×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৩ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

শিকড়

অরুণাভ দত্ত
২৯ নভেম্বর ২০২০ ০০:০৬
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

সুপ্রিয় গ্রামের বাড়িতে ফিরল প্রায় বিশ বছর পর। বাড়িটা বয়সের ভারে ধুঁকছে। চামড়া, মাংস খসে পড়া কঙ্কালসার বাড়ির বাগানে এক হাঁটু কাঁটাঝোপের জঙ্গল গজিয়েছে। পশ্চিম কোণের সুপুরি গাছদুটো মাটি থেকে উপড়ে বাগানেই পড়ে শুকিয়ে গিয়েছে। ঠাকুরদার কেনা জমির উপর সুপ্রিয়র বাবা কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন। তখন গ্রামে পাকা বাড়ি খুব বেশি ছিল না। সুপ্রিয়দের পাড়ায় কয়েক ঘর গৃহস্থের বাস ছিল। ছিল কাঁচা রাস্তার দু’ধারে তাল, সুপুরি, নারকেল গাছের সারি। এখন গ্রামের খোলনলচে পাল্টে গিয়েছে। বাস থেকে নেমেই সুপ্রিয় দেখেছিল গ্রামে পিচের রাস্তা হয়েছে। বুড়ো শিবের মন্দির পাকা হয়েছে। গ্রামের একমাত্র কেষ্টর মুদিখানা কোন কালে বিকিয়ে গিয়ে বাইকের শোরুম হয়েছে। সুপ্রিয়র পাড়ায় যাওয়ার রাস্তার দু’পাশে বড় বড় দুটো পুকুর ছিল। লোকে বলত জোড়াপুকুর। সুপ্রিয় সেই জোড়াপুকুর খুঁজে পাচ্ছিল না। পথচলতি এক বৃদ্ধ সুপ্রিয়কে প্রশ্ন করলেন, “কী খুঁজছ বাবা?”

“জোড়াপুকুরটা কোন দিকে?”

“জোড়াপুকুর বুজিয়ে মাঠ করে দিয়েছে কবে। কার বাড়ি যাবে?”

Advertisement

“হেডমাস্টার মধুসূদন রায়ের বাড়ি। আমি ওঁর ছেলে।”

পরিচয় শুনে বৃদ্ধের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “তুমি সুপ্রিয়! তা বাবা, আমাকে চিনতে পারছ?”

সুপ্রিয়র বৃদ্ধকে চেনা চেনা লাগল বটে। বৃদ্ধ নিজেই বললেন, “আমি তোমাদের স্কুলের স্বপনদা।”

“স্বপনদা!” সুপ্রিয়র স্কুলের সাবস্টাফ স্বপন আইচ। সুপ্রিয়র বাবা সেই স্কুলেরই হেডমাস্টার ছিলেন। সুপ্রিয়কে খুব ভালবাসতেন স্বপন। সুপ্রিয় তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, “ভাল আছ?”

“ওই চলে যাচ্ছে বাবা। হেডমাস্টারমশাই কেমন আছেন?”

“বাবা জুলাইয়ের সাত তারিখ স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন।”

“সে কী!” স্বপনের চোখদুটি ভিজে উঠল, “কী ভালমানুষটাই না ছিলেন তিনি। কত ছেলেপুলেদের বিনিপয়সায় পড়িয়েছেন, বইখাতা কিনে দিয়েছেন। এখনও আমরা তাঁর নাম করি। তুমিও তেমনই সোনার টুকরো ছাত্র ছিলে। এখন কী করছ?”

“ইন্টিরিয়র ডিজ়াইনিং।”

“সেটা কী?”

“ওই... বাড়িঘরদোর সাজানো আর কী!”

“তোমার তো এত ভাল মাথা! ডাক্তারি পড়লে না কেন?”

