লাখ কথার কমে বাঙালির বিয়ে কোনও কালেই হয়নি। দু’পক্ষের হাজার ঝক্কি সামলে একটি শুভদিন দেখে বিয়ের ব্যবস্থা হয়। বিস্তর নিয়ম-নীতি পেরিয়ে শেষে বর-কনে একটু ফুরসত পায় বাসরঘরে। এ রাতে আবার ঘুমনো বারণ! এই সময়টা আত্মীয়, বোন, দিদি, ঠাকুমা-দিদিমাদের ঠাট্টা-তামাশা, রঙ্গরসিকতার মোক্ষম সময়। বাসরঘরকে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বাসের বন্যা ছোটে।
বাঙালির কাব্য-ঐতিহ্যে বাসরঘর নিয়ে আড়ম্বর আছে কি? ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে, কালকেতু ও ফুল্লরার বিয়ের দিনে বরানুগমন থেকে খাওয়াদাওয়ার বিশদ বিবরণ থাকলেও, বাসরঘর প্রসঙ্গে কবি দ্বিজমাধব মাত্র দু’লাইনেই শেষ করে দিয়েছেন— ‘সেই নিশি বঞ্চে বীর রমণীর সঙ্গে/ প্রভাত সময়ে মাত্র শুচি হইল অঙ্গে।’ ‘চৈতন্যভাগবত’-এ বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে নিমাইয়ের বিয়ের রাতের নানা শাস্ত্রীয় কর্মকাণ্ড আর স্ত্রী-আচারের বিশদ বিবরণের পর, বর-কনে বাসরঘরে আসার পর কবি শুধু লেখেন, ‘ভোজন করিয়া সুখ-রাত্রি সুমঙ্গলে/ লক্ষ্মী কৃষ্ণ একত্র রহিলা কুতুহলে।’ ভারতচন্দ্র তাঁর কাব্যে হরগৌরীর বিয়ের খুঁটিনাটি বর্ণনা করেছেন। শিকড়ের গন্ধে শিবের কোমরে বাঁধা সাপগুলো পালিয়ে যাওয়ার জন্য, বাঘছালটা খসে পড়ে তাঁকে কী রকম উদোম করে দিয়েছিল, তারও সরস বর্ণনা দিলেন, ‘যেইমাত্র বুড়া বর হইল লেঙ্গটা/ আই মালো চেয়ে রৈল ফেলিয়া ঘোমটা।’ এখানে ভারতচন্দ্রের মতো রসিক কবিও তাদের বাসরঘরের প্রসঙ্গে একেবারেই চুপ। বেহুলা-লখিন্দরের সাতালি পর্বতে লোহার বাসরঘরেই সর্পদংশনের ঘটনাটি ঘটেছিল। সেখানে কবি কয়েকজন দাসী-সহ গুটিকয়েক সখীকে এনেছেন: ‘বেহুলা লখাই শুইল সুবর্ণের খাটে’। আর দেখি ‘তাহাতে খেলায় পাশা কন্যা আর বরে’। এর পরে কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ পাশা খেলার শেষে লেখেন, ‘নিদ্রায় আলস্য হৈল দুইজনে শুতি।’ কোনও রকম রোম্যান্টিকতা ছাড়া এমন সব সাদামাটা বিবরণ দেখে মনে হতে পারে, মধ্যযুগে বাসরঘরকে কেন্দ্র করে সম্ভবত কোনও হুল্লোড়ের ব্যবস্থা ছিল না। সাহিত্য-সমালোচক বারিদবরণ ঘোষের মতে, এই সব বাসরঘরকে কেন্দ্র করে হিন্দু চেতনায় যে আধ্যাত্মিকতা ছিল, সম্ভবত সেই কারণেই প্রাচীন কবিরা সেখানে উঁকি মারা উচিত কাজ মনে করেননি।
পরবর্তী কালে কিন্তু এই বাসরঘর নিয়ে বিয়ের আসরে মজার হাট বসে যেত। সব দেশেই কনের বান্ধবী, সম্পর্কিত বোন কিংবা ঠাকুমা-দিদিমা-স্থানীয়ারা বয়সের বাধা কাটিয়ে এক-এক ভাবে মাতিয়ে এসেছেন। এই দিন বরপক্ষের লোক সংখ্যায় কম থাকে বলে, কন্যাপক্ষই বরাবর সুযোগ নিয়ে এসেছে। বাসরঘরে ঢোকার পরই বরকে নানা পরীক্ষা দিতে হত। মুখোমুখি হতে হত নানা রকম কূট প্রশ্নের। উত্তর দিতে পারলে তৎক্ষণাৎ পরের প্রশ্ন ধেয়ে আসত। উত্তর দিতে না পারলে হেনস্থা হতে হত। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ইন্দিরা’-য় উপেন্দ্রর বিবাহে বাসরঘরের রসঘন চিত্রটি চমৎকার ফুটে উঠেছে। উপেন্দ্র ইতিপূর্বে অনেক ‘কর্নেল-জানরেল’-এর বুদ্ধিভ্রংশ করে বহু পল্টন জয় করলেও বাসরঘরে বড় বড় পটলচেরা ভ্রমরতারা চোখ, সারি বেঁধে কুণ্ডলী ফণা ধরা কেশরাশি নিয়ে হাজির হলে ভীতসন্ত্রস্ত উপেন্দ্র ইন্দিরাকে ইঙ্গিতে ডাকল। কিন্তু এ সব মজলিশে নির্লজ্জ ব্যাপার হয় বলে, সে কাছে না গিয়ে বাইরেই থাকল। সে আসরে নাচের আবদার এড়ানো গেলেও, গানের হুকুম মানতেই হল। উপেন্দ্র উত্তর ভারতীয় খেয়াল ধরলে অপ্সরাগণ বিরক্ত হয়ে বদন অধিকারী বা দাশু রায়ের গানের হুকুম দিল। সে ব্যাপারে বর অপারগ। সে কথা শুনে তারা অসন্তুষ্ট হয়ে বিদায় নিল।