই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধ্যানজ্ঞান ছিল তাঁর। কারণও ছিল হয়তো। যে অবিচার দেশের বাইরে বারবার তাঁর সঙ্গে হয়েছে, স্বদেশে অন্তত তার সম্মুখীন হতে হবে না, আশা করেছিলেন হয়তো। কিন্তু তা হয়নি। ১৯২৯ সালে পার্ক সার্কাসে কংগ্রেসের অধিবেশনে কুস্তি প্রদর্শনীতে গোবর গোহর প্রতিপক্ষ ছিলেন ছোট গামা। ছোট গামা পরপর দু’বার ফাউল করা সত্ত্বেও কী কারণ দেখিয়ে তাঁকেই বিজয়ী ঘোষণা করেন মুর্শিদাবাদের নবাব। গোবরের নামে অনেকেই পিছনে বলতেন, উনি তো বিদেশে কিছু শৌখিন কুস্তির ভ্যারাইটি শো জিতে এসেছেন! কান দেননি তিনি। দলাদলি, রাজনীতির পাঁক থেকে দূরে রেখেছেন নিজেকে। এক সময়ে সাজপোশাকে শৌখিন ছিলেন। বাহারি পাগড়ি, সূক্ষ্ম কাজের কাশ্মীরি শাল পরা গোবরকে ‘প্রিন্স গোবর’ বলতেন বিদেশিরা। সেই তিনিই দেশে গাঁধী টুপি আর সহজ সাধারণ ফতুয়া ছাড়া আর কিছু পরতেন না। ধুতি নিয়ে হত সমস্যা। এত লম্বা লোক সচরাচর বাঙালিদের মধ্যে হয় না। অর্ডারি ধুতি আনা হত তাঁর জন্য। যুবক বয়স থেকেই আতরের শখ ছিল। বয়স হওয়ার পর তার ব্যবহারও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হরেক খোপওয়ালা কারুকার্যময় আতরের বাক্সটা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন আখড়াতে। আখড়ায় বিদ্যুৎ পর্যন্ত রাখতেন না বাহুল্য বোধে। প্রত্যেক শিষ্যের খুঁটিনাটির খবর রাখতেন। গা ঘামিয়ে ছেলেরা যখন তাঁর বাড়ি যেত, প্রত্যেককে নিজের হাতে গুড়ের শরবত বানিয়ে দিতেন। সত্যেন বোস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, গাঁধীজির প্রথম একান্ত সচিব অধ্যাপক নির্মলকুমার বসু প্রায়ই আসতেন আখড়ায়। মান্না দে ছিলেন তাঁর মেজ ছেলের বন্ধু, রীতিমতো কুস্তি শিখতেন এখানে। গোবরের ছেলেরাও কুস্তি শিখেছেন এই আখড়াতেই। বড় ছেলে রতন গোহ রাজ্য কুস্তি ফেডারেশনের সচিব ছিলেন। মেজ ছেলে মানিক জাতীয় হেভিওয়েট কুস্তি চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

এক সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন। এস্রাজ বাজাতেন চমৎকার। মৃত্যুর কিছু দিন আগে মেয়েকে বলেছিলেন ধুলো ঝেড়ে যন্ত্রটা বার করে দিতে। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি, রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পরে আমেরিকায় তোলা তাঁর একটা ছবি বাড়ির লোকেদের দিয়ে বলেছিলেন, রেখে দাও, কাজে লাগবে। সেই রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। গোবরের মৃত্যুর খবর পেয়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কেদারায় কাত করে রাখা ছিল এস্রাজটা। মুখে যন্ত্রণার চিহ্ন নেই, পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিলেন গোবর গোহ। ‘দ্য জেন্টল জায়ান্ট’। সুর, প্রজ্ঞা আর শক্তি যাঁর মধ্যে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল।

কৃতজ্ঞতা: জয়ন্ত গোহ, ইন্দ্রনীল গোহ।

Advertisement