সুপ্রিয় মুচকি হাসল। স্বপন সুপ্রিয়কে বাড়ির পথটা দেখিয়ে দিলেন। সুপ্রিয় তার ছেলেবেলার পাড়াটাকে আর চিনতে পারছিল না। টালির বাড়ি, গোয়াল আর চোখে পড়ে না। সিংহভাগ ফাঁকা জমিগুলোয় পাঁচিল দেওয়া হয়েছে। পথের দু’ধারের গাছের সারি, বাঁশঝাড়ের কোনও চিহ্ন নেই। পাতার শিরশির শব্দ, কাঠবেড়ালির কুটুরকুটুর, ঘুঘু-ফিঙে-বেনেবৌ-দোয়েলদের ডাক যেন পৃথিবীর বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন বাইকের হর্নে কান পাতা দায় হয়েছে। মহেশজেঠুদের সেই তালবাগানটা খুঁজছিল সুপ্রিয়। ভাদ্র মাসে ঝড়বৃষ্টি হলে সারি সারি তালগাছ থেকে ধপাধপ তাল পড়ত মাটিতে। গ্রামের ছেলেপুলেদের মধ্যে তাল কুড়োবার হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। সুপ্রিয়দের পাশের বাড়িটা ছেলেবেলার বন্ধু বিল্টুর। পুজো-আচ্চার দিনে বিল্টুর জেঠিমা কী চমৎকার নারকেল নাড়ু, আনন্দনাড়ু তৈরি করতেন। বিল্টুদেরও বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট উঠছে। 

স্কুলজীবন কাটিয়ে কলেজে পড়বার জন্য কলকাতায় চলে গিয়েছিল সুপ্রিয়। চাকরি পাওয়ার পর আর গ্রামে ফেরা হয়নি। মাস্টারমশাইও তখন রিটায়ার করেছেন। দেখাশোনার সুবিধার্থে বৃদ্ধ বাবা-মা’কে কলকাতায় নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল সুপ্রিয়। মাস্টারমশাইয়ের জীবন ছিল এই গ্রাম। সুপ্রিয়র মায়ের ধ্যান-জ্ঞান ছিল তাঁর বাড়ি, বাগান। এদের ছেড়ে যাওয়ার কথা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। কিন্তু ছেলের জেদ, রাগ, অভিমানের কাছে নতজানু মাস্টারমশাই বুকের কষ্ট বুকেই চেপে রেখে সস্ত্রীক কলকাতায় চলে গেলেন। যাওয়ার আগে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বাড়ির চাবি দিয়েছিলেন এবং সেই বন্ধুর পরামর্শেই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাড়িতে ভাড়াটে বসিয়েছিলেন। বন্ধুর ছেলে মৃদুল ভাড়ার টাকা প্রতি মাসে কলকাতায় পাঠিয়ে দিত। বছরদুয়েক হল বাড়ির ভগ্নদশা দেখে ভাড়াটে উঠে গিয়েছে। মাস্টারমশাই ছেলেকে বার বার বলতেন, “আমি টাকা দিচ্ছি। তুই শুধু বাড়িটাকে মেরামত করার ব্যবস্থা কর। ও বাড়িতে আমরা ফিরে যাই। এখানে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠছে!” 

সুপ্রিয় উত্তর দিত, “হবে মেরামত। এই বছরটা যাক।” কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যে সুপ্রিয় সে সময় পায়নি। ও দিকে বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল মৃদুল। সেও নিজের কাজকর্ম ফেলে এ সবের ঝক্কি সে আর পোহাতে পারছিল না। তাই ভাড়াটে উঠে গেলে মৃদুল বাড়ি বিক্রির জন্য চাপ দিতে লাগল, “সুপ্রিয়দা, বাড়ি যে উইতে ছেয়ে গেছে, ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়ছে। আর কিছু দিন পর বাড়িটা ভেঙেচুরে মাটিতে মিশে যাবে। আমাদের এখানে তাপস চক্রবর্তী খুব বড় প্রোমোটার হয়েছে। অনেক ফ্ল্যাটবাড়ি তুলছে। ওকে জমিটা দিয়ে একটা ফ্ল্যাট বা থোক টাকা যা হোক নিয়ে নাও।”

