×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ জুন ২০২১ ই-পেপার

তিনিই এই ঝড়গুলিকে প্রথম চিহ্নিত করেন ‘সাইক্লোন’ নামে

তাঁর সতর্কবার্তা কানে তোলেনি কেউ

সুপ্রতিম কর্মকার
০৬ জুন ২০২১ ০৭:৩৩
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

বহু বার বলা হয়েছিল। তবু তাঁর কথা কেউ কানে তোলেনি। গভীর আত্মদহনে ভুগতে থাকেন, মদ্যপানে আসক্তি আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এক ঝড়ে সুন্দরবনের কাছে সদ্যনির্মিত ক্যানিং বন্দর, গোসাবা, হ্যামিল্টনগঞ্জের জনপদ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বোঝা গেল, তাঁর কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। খোঁজাখুঁজি শুরু হল। খবর পাওয়া গেল তিনি নেই। তিনি ‘সাইক্লোন’ শব্দের স্রষ্টা, কলকাতার হেনরি পিডিংটন সাহেব।

এমনিতেই জন্মলগ্ন থেকে কলকাতা বন্দরে গভীরতার সমস্যা। কলকাতা বন্দরের জন্মের অনেক আগেই ভাগীরথী নদী গঙ্গার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গঙ্গায় পলির পরিমাণ বাড়ায় নাব্যতার সঙ্কট দেখা দেয়। বড় জাহাজ চলাচলের সমস্যা হচ্ছিল বন্দরে। সেই সময় থেকেই বিকল্প বন্দরের ভাবনাচিন্তা চলছিল। উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক, চার্লস মেটকাফ, লর্ড অকল্যান্ড, লর্ড ডালহৌসির আমল পেরিয়ে ভারতের গভর্নর জেনারেলের চেয়ারে বসেছেন লর্ড ক্যানিং। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই সাহেবের মাথায় ঘুরছে কী ভাবে বন্দরের সমস্যা সমাধান করা যায়। কলকাতা থেকে একটু দূরে, সাগরের কাছে ক্যানিং বন্দরের কাজ শুরু হল।

বন্দরের কাজ প্রাথমিক ভাবে কিছুটা শুরু হওয়ার পর ঝড় আসে। আর তাতেই ভেঙে তছনছ সদ্য গড়ে ওঠা ক্যানিং বন্দরের শরীর। এমন সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহলে সকলের মনে পড়ে গেল পিডিংটন সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী। গরিবের ছেলে, চালচুলোহীন পিডিংটন বহু আগেই কোম্পানির বড় পদের মানুষদের বুঝিয়েছিলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে জন্ম নেওয়া সাইক্লোন তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সাগরের কাছে গড়ে ওঠা ক্যানিং নামের বন্দর শহরটিকে।

Advertisement

জাহাজের জীবনের ভাল-মন্দ সমস্ত দেখা লেখা থাকে লগবুকে। সাত সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় কবে কী ভাবে ঝোড়ো বাতাস কিংবা সাইক্লোনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তার নিখুঁত বর্ণনা থাকে সেখানে। আর এই সব পর্যবেক্ষণ করেই পিডিংটন সাহেব সাইক্লোন নিয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। লিখেছিলেন ‘দি হর্ন বুক ফর দ্য ল অব স্টর্মস ফর দ্য ইন্ডিয়ান অ্যান্ড চায়না সি’ নামে বইটি, যা প্রকাশ পেয়েছিল ১৮৪৪ সালে।

অগত্যা ঝড়ের জন্যই ক্যানিং কলকাতা বন্দরের বিকল্প হয়ে উঠতে পারল না। কাজেই ফের নতুন করে শুরু হল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির বিকল্প পথ খোঁজা।

