×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৩ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

মীরাবাইয়ের গিরিধারী রক্তমাংসের চিরপ্রেমিক

অবন্তিকা পাল
২৮ মার্চ ২০২১ ০৪:৪৩
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পগ ঘুংরু বাঁধ মীরা নাচি রে,

ম্যায় তো নারায়ণ কি আপহি হো গয়ি দাসী রে॥

লোগ কহে মীরা ভই বাবরি ন্যাত কহৈ কুলনাশী রে।

Advertisement

বিষ কা পেয়ালা রাণাজী ভেজা পীবত মীরা হাঁসি রে।

মীরা কে প্রভূ গিরিধারী নাগর সহজ মিলে
অবিনাশী রে॥

রাজস্থানের রাজপুত মেয়ে। পরিবারের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে মেওয়ারের ভোজরাজাকে। পতিগৃহে পৌঁছে আপ্রাণ চেষ্টা করছে মানিয়ে নেওয়ার। তথাকথিত নারীসুলভ সাংসারিক কাজে তার মন নেই। থাকবেই বা কী করে। মন যে পড়ে আছে প্রেমিকের কাছে। সে সমস্ত দিন তার প্রিয় পুরুষের পায়ের সামনে বসে থাকে। মুখে মুখে প্রেমের কবিতা তৈরি করে। একতারা হাতে নিয়ে সে-সবে সুর দেয়। গান গায়। বিবাহিত সঙ্গীর প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ সে বোধ করে না। রাতবিরেতে বেরিয়ে পড়ে ধারেকাছের মন্দিরে। প্রেমিকের সঙ্গে এ-ই তার অভিসারবেলা। প্রতিবেশী থেকে পরিজন, সকলেই কানাঘুষো করতে থাকে। ভোজরাজা নিজের কুলমর্যাদা রক্ষা করতে স্ত্রীর জন্য ঘরেই একটি মন্দির তৈরি করে দেয়। বলে, তোমার যা কাব্য ও সঙ্গীতচর্চা, সব তুমি এখানেই কোরো। আয়ত আঁখির সুদর্শনা রাজপুত ঘরনি এই সিদ্ধান্তে অধিক প্রীত হয়। এর পর দিবারাত্র সে রাজবাড়ির অন্দরমহলের মন্দিরে পড়ে থাকে। সেখানেই কাব্য করে। সেখানেই তার প্রেম, পূজা, আত্মনিবেদন। এ দৃশ্য দেখে ভোজরাজ ক্রমশ অসূয়াপ্রবণ হয়ে পড়ে। রক্তমাংসের প্রেমিক না হলেই বা কী, হাজার হোক, পরপুরুষ তো। যে ভালবাসা তার হকের ছিল, তা অযাচিত ভাবে পেয়ে যাচ্ছে অন্য কেউ! উপরন্তু যে রাজপরিবারের গৃহদেবী কালী, সেই পরিবারের কুলবধূ হয়ে শক্তির পরিবর্তে ভোজরাজ ঘরনি বেছে নিচ্ছেন কৃষ্ণকে।

এক দিন যুদ্ধে ভোজরাজার মৃত্যু হয়। এমন তো নয় যে ভোজরাজকে মেয়েটি শ্রদ্ধা করত না, ফলে, আকস্মিক বৈধব্য তাকে আরও বেশি উদাসীন করে তোলে জাগতিক প্রত্যাশার প্রতি। নতুন রাজা ক্ষমতায় এসে তার গতিবিধি নানা ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। হত্যার ষড়যন্ত্র করে। এক পেয়ালা বিষ পাঠায় পতিগৃহের আত্মীয়েরা। সেই গরল মেয়েটি অমৃতের মতো পান করে। তারা এক ঝুড়ি সাপ পাঠায়। মেয়ে ঝুড়ি খুলে দেখে সাপের বদলে সেখানে রয়েছে একটি শালগ্রাম শিলা আর অনেক ফুল। শুভ্রবসনা মেয়ে এক দিন গৃহত্যাগী হয়। সাধুসঙ্গ করতে করতে গান বেঁধে চলে। তার পর এক দিন হারিয়ে যায়, নাকি মিলিয়ে যায় প্রেমিকের শরীরে, সে কথা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।