প্রস্তাবটা মনে ধরেছিল সুপ্রিয়র। কিন্তু মায়ের মতামত প্রয়োজন। সুপ্রিয়র মা জানতেন যত দিন স্বামী ছিল, তত দিন জোর ছিল। এখন স্বামীর হাফ পেনশন পেলেও শরীরে জোর নেই একা জীবন কাটানোর। তিনি এক কথায় বাড়ি বিক্রির মত দিলেন। সুপ্রিয় তাই আজ বাড়ির দলিলপত্র সঙ্গে নিয়ে প্রোমোটারের সঙ্গে রফা করতে গ্রামে এসেছে। সাইকেলের ক্রিং-ক্রিং আওয়াজ শুনে সুপ্রিয় পিছনে তাকাল। মৃদুল সাইকেল থেকে নামতে নামতে বলল, “বাড়ির হাল দেখেছ সুপ্রিয়দা?”

“হ্যাঁ, বাড়ি বেহাল হয়েছে আর গ্রামের হাল ফিরেছে।”

“সব তাপস চক্রবর্তীর কল্যাণে। ও এখানকার বেস্ট প্রোমোটার। বিল্টুদের বাড়িটা তো ও-ই নিয়েছে।”

“বিল্টুরা কেমন আছে?”

“বিল্টু তো ঘরজামাই। আর ওর বাবা, মা, জ্যাঠাইমা কবে মারা গেছে।”

“মহেশ জেঠুদের তালবাগানের কী হল?”

“বেচে দিয়েছে। যে কিনেছে, সে বাগান কেটে ফেলে টোটো রাখার গ্যারেজ করছে।”

“আর পাড়ায় ঢোকার মুখে অত গাছপালা...?”

“তাপসদা কেটে ফ্ল্যাট তুলছে।”

“বলিস কী রে!”

“তোমার এই বাড়ি, বাগান মিলিয়ে সাড়ে তিন কাঠা জায়গা। তাপসদা যেন কত স্কোয়ার ফুট ফ্ল্যাট হবে বলল। পরশু সকালে তাপসদা আসবে এখানে। এ বাড়ির উপর তাপসদা অনেক দিন ধরে নজর রেখেছে। আমাকে বলেছিল তোমায় রাজি করাতে।”

“তোরও তার মানে কিছু কমিশন আছে তা হলে।”

মৃদুল মুচকি হেসে বলল, “তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে তো?”

“দু’দিনের তো ব্যাপার। ভাবছি এ বাড়িতেই থাকি।”

“এ বাড়িতে?” মৃদুল অবাক হল, “তুমি কলকাতার লোক, এখানে থাকতে পারবে?” 

“পারব।”

“ইলেকট্রিক অফিস থেকে কানেকশন কেটে দিয়েছে কিন্তু।”

“সঙ্গে মোমবাতি, টর্চ সব আছে।”

“তা হলে আমি কাজে যাবার আগে সকাল আর দুপুরের খাবারটা দিয়ে যাব। সন্ধেয় হারুর মা রাতের খাবার দিয়ে যাবে।”

“কে হারুর মা?”

“আমার বাড়িতে রান্না করে। সন্ধেবেলা এখান দিয়েই বাড়ি যায়।” 

মৃদুল চলে গেলে সুপ্রিয় বাড়িতে ঢুকল। সদর দরজার কাছে এসে মনে পড়ল, বাবা স্কুল থেকে ফিরে এখানে সাইকেল রাখতেন। উঠোন, ঘর, বারান্দা দেখতে দেখতে সুপ্রিয়র স্মৃতিতে হু হু করে ভেসে আসতে লাগল ছেলেবেলার দিনগুলো। জানলা দিয়ে উচ্ছে, কুমড়ো গাছ ঢুকে রান্নাঘর প্রায় জঙ্গল। চাতালের টালি ভেঙে ছাদের সিঁড়িতে জঞ্জাল। সুপ্রিয় মা’কে ফোন করে জানাল ঘরদোরের দুরবস্থার কথা। মা জিজ্ঞেস করলেন, “বাগানটার কী অবস্থা খোকা?”