কলকাতা তার জন্ম থেকেই দেখেছিল নানা সাইক্লোনের চেহারা। সাইক্লোন যেমন ধ্বংস করে, তেমন ভাবেই প্রকৃতি নতুন ইতিহাস রচনা করার প্রেক্ষাপটও তৈরি করে। সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর এই তিন মৌজার সীমারেখা ছিল গঙ্গা, আর গঙ্গা থেকে বেরনো দুটো খাল। সুতানুটি ও কলিকাতার মধ্যে যে খাল ছিল, তা গঙ্গা থেকে বেরিয়ে পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো, ঠনঠনে হয়ে শিয়ালদহ ও বেলেঘাটার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত ছিল। আর কলকাতা ও গোবিন্দপুরের মধ্যে যে খাল ছিল, তা চাঁদপাল ঘাট থেকে বিনির্গত হয়ে ক্রিক রো হয়ে মৌলালি দিয়ে প্রবাহিত ছিল।

এই ক্রিক খাল কি কোনও দিন ভেবেছিল, তার ললাটলিখন পাল্টে যাবে এক ঝড়ে! ৩০ সেপ্টেম্বর ১৭৩৭ সাল। সারাটা দিন ধরে টিপটিপ করে বৃষ্টি, সন্ধেবেলা শুরু হল বাতাসের প্রলয়নাচন। বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে এল ঝড়। রাতভর মুষলধারে বৃষ্টি, মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় গঙ্গার জল বেড়েছিল ১৫ ইঞ্চি।

সে দিনের কলকাতা ছিল অন্য রকম।

দিনে-দুপুরে বাঘ ডাকে। গভীর জঙ্গলে ভরা চৌরঙ্গী এলাকা। সুতানুটি এলাকার আশপাশে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিছু বড় কর্তাব্যক্তির বাড়ি। আর ছোটখাটো বস্তি। সব মিলিয়ে সেই ‘কলিকাতা’-র জনসংখ্যা মেরেকেটে হাজার তিনেকের বেশি হবে না।

আর কলকাতার বাইরে উল্টোডাঙার কথাই ধরুন। উল্টোডাঙার খালের সঙ্গে যোগ ছিল বিদ্যাধরীর। এই পথ দিয়ে চলত খুলনা, যশোরের সঙ্গে বাণিজ্য। এই এলাকা তখন ঝোপজঙ্গলে ভর্তি। পণ্য নিয়ে প্রচুর ডিঙি ভিড় করত খালপাড়ে। মেরামতির জন্য, গায়ে আলকাতরা মাখিয়ে ডিঙিগুলোকে উল্টো করে রাখা হত। ওই জায়গার নাম তাই লোকমুখে হয়ে যায় উল্টোডিঙি।

৩০ সেপ্টেম্বরের ঝড়ের কথায় ফেরা যাক। সেই ঝড়ে ক্রিকের মধ্যে থাকা বহু বড় বজরা, নৌকো ডুবে যায়। কাজেই এই খালপথ আর নৌ-চলাচলের উপযুক্ত থাকে না। এ তথ্য জানা যায় ফ্রান্সিস রাসেলের লেখা থেকে। ইংরেজ কোম্পানি ঠিক করে, এই খাল বুজিয়ে ফেলা হবে। খাল বুজিয়ে রাস্তা তৈরি হল। এই রাস্তার নাম ক্রিক রো।

সেই উনিশ শতকে সামুদ্রিক ঝড় নিয়ে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে নানা চিন্তাভাবনা। ১৮১৬ সালে সমুদ্রস্রোতের উদ্ভবের কারণ আবিষ্কার করছিলেন জার্মানির আলেকজ়ান্ডার ভন হামবোল্ট। পৃথিবীর গায়ে চাদরের মতো লেপ্টে থাকা বাতাসের চাপ, সাগরের জলে মিশে থাকা লবণের পরিমাণ, জলের নিজের শরীরের উষ্ণতা, মেঘ থেকে বৃষ্টিকণার দলবদ্ধ শক্তি, সূর্য থেকে ছুটে আসা গরম রোদে গা ভাসিয়ে জলের বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া, মহাশূন্যে পৃথিবীর নিজের কক্ষপথে বনবনিয়ে ঘুরে চলা সেই আবর্তন গতির প্রভাব, ঋতুর পরিবর্তন, সাগরের তলদেশের ভূপ্রকৃতি, বরফের গলে যাওয়া... এমন অনেক কিছু মিলে মিশে নিয়ন্ত্রণ করে সাতসমুদ্রের দামাল জলরাশির স্রোতের চলাচলের পথ। এখানেই স্রোতের নিয়ম ও বেনিয়ম, ঝড়ের কারসাজি।