আকৈশোর সামাজিক ভাবে প্রত্যাখ্যাত এই মেয়েটি। সে তার কাব্যে শুধু ভালবাসা আর ভক্তির বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে মানুষের অন্দরে। অথবা কিছুই চায়নি। শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনা ব্যক্ত করেছে কবিতায়, অশ্রুতে, আর প্রতিবন্ধকতা পেয়েছে বার বার। মৃত্যুর পর তার নামে রাজস্থানের চিতোরগড়ে সুবিশাল মন্দির হয়। মানুষের মুখে মুখে ফেরে তার কবিতার ভাষা। যার মৃত্যুর পরেও পাঁচ-পাঁচটি শতক দেশে বিদেশে তাকে নিয়ে গবেষণা হয়, এ ব্রহ্মাণ্ড সেই সাধিকাকে, সেই ঘরের পাশের ঘরছাড়া মেয়েকে মীরা, মীরাবাই নামে চেনে। সন্তের জীবন মাত্রই গাথা-নির্ভর। মীরার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয় না।

হরি ম্হা দরদ দিবাণো।

ম্হারা দরদ না জাণো কোই॥

ঘায়ল রী গত ঘায়ল জাণ্যা।

হিবড়ো অগণ সংযোয়॥

জোহর কি গত জোহরি জাণৈ।

কেয়া জাণ্যা জণ খোয়॥

মীরা রী প্রভু পীড় মিটাঙ্গা।

যব বৈদ সাঁবরো হৈ॥

হরি, আমি তোমার জন্য বেদনাতুর, অথচ আমার বেদনা কেউ জানল না। অন্তরের অনলজ্বালা সে-ই বোঝে, যে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। জহুরি যতটা জহর চেনে, যে-সাধারণে জহর খুইয়েছে, সে তো ততটা চেনে না। হে প্রভু, বৈদ্যেরা যখন পীড়ার উপশম ঘটাতে অক্ষম, তুমি এসে মীরার কষ্ট
দূর করো।

ভক্তি আন্দোলনের যে সুদীর্ঘ ইতিহাস দক্ষিণ ভারতে সূচিত হয়েছিল, তা শুরুর দিকে ছড়িয়ে পড়ে সপ্তম থেকে নবম শতকে। ক্রমশ তামিলনাড়ু আর কর্নাটক থেকে বাংলা হয়ে তা বিস্তার লাভ করে সমগ্র উত্তর ভারতে। এর সময়কাল পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক। ভক্তি আন্দোলনের সাধক-সাধিকারা ছিলেন শিব ও কৃষ্ণের উপাসক। দক্ষিণে যেমন শৈব সাধকের সংখ্যা বেশি দেখা গিয়েছিল, পূর্ব ও উত্তর ভারতে তেমনই বৈষ্ণব উপাসকের আধিক্য। সুরদাস থেকে তুলসীদাস, চৈতন্য থেকে মীরা, শ্রীকৃষ্ণের এহেন সাধকেরা কেউই কিন্তু মহাভারতে উল্লিখিত রথচালক যোদ্ধা কৃষ্ণের সাধনা করেননি। তাঁদের কাছে কৃষ্ণ মানে ভাগবৎ পুরাণের বিষ্ণুর অবতার, যে মানবশরীরে জন্ম নিয়েছিল মথুরায়।