“বাগান এখন জঙ্গল।”

“কাগজি লেবুর গাছটা আছে?” বাগানে আগাছার জঙ্গলের মধ্যে সুপ্রিয় লেবু গাছটা খুঁজে পেল না।

“রঙ্গন গাছটা?” 

সেটা দেখা গেল। থোকা থোকা লাল রঙ্গন ফুল ফুটে আছে। 

“আর কৃষ্ণচূড়া, জবা, স্থলপদ্ম, বেল, নিম, দুটো নারকেল গাছ...?”

“কিছু আছে, কিছু মরে গেছে।”

“আর বট গাছটা?”

ঘাসে ঢাকা মাঠের পাশে সুপ্রিয়দের বাড়ি। মাঠের উত্তর-পূর্ব কোণে একটা পুরনো বট গাছ কিছু ডালপালা, ঝুরিসমেত বাড়ির কুয়োতলার উপর হুমড়ি খেয়ে জায়গাটা অন্ধকার করে রেখেছে। দেখে মনে হয়, গাছটা এক হাত দিয়ে আগলে রেখেছে একতলা বাড়িটা। মাঠের মধ্যে আছে বলে মাস্টারমশাই গাছটা কাটেননি। সুপ্রিয় ছেলেবেলায় গাছের ঝুরি ধরে কত দোল খেয়েছে। “সেটাও দিব্যি আছে মা।”

অন্ধকার নামলে সুপ্রিয় মোমবাতিগুলো জ্বেলে দিল। বাগানের অন্ধকারে জোনাকি জ্বলছে। শরতের বাতাস বাগান থেকে বয়ে আনছে বেলফুলের মিষ্টি গন্ধ। সুপ্রিয়র মনে পড়ল, বট গাছের কোটরে একটা পেঁচা থাকত। মাঝরাত হলেই শোনা যেত তার ডাক। গ্রামে শেয়াল আর বাঘরোলের খুব উৎপাত ছিল। 

ভাবতে ভাবতেই ঘরের বাইরে জমাট অন্ধকারে কাকে যেন চুপিসারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সুপ্রিয়। টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল এক জন বৃদ্ধাকে। 

“কে ওখানে?” বৃদ্ধা নীরবে হাত তুলে দেখালেন শালপাতার একটি ঠোঙা। নিশ্চয় হারুর মা। “ভিতরে আসুন।” বৃদ্ধা ঘরে ঢুকলে মোমবাতির আলোয় স্পষ্ট হল তার অবয়ব। ছিপছিপে চেহারা, বয়সের ভারে পিঠ কুঁজো হয়ে পড়েছে, রোদে পোড়া গায়ের চামড়া, খড়ের আঁটির মতো পাকা চুল মাথা থেকে কোমর অবধি নেমেছে। বৃদ্ধ বয়সে এত লম্বা, ঘন চুল সুপ্রিয় আগে কখনও দেখেনি। পরনে মেটে রঙের শাড়ি। বৃদ্ধা ঠোঙা নামিয়ে রাখলেন। বৃদ্ধার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করলে মড়মড় শব্দ হচ্ছে। যেন হাড়গোড়গুলোর একটাও আস্ত নেই। হঠাৎ ঘরের বাতাস যেন গুমোট হয়ে উঠল। দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। সুপ্রিয় কারণটা বুঝতে পারল না। 

“বসুন।” 

“বসলে আর উঠতে পারি না বাবা। দাঁড়িয়েই আরাম।” কী মিহি কণ্ঠস্বর। যেন পাতার শিরশির শব্দ। কান পেতে শুনতে হয়। 

“জল খাবেন?”