কলকাতার পিডিংটন এই কারসাজির কথা জানতেন। প্রথম দিকে ঝড় নিয়ে তাঁর তেমন আগ্রহ ছিল না। ১৮৩৮ সালে তাঁর হাতে এল লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়ম রিড-এর ‘ল অব স্টর্মস’ বইটি। ঝড় সম্পর্কে জানার আগ্রহ পিডিংটনকে আরও পেয়ে বসল। পড়ে জানলেন, সেই সময় রিড সাহেবকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন জাহাজের মাস্টার অ্যাটেনডেন্ট ক্যাপ্টেন ক্রিস্টোফার বিডেন। মাদ্রাজে থাকতেন তিনি। পিডিংটন নানা ভাবে তখন ঝড়ের খবর সংগ্রহ করছেন। পরিচিত এক বন্ধুর মুখে তিনি খবর পেলেন, আমেরিকাতেও এক জন কাজ করছেন ঝড় নিয়েই। যোগাযোগ করলেন সুদূর আমেরিকায় রেডফিল্ড সাহেবের সঙ্গে। পিডিংটনের আগ্রহ দেখে ব্রিটিশ সরকার সমুদ্রের ঝড় সম্পর্কে সমস্ত তথ্য তাঁকে প্রেরণ করেন। শুরু হল গভীর নিরীক্ষণ। শুধুমাত্র জাহাজের লগবুকগুলো থেকে তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন সমুদ্রঝড়ের গতিবিধি। তিনি লক্ষ করলেন, প্রতিটি ঝড়ের একটা শান্ত কেন্দ্র থাকে। যে কেন্দ্রের চার পাশে বাতাস কখনও ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে, কখনও ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে। তবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই ঝড় পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে হচ্ছে না দক্ষিণ গোলার্ধে তার উপর। গ্রীষ্মপ্রধান ক্রান্তীয় অঞ্চলে সাগর থেকে ধেয়ে আসা ঝড়কে পিডিংটন সাহেব প্রথম নাম দিলেন ‘সাইক্লোন’। গ্রিক শব্দ ‘সাইক্লস’ থেকে সাইক্লোন শব্দের জন্ম। যার অর্থ হল ‘বৃত্ত’। কলকাতায় বসে পিডিংটনই প্রথম ‘সাইক্লোন’ শব্দের স্রষ্টা।

এ তো দেড়শো বছরেরও আগের কথা। কিন্তু তার পরেও মানুষের চৈতন্য হল না। বাড়ল কলকারখানার সংখ্যা। প্রচুর গাছ কাটা হল। দূষণ বাড়তে শুরু করল। পৃথিবীরও উষ্ণতা বাড়ল। দুই মেরু থেকে গলতে লাগল বরফের ভান্ডার। ক্রমশ বাড়ল সমুদ্রের জলের স্তর। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল সাগরের জলে উপরিতলের তাপমাত্রা। কাজের জলের বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার পরিমাণ বেড়ে সাগরের বুকে তৈরি হল নিম্নচাপ। প্রকৃতির নিয়মে, সেই নিম্নচাপের শূন্যস্থান ভরাট করতে আশপাশ থেকে ছুটে এল ঠান্ডা বাতাসের স্রোত। নিজের শক্তিকে ক্রমশ বাড়িয়ে নিয়ে নিম্নচাপ পরিণত হল সাইক্লোন থেকে সুপার সাইক্লোনে।

বিজ্ঞানীরা দেখছেন, বঙ্গোপসাগরের উষ্ণতার তারতম্য বেশি লক্ষ করা যায় মে, অক্টোবর আর নভেম্বর মাসে। এই সময় বেশি ধেয়ে আসে ঝড়। ১৮৭৭ থেকে ২০০৫ সাল অবধি ১২৯ বছরে বঙ্গোপসাগরে ২৬ শতাংশ বেড়েছে উচ্চ ক্ষমতাশালী সাইক্লোনের পরিমাণ। আর ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। আরও একটা হিসেব দেওয়া যাক। ১৮৯১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ৩০৮টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে, যার মধ্যে সাইক্লোনের আকার নিয়েছিল ১০৩টি।