মীরার কৃষ্ণও তাই রক্তমাংসের চিরপ্রেমিক। এই প্রেমিক দেবতা বটে, কিন্তু মীরা তাকে শুধু মালা দিয়ে পুজো করতে চায় না, সাজাতেও চায়। গান দিয়ে তুষ্ট করতে চায় না, প্রীত করতে চায়। মীরা চায় কৃষ্ণের সঙ্গে অঙ্গীভূত হতে, তাই বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের যুগল মুরতি দেখে মনে মনে সে রাধার অবস্থানে নিজেকে উপনীত করে। মানব ও দেবতার মধ্যে তখন আর উচ্চনীচ ভেদ থাকে না। সখ্য তৈরি হয়। সে ঈশ্বর দীনের ঈশ্বর, বঞ্চিতের ঈশ্বর, দৈনন্দিনতায় যাকে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে, পরম আশ্লেষ দিয়ে আগলে রাখতে পারে যে কেউ। ভক্তি আন্দোলনের সার্থকতা সেখানেই। যে মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলন বৃহত্তর ভারত রাষ্ট্র জুড়ে ব্যাপকতা লাভ করে, সেখানে, দেবালয়ে গিয়ে ঈশ্বরকে উপাসনার অধিকার কেবল সংস্কৃতজ্ঞ উচ্চবর্গের হিন্দু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ অনেকাংশে নিম্নবর্গ আর নারীজাতিরও ইতিহাস, ঈশ্বরের সাধনায় ব্রাহ্মণ পুরুষের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস, যার মাধ্যম কোনও অসহিষ্ণুতা অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে তলোয়ার চালানো ছিল না। ছিল কাব্য ও সঙ্গীত। ছিল পিতৃতান্ত্রিক দেবভাষা বর্জন করে, মাতৃতান্ত্রিক আঞ্চলিক ভাষায় প্রিয়ের আরাধনা। মীরাবাই ছাড়াও ভক্তির ইতিহাসে নারী কবি হিসেবে চর্চিত হয় আক্কা মহাদেবী, জানাবাই, লল্লাদেড়, মুক্তাবাইয়ের নাম। ছোট ছোট অঞ্চলে দল-উপদল তৈরি করে এই সব সাধক-সাধিকারা বাদ্যানুষঙ্গ নিয়ে গান গেয়ে বেড়াতেন। অপর পক্ষে অসহিষ্ণুতা দেখাত তারা, যারা এই সব সন্তদের স্বাধীন ও একাগ্র-যাপনকে প্রতিহত করতে চাইত। তথাকথিত উচ্চবর্ণের দুহিতা ও বধূ, ভক্তির আর এক সাধিকা বহিনবাই, নিম্নবর্ণের সাধক তুকারামকে গুরু হিসাবে গ্রহণ করায়, বহিনের বৈবাহিক সঙ্গী, স্ত্রী ও তার গুরু উভয়কেই হত্যা করতে উদ্যত হয়। তবে শুধু ব্যক্তিগত ক্রোধ নয়, গোষ্ঠীগত হিংসাও কী ভাবে বাংলার জাতক শ্রীচৈতন্যকে আক্রমণ করেছে বার বার, সে সম্পর্কে সকলে অবগত।

আই তী তে ভিস্তি জনী জগত দেখকে রোই।

মাতাপিতা ভাইবন্দ সাত নহী কোই।

মেরো মন রামনাম দুজা নহী কোই॥

সাধু সঙ্গ্ বৈঠে লোক লাজ খোই।

অব তো বাত ফৈল গই।

জানত হৈ সব কোই॥

জননীর গর্ভজল থেকে বেরিয়ে ধরিত্রীর বুকে এসে ক্রন্দন করেছিলাম। আজ মাতা, পিতা, ভাই, বন্ধু, কেউ পাশে নেই৷ আমার হৃদয়েও রামনাম ছাড়া আর কিছু নেই। লোকলজ্জা খুইয়ে সাধুদের সঙ্গে বসে থাকি। এ কথা এখন সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে, সকলেই সব জানে।