“ও বেলা খেয়েছি।”

“ও বেলা জল খেয়েছেন বলে এ বেলা খেতে নেই না কি?” 

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন, “তুমি বাবা আমায় চিনতে পারবে না। কিন্তু এ বাড়ির সবাই আমায় খুব চেনেন। ছোটবেলায় তুমি আমায় অনেক দেখেছ, এখন হয়তো তোমার আর মনে নেই।”

বৃদ্ধাকে স্মৃতির অতলে তন্নতন্ন করে খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল সুপ্রিয়। বৃদ্ধা কিন্তু একে একে বাড়ির সবার খোঁজখবর নিলেন। মাস্টারমশাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। 

“শুনলুম বাড়িটা না কি বিক্রি 

হয়ে যাবে?”

“হ্যাঁ।”

“তোমার কাছে আমার একটা আর্জি ছিল বাবা।” 

“বলুন?”

“আমি এ বাড়ির কেউ নই বটে, কিন্তু সম্পর্ক বহু দিনের। বড় মায়া পড়ে গেছে বাড়িটার ওপর। তোমার বাড়ি তুমি যা ইচ্ছে করো। কিন্তু বাগানের গাছগুলো নষ্ট কোরো না। তোমার মায়ের বড় যত্নের বাগান।”

“দেখি কী করা যায়...” সুপ্রিয় জানে প্রোমোটার বাড়ি, বাগান কিছুই আস্ত রাখবে না। সুপ্রিয়র অন্তরের ভাব যেন বুঝতে পেরে আশাহত হয়েই বৃদ্ধা বিদায় নিলেন। মুহূর্তে সতেজ হয়ে উঠল ঘরের বাতাস। শালপাতার ঠোঙা খুলে সুপ্রিয় দেখল, চিঁড়ে, মধু এবং সামান্য কিছু ফল আছে তাতে। 

পরদিন সকালে মৃদুল জনাপাঁচেক ছেলে-ছোকরা নিয়ে হাজির। সকলের হাতে কাটারি, কোদাল, ঝুড়ি। সুপ্রিয়কে দেখে এক গাল হেসে বলল, “গ্রামের ছেলেপুলে সব। বাগান কাটাতে নিয়ে এলুম।”

“এখনই?”

“হ্যাঁ। তাপসদা নিজের লোক দিয়ে বাগান কাটাবে। এমন সব পুরনো গাছ, মোটা মোটা গুঁড়ি। আমরা কাটালে বেচতে পারব।” সুপ্রিয় বুঝল জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবেতেই মৃদুল নিজের কমিশন রাখছে। সুপ্রিয়র হাতে দুটো খাবারের ক্যান তুলে দিয়ে মৃদুল অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, “সুপ্রিয়দা, আমার ভুলে কাল সারা রাত তোমায় উপোস করে কাটাতে হল। হারুর মা’টা এমন বেয়াক্কেলে... কাল সন্ধেবেলা তোমার খাবারটা আমার রান্নাঘরে রেখে বাড়ি চলে গেছে। আর আমিও রাত করে বাড়ি ফিরেছি...”

“কিন্তু হারুর মা যে এসেছিল! আমাকে বলে গেল এ বাড়ির সঙ্গে তার বহু দিনের সম্পর্ক...” 

