ভারতীয় খেলাধুলার দুনিয়ায় তিরাশির ২৫ জুনের উচ্ছ্বাস, আনন্দ বোঝার মতো বয়স ছিল না। বিশ্বকাপ জেতার আবেগ বিস্ফোরণ ও উন্মাদনা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে তা বুঝেছিলাম ২০১১ সালে ভারত বিশ্বকাপ জেতার পরে। এ বার ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার উন্মাদনাও কতটা উপভোগ্য হতে পারে তা দেখলাম। ফরাসি দূতাবাস ও আলিয়াজ় ফ্রঁসার আমন্ত্রণে ফাইনাল ম্যাচ দেখতে গিয়ে নিজেও হারিয়ে গেলাম ফরাসি উৎসবে।

 ম্যাচের সময় তখন ৬৭ মিনিট। বিশ্বকাপ ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্স তখন ৪-১ এগিয়ে। সদ্য ৬৫ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপের দুরপাল্লার শটে ব্যবধান বাড়িয়েছে ফ্রান্স। তবুও তাঁদের সমর্থকদের চোখে, মুখে যেন আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। হয়তো ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল ও ২০১৬ ইউরো কাপ ফাইনালে হারের দুঃস্বপ্ন তখনও ভুলতে পারেননি তাঁরা কেউই। এ রকমই দৃশ্য চোখে পড়ল হোটেলের গ্যালাক্সি হলে। প্রায় একশো জনের মতো ফ্রান্স সমর্থক ফাইনাল উপভোগ করতে এসেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই ফরাসি। বাঙালিরাও ছিলেন, কিন্তু ফরাসি দূতাবাস ও আলিয়াজ় ফ্রঁসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁরাও সাবলীল ভাবে ফরাসি ভাষায় কথা বলছিলেন।

ম্যাচের ৬৯ মিনিটে উগো লরিসের ভুলে যখন দ্বিতীয় গোল করে ফেলল ক্রোয়েশিয়া। ফরাসি সমর্থকদের আতঙ্ক যেন আরও বেড়ে উঠল। বাঙালিরা ঠিক যে রকম ভাবে ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান ম্যাচে নিজেদের জায়গা ছেড়ে ওঠেন না। একই কুসংস্কার ধরা পড়ল ফরাসি সমর্থকদের হাবে ভাবে। রাশিয়ার লুঝনিকি স্টেডিয়ামে জ়িনেদিন জ়িদানদের উত্তরসূরিরা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের যত কাছাকাছি চলে আসছেন, কলকাতায় ফরাসি সমর্থকদের রক্তচাপ যেন
ততই বাড়ছে।

ঠিক তখনই দূতাবাসের কনসাল জেনারেল দামিয়েঁ সৈয়দ এগিয়ে এসে গাইতে শুরু করলেন, ‘‘আলে লে ব্লু, আলে লে ব্লু।’’ যার অর্থ ‘এগিয়ে চল ফ্রান্স’ (ফরাসি ফুটবল দলকে ‘লে ব্লু’ নামেই ডাকতে পছন্দ করেন তাঁদের সমর্থকেরা)। সেই সুরেই সুর মেলালেন উপস্থিত সমর্থক। আসর মাতিয়ে দিলেন বছর পঁচিশের তরুণী ফ্লোরা ব্লাঁও। সতীর্থদের চাপ কমানোর জন্য প্রত্যেকের হাতে বিয়ারের বোতল তুলে দিয়ে গাইতে শুরু করলেন, ‘‘কুই নে সৌত পা নে’স পা ফ্রঁসা’, যার অর্থ, ‘‘যে লাফিয়ে উৎসব করে না, সে কখনও ফরাসি সমর্থক হতে পারে না।’’ এ ভাবেই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জয়োৎসব করতে থাকেন কলকাতার ফরাসিরা।

লুঝনিকি স্টেডিয়ামে রেফারি শেষ বাঁশি বাজিয়ে যখন নির্দেশ দিলেন, এ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল দূতাবাসের কনসাল জেনারেলের। দামিয়েঁ বললেন, ‘‘প্রথম বার যখন ফ্রান্স বিশ্বকাপ জেতে, আমি তখন কিশোর। আনন্দ উপভোগ করলেও চাপটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এ বার সেই অনুভূতিটা কলকাতায় বসে বুঝতে হল। সেই সঙ্গেই এই শহরের প্রতি টান আমার আরও বেড়ে গেল।’’

উপস্থিত ছিলেন ফরাসি দূতাবাসের ডেপুটি কনসাল জেনারেল অলিভিয়ে কাসাঁও। তাঁর কথায়, ‘‘এই দিনটার জন্যই তো বেঁচে থাকা। ১৪ জুলাই ফরাসি রাজতন্ত্রের পতনের উৎসব পালন করা হয় প্যারিসের বাস্তিল গেটের সামনে। এ বার থেকে ১৫ জুলাইও উৎসবের দিন হয়ে উঠল ফরাসিদের কাছে।’’

দূতাবাসের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে কলকাতার বেশ কয়েকটি ক্লাবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মেজাজ উপভোগ করতে বেরিয়েছিলাম। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়ার পরে বিশ্বকাপের ফাইনাল বাঙালিরা কি আদৌ উপভোগ করছেন? আমাকে ভুল প্রমাণিত করল টালিগঞ্জের কিশোর স্পোর্টিং ক্লাব। ক্লাবের সাধারণ সচিব মনোজ কর ফরাসি পতাকা দিয়ে সাজিয়ে তুলেছিলেন প্রাঙ্গণকে। মনে হচ্ছিল আরও একটি ফরাসি উপনিবেশ তৈরি হয়েছে টালিগঞ্জ এলাকায়।

তবে এ বারের বিশ্বকাপ ফাইনালে আমি চেয়েছিলাম ক্রোয়েশিয়াই জিতুক। ঠিক যেমন চেয়েছিল গড়িয়ার মিতালি সংঘ। বুঝতে পারলাম ক্রোয়েশিয়ার সমর্থক আমি একা নই। গড়িয়ার ক্লাবটিও লুকা মদ্রিচদেরই সমর্থন করছে। ক্লাবের সাধারণ সচিব মহাদেব চক্রবর্তীর আয়োজনে জায়ান্ট স্ক্রিন লাগিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে সমর্থন করছিল সেই পাড়া। করবে নাই বা কেন, জেতার মতোই খেলতে শুরু করেছিলেন ইভান পেরিসিচরা। একটা মুহূর্ত ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। নিজেদের বক্সে ইভান পেরিসিচের হ্যান্ডবল। যার সুযোগ নষ্ট করেননি গ্রিজ়ম্যানরা। সেই সুবাদেই মহিনের ঘোড়াগুলির ‘‘আবার বছর কুড়ি পরে’’ অ্যালবামের কথা মনে করিয়ে দিল ফ্রান্স।