রাজস্থানের লোকভাষায় লেখা মীরার কবিতাগুলিকে পদ বা চরণ হিসাবে অভিহিত করা হয়। প্রথম কয়েকটি পঙ্‌ক্তি হল ‘টেক’, যা কবিতার সারবস্তুকে সংক্ষেপে উল্লেখ করে। পরের অংশ ‘অন্তরা’, যেখানে মূল ভাবের সম্প্রসারণ ঘটানো হয়। মীরার লেখাগুলি ছয় থেকে চব্বিশ পঙ্‌ক্তি অবধি বিস্তৃত। অধিকাংশ কবিতাই যে হেতু সঙ্গীতে রূপায়িত, তাই সেখানে রাগের প্রাধান্য সুস্পষ্ট। বহু গান রচিত পিলু রাগের ওপর, যা উচ্ছ্বাসের রাগ, একই সঙ্গে অস্থিরতারও। প্রিয়ের সঙ্গে মিলিত হওয়ার যে উচাটন, তা পিলুর শুদ্ধ ও কোমল গান্ধার এবং নিষাদে নিজেকে অনায়াস ব্যক্ত করে। এবং দেশ, সারং, ভৈরবী, ভীমপলশ্রী মিলিয়ে সত্তরের কাছাকাছি রাগে মীরার পদগুলি সুরারোপিত। বোঝা যায়, মীরার কাব্য ও সঙ্গীত দক্ষতা কতখানি সুদৃঢ় ছিল। মীরা যেমন ভাবে কৃষ্ণকে দেখেছে, তা-ই লিখেছে কথ্য ভাষায়। সেখানে অলঙ্কার প্রযুক্ত হয়েছে, কিন্তু তার অন্তর্বস্তু দুরূহ হয়ে ওঠেনি। ভক্তির প্রচলিত ভিন্ন ভিন্ন ভাবের মধ্যে মীরার লেখায় সখ্য ও আত্মনিবেদনের রূপ সুস্পষ্ট।

শ্রীনাভদাসের লেখা ‘ভক্তমাল’ গ্রন্থে মীরার প্রাথমিক বিবরণ পাওয়া যায় ১৫৮৫ সালে। শিখদের পবিত্র গ্রন্থ ‘প্রেম অমবোধ পথি’-তেও (১৬৯৩) ১৬ জন বিশিষ্ট সন্তের মধ্যে মীরার নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করে হয়েছিল। মীরাবাইয়ের জীবনকথা নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত। তবে গবেষণা-স্বীকৃত মতানুসারে মীরার জন্ম ১৪৯৮-এ, রাজস্থানের মেরতা জেলায়। মীরার পিতামহ রাও দুদাজি তার জ্যেষ্ঠপুত্র ও মীরার পিতা রতন সিংহ-কে মেরতার দায়ভার তুলে দেন। অতি অল্পবয়সে মীরা মাতৃহারা হয়। সে বড় হয়ে উঠতে থাকে পিতামহ-পিতামহীর কাছে। দুদাজি এক জন বলশালী রাজা ছাড়াও ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। রাজকুমারীকে শৈশব থেকে বিদ্যাশিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি, বিবাহের জন্য উপযুক্ত করে তোলার উদ্দেশে নান্দনিক পাঠও দেওয়া হয়েছিল। কৈশোর বয়স থেকে মীরার মধ্যে সৃষ্টিশীল চেতনা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। কৃষ্ণের মূর্তি নিয়ে খেলতে খেলতে মীরার মধ্যে কল্পনা বিকশিত হতে শুরু করে, যা কবি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় এক আবশ্যিক ধাপ। ক্রমশ মীরার অবিচ্ছেদ্য সংযোগ গড়ে ওঠে কৃষ্ণের পুতুলটির সঙ্গে। মীরা নিজেকে কৃষ্ণের সঙ্গিনী বলে ভাবতে শুরু করে। ১৫১৬-তে মীরার বিবাহ সম্পন্ন হয় রাম সঙ্গ-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র, মেওয়ারের রাজা ভোজের সঙ্গে। ১৫২১-এ যুদ্ধে ভোজরাজের মৃত্যু ঘটে। এর পর ভোজরাজের পিতারও মৃত্যু হলে, মেওয়ারের ক্ষমতায় বসে ভোজরাজের ভাই রানা রতন সিংহ। মীরার বিরুদ্ধে রানা তীব্র বিরোধিতা করলে, ক্ষোভে ও বিতৃষ্ণায় মীরা তার ফেলে আসা নগর মেরতায় ফিরে যায়। কিন্তু বিধি বাধ সাধে সেখানেও। ইতিমধ্যে পিতার মৃত্যু ঘটেছে। কাকা বিরামদেও মীরার ধর্মাচরণের প্রতি ক্রমাগত অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে। মেওয়ার ও মেরতা ছেড়ে মীরা প্রথমে বৃন্দাবনে ঠাঁই নেয়৷ তার পর চলে যায় দ্বারকায়। ১৫৪৭-এ দ্বারকাতেই মীরাবাইয়ের মৃত্যু হয়।