দেখা যাচ্ছে, ভারত মহাসাগরে সাইক্লোনের জন্ম নেওয়ার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা ঝড়ের প্রবণতা বাড়ার কারণ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন সমুদ্রজলের উষ্ণতার অতিরিক্ত তারতম্যকে। ২০১৪ সালের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর রিপোর্ট স্পষ্টত জানিয়ে দিচ্ছে, বার বার এই সাইক্লোনের জন্য দায়ী বিশ্ব উষ্ণায়ন।

একটু পিছনের দিকে হেঁটে বাংলার উপকূলভাগে সাইক্লোনের গল্পটা বোঝা যাক। ২০০৬ সালে ‘মালা’, ২০০৭ সালের ‘সিডার’, ২০০৮ সালের ‘রশ্মি’ ও ‘নার্গিস’, ২০০৯ সালে ‘বিজলি’ ও ‘আয়লা’, ২০১০ সালের ‘গিরি’, ২০১৩ সালের ‘ফাইলিন’, ২০১৫ সালের ‘কোমেন’, ২০১৮ সালের ‘তিতলি’, ২০২০ সালের ‘আমপান’, ২০২১ সালে সদ্য চলে যাওয়া ‘ইয়াস’ পর্যন্ত একের পর এক সাগরে জন্ম নেওয়া ঘূর্ণিঝড় প্রবল শক্তি জুটিয়ে ছুটে এসেছিল সুন্দরবনের বুকে। সুন্দরবনের উপকূলভাগ খুব একটা সুগঠিত নয়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র তার জলে ভাসা পলি বয়ে এনে প্রতিদিন তিলে তিলে নির্মাণ করছে এই সক্রিয় ব-দ্বীপ। কাজেই ঝড় এই অঞ্চলে ক্ষতি করে খুব বেশি।

ঝড় যে কী ভাবে এই অঞ্চলের ভূভাগ পাল্টে দেয়, তাও বোঝা গিয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলেই। বাংলার সার্ভেয়র জেনারেল হিসেবে জেমস রেনেল তখন দায়িত্ব নিয়েছেন। সারা বাংলায় নৌকো করে ঘুরে ঘুরে নদীর সমীক্ষা চালাচ্ছেন। সময়টা সপ্তদশ শতকের শেষের দিক। রেনেল সাহেব তখনই দেখেছিলেন, এক দিকে জোয়ার আর অন্য দিকে সাইক্লোনের সময় বঙ্গোপসাগরের বুকে ওঠা বড় বড় ঢেউ, অল্প সময়ের মধ্যে পাল্টে ফেলেছিল হাতিয়া দ্বীপের চেহারা। এই কাজের যেন কোনও অব্যাহতি নেই।

আজও তাই। আমপান থেকে ইয়াস— নিস্তার নেই যেন। কয়েকশো বছর ধরে ভুলের খেসারত দিচ্ছে মানুষ। ব্রিটিশরা সুন্দরবনের জঙ্গলে মানুষের বসতি স্থাপন করেছিল। সেটা প্রথম ভুল। পরিবেশের দস্তুর না মেনে আজও আমরা সুন্দরবনে পর্যটন থেকে দিঘা, মন্দারমণিতে সমুদ্রতটে একের পর এক হোটেল নির্মাণ করে চলেছি। যে ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনকে আর ঝাউবন দিঘার তটরেখাকে বাঁচাত, সেখানে কংক্রিটের রাস্তা মানুষের জয়পতাকা নয়, ভ্রান্তিবিলাসে আচ্ছন্ন পরাজয়ের নিশান, আত্মধ্বংসী পদক্ষেপ।

শতাব্দী জুড়ে চলা সব ভুল থেকে এ বার মানুষের শিক্ষা নেওয়ার পালা। ধ্বংসের পর আসে নতুন সৃষ্টি। এটাই জীবনের দস্তুর!



Tags:

Advertisement