“বলো কী গো!” মৃদুল আকাশ থেকে পড়ল, “হারুর মা মাসখানেক হল গ্রামে এসেছে। আর তোমার রাতের খাবার এখনও আমার রান্নাঘরে শুকোচ্ছে! কে এসেছিল গো? দিনকাল কিন্তু ভাল নয়। চোখ-কান খোলা রেখো।”

সুপ্রিয় হতভম্ব। এক অজানা আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে উঠল। দুটো নারকেল গাছ কেটে আগাছা সাফ করতেই সন্ধে নামল। মৃদুল রাতের খাবার দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিয় কিছুই দাঁতে কাটল না। গতকালের বৃদ্ধার কথা ভাবতে ভাবতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না। শেষ রাতের দিকে পায়চারি করতে করতে সে কুয়োতলায় এসে দাঁড়াল। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। তার আলোয় চারদিক সাদা। এ দিক-ও দিক তাকাতে তাকাতে সুপ্রিয়র চোখে পড়ল বাগানে নারকেল গাছের কেটে রাখা গুঁড়ি দুটো নেই, তার জায়গায় দুটো মানুষ শুয়ে আছে। একটু কাছে যেতেই ভয়ে সুপ্রিয় আপাদমস্তক শিউরে উঠল। দুটি নারীর নগ্ন, রক্তাক্ত দেহ পাশাপাশি পড়ে রয়েছে। কে যেন কুপিয়ে তাদের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দিয়েছে। 

ঠিক সেই মুহূর্তে কুয়োতলার দিক থেকে খড়খড় শব্দ শুনে সুপ্রিয় তাকিয়ে দেখল আরও অদ্ভুত দৃশ্য। বট গাছের ঝুলে থাকা ডালপালাগুলো ছোট হয়ে ধীরে ধীরে একটি অস্থিচর্মসার মানুষের হাতের আকার নিচ্ছে। মাটিতে নেমে আসা ঝুরিগুলো ক্রমশ হয়ে উঠছে কোনও বৃদ্ধার মাথার পাকা চুল। সুপ্রিয় দেখল, বট গাছটা গত রাতের সেই বৃদ্ধার মূর্তি ধরেছে! এ কি স্বপ্ন না মায়া? বাগানের প্রবীণ, নবীন সমস্ত গাছ এক-একটি নারীমূর্তির আকার নিয়ে মিছিলের ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে সুপ্রিয়র দিকে। সবার সামনে সেই বৃদ্ধা। সুপ্রিয় নির্বাক, নিশ্চল। সকলে সুপ্রিয়র সামনে নতজানু হয়ে বসল। সুপ্রিয় দেখল, নারীরা কেউ কাঁদছে আবার কেউ বা দু’টি হাত ভিক্ষা চাওয়ার ভঙ্গিতে মেলে ধরেছে শূন্যে।

“তোমরা কারা?” 

“প্রকৃতি।” সকলের সম্মিলিত কণ্ঠের উত্তর। 

“কী চাও?”

“জীবন।” সকলে সমস্বরে করুণ কান্নার সুরে অনুরোধ জানাল, “দয়া করে আমাদের কেটো না। আমরা তোমায় বাঁচাব, প্রাণের জোগান দেব। তোমার শিকড় শক্ত রাখব আমরাই।” আস্তে আস্তে কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢেকে যাচ্ছে নারীদের অবয়ব। বাতাসের শব্দের মতো ফিকে হয়ে আসছে করুণ আর্তনাদ। পুবের আকাশ ফর্সা হচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে আজানের মৃদু সুর।

 

“কোথায় চললে সুপ্রিয়দা?” সকালে সুপ্রিয়কে তৈরি হয়ে বেরোতে দেখল মৃদুল।

“কলকাতায়।”

“দশটার সময় প্রোমোটার আসছে যে!”

“তাকে বলে দিস, বাড়ি বেচব না। বাড়ি মেরামত হবে। মাকে নিয়ে মাঝে-মাঝেই আসব। আর খবরদার, বাগানের একটা গাছও কাটবি না। নতুন গাছের চারা বসাব।”

“তুমি কলকাতা থেকে এখানে থাকতে আসবে?” মৃদুলের গলায় বিস্ময়ের সুর।

“আলবাত আসব! এটাই যে আমার শিকড় রে! শিকড় ছাড়া কি বাঁচা যায়?”

Advertisement