এক জন রাজপুত কূলবধু সাংসারিক দায়িত্ব পালন না করে কবিতায়, গানে, আরাধনায় নিজের জীবন অতিবাহিত করতে চাইছে, অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে সঙ্গ করছে অজ্ঞাতকুলশীল নারী-পুরুষের, যারা তারই মতো কৃষ্ণপ্রেমে মগ্ন, ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরিখে এ এক বৈপ্লবিক ভাষ্য ছাড়া আর কী! সামাজিক বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে মীরা-সহ ভক্তিকাব্যের অন্যান্য নারী, সংসারের মধ্যে থেকে অথবা সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, নিজেদের পছন্দের, স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন বেছে নিয়েছে। দক্ষিণের আক্কা মহাদেবী ঘর সংসার তো বটেই, নিজের বসনখানি খুলে পথে পথে ভক্তিগান গেয়ে বেড়িয়েছে। মীরা যখন কাব্য রচনা করছে, ষোড়শ শতকের ভারত তখন রাজনৈতিক ভাবে টালমাটাল। রাজপুতদের পরাজিত করে ধীরে ধীরে মুসলিম শাসন ঢুকে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এহেন পরিস্থিতিতে রাজবংশগুলি এক দিকে হিংসার আশ্রয় নিচ্ছে, অন্য দিকে আর এক দল মানুষ ডুবে যাচ্ছে ভক্তির অতলান্ত সমুদ্রে। কট্টর দক্ষিণপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মুসলিম অনুপ্রবেশ আটকাতে ভক্তি আন্দোলনের সন্তরা হিন্দুধর্ম চর্চায় অধিক আগ্রহী হয়েছিল। কিন্তু এ কথা সত্যের অপলাপ। মধ্যযুগীয় ভারতের বহু আগে, ষষ্ঠ শতাব্দীতেও শৈব ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায় একাধিক গ্রন্থে। ভক্তির এই ছত্রছায়ায়, প্রকৃত ভক্তদের সান্নিধ্যে শ্রেণি, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বেশেষে জায়গা করে নিয়েছিল সমস্ত প্রান্তিক মানুষ।

অধুনা স্বঘোষিত ভক্তকুল আরও এক বার ভক্তি আন্দোলন হবে বলে দাবি করে গেছে অসমে, বাংলায়। অথচ ভক্তিরসে আদতে যে কোথাও অসহিষ্ণুতা নেই, জোলা কবীরের গায়ে স্বামী রামানন্দের পা লাগলে একে অন্যকে বেছে নিতে পারে গুরু আর শিষ্য হিসেবে, সেই সন্ত কবীরই আবার দোঁহা রচনার মধ্যে দিয়ে সর্বময়ের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করতে পারে— ভক্তির, ভক্তের এ হেন ঔদার্য প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতকে অনেকখানি আধুনিকতর প্রতিপন্ন করে, অন্তত একুশ শতকের ভারতের সাপেক্ষে। ভক্তিবাদ-সুফিবাদের মধ্যেকার মুক্তচিন্তাকে ভারতের সংস্কৃতি শতাব্দীকালব্যাপী ধারণ ও লালন করতে চেয়েছে। প্রতিহতও হয়েছে, বলা বাহুল্য। এখনও হচ্ছে, কেবল তার ধরনটুকু বহিরঙ্গে ভিন্ন।



Tags:

Advertisement