ঘরানায় তাঁরা রাবীন্দ্রিক নন একেবারেই, বরং তুমুল কর্পোরেট। যে কাজ এখন করছেন, তার সঙ্গে নারায়ণ দেবনাথের কাজের কিছুটা মিল হয়তো পাওয়া যেতে পারে।কিন্তু ‘আমার গর্ব মমতা’র কারিগররা অনুপ্রেরণা আপাতত নিচ্ছেন রবীন্দ্রকাব্য থেকেই।
'সহজ কথা যায় না বলা সহজে'— খুব উপলব্ধি করেছে টিম প্রশান্ত কিশোর (টিম পিকে)। লোকসভা নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে তাঁদের উপর দায়িত্ব বর্তেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তির চাকচিক্য ফিরিয়ে আনার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, কাজ বেশ কঠিন। কিন্তু ক্রমশ নজর কাড়তে থাকা একটা ফেসবুক পেজের নেপথ্য কুশীলবরা বলছেন— তৃণমূলের যে কোনও বার্তাকে খুব সহজ ভাবে তুলে ধরাই তাঁদের লক্ষ্য এই মুহূর্তে। কারণ তাঁরা মনে করছেন, জরুরি কথাগুলো সহজ করে বলা যায় না বলেই সমস্যা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে এবং সহজ করে বলতে পারলেই কেল্লা ফতে।

ফেবসুক এবং টুইটারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক বছর ধরেই বেশ সক্রিয়। সোশ্যাল মিডিয়াকে খুব সুচারু ভাবে কাজে লাগানোর নিরিখে যে রাজনীতিকরা এ দেশে প্রথম সারিতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম। কিন্তু ‘টিম প্রশান্ত কিশোর’ (টিম পিকে) তৃণমূলের সহযোগী হয়ে ওঠার পর থেকে দলের এবং নেতৃত্বের ভাবমূর্তির ‘মেক ওভার’-এর প্রক্রিয়া যে ভাবে শুরু হয়েছে, তার ছাপ সোশ্যাল মিডিয়াতেও স্পষ্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বা হ্যান্ডলগুলো যেমন চলছিল, তেমনই চলছে। কিন্তু সেগুলোর পাশাপাশিই দ্রুত মাথা তুলছে আর একটা ফেসবুক পেজ— ‘আমার গর্ব মমতা’।

তৃণমূলের আইটি সেল কিন্তু এই ফেসবুক পেজ চালাচ্ছে না। চালাচ্ছে টিম পিকে। কী কাজ এই ফেসবুক পেজের? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানা বার্তা ও পদক্ষেপের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া, ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির সাফল্য প্রচার করা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিভিন্ন ‘সাফল্যের’ আখ্যান নিত্য নতুন কার্টুনের মাধ্যমে নিয়মিত তুলে ধরা। মাঝে-মধ্যে আবার ওই কার্টুনের মাধ্যমেই বৃহত্তর কোনও রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। সে রকম বেশ কয়েকটি কার্টুন ইতিমধ্যেই বেশ চোখ টেনেছে সোশ্যাল মিডিয়ার। রাজনৈতিক পরিসরে চর্চাও হয়েছে জোরদার।

আরও পড়ুন: দেশে আর গণতন্ত্র নেই, চিদম্বরমের গ্রেফতারির নিন্দা করে বললেন মমতা

কলকাতার বেশ কিছু বিগ বাজেট দুর্গাপুজো কমিটির কাছে আয়-ব্যয়ের হিসেব চেয়েছে আয়কর বিভাগ। তা নিয়ে বিজেপি-তৃণমূল তথা কেন্দ্র-রাজ্য সঙ্ঘাত বেশ স্পষ্ট। খোদ মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, এ রাজ্যের সবচেয়ে বড় উৎসব তথা এ রাজ্যের সংস্কৃতির উপরে আঘাত হানতে চায় বিজেপি, তাই দুর্গাপুজোর উপরে কর বসানো হচ্ছে। কেন্দ্রও চুপচাপ বসে থাকেনি। অর্থ মন্ত্রকের তরফ থেকে বিবৃতি প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, পুজোর উপরে কোনও কর বসানো হয়নি, সবই অপপ্রচার, টিডিএস সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে মাত্র।

বিতর্ক যে মোড়ে গিয়েই শেষ হোক, তৃণমূলের বক্তব্যকে কার্টুনের মাধ্যমে প্রকাশ করে অন্য মাত্রা দিয়ে দিয়েছে ফেসবুক পেজ ‘আমার গর্ব মমতা’। সে কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, মর্ত্যে আসার আগে মা দুর্গাকে আয়কর দফতরে হাজির হতে হয়েছে। সেখান দশভুজাকে আয়কর কর্তা জিজ্ঞাসা করছেন, ‘‘শেষ কবে আইটি রিটার্ন ফাইল করেছেন?’’ দশভুজা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

‘আমার গর্ব মমতা’ ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে এই কার্টুন।

চর্চায় এসেছে প্রয়াত বিজেপি নেতা তথা দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ককে চিত্রিত করে তোলা এক কার্টুনও। অটল তখন প্রধানমন্ত্রী। মমতা তখন বিজেপির শরিক এবং অটলবিহারী-ক্যাবিনেটের রেলমন্ত্রী। কলকাতা সফরে এসে মমতার বাড়িতে গিয়েছিলেন অটল। সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কার্টুনটি পোস্ট করা হয় চলতি মাসের ১৬ তারিখে, অর্থাৎ অটলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে। মমতার ‘আধপাকা’ বাড়ির মেঝেতে বসে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। সামনে বসে রয়েছেন মমতাও। আর মমতার মা গায়ত্রীদেবী মালপোয়া দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর হাতে।

‘আমার গর্ব মমতা’ ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে এই কার্টুন।

মৃত্যুবার্ষিকীতে অটলের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই ওই কার্টুনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ঠিকই, কিন্তু অনুচ্চারিত ভঙ্গিতে এখনকার এনডিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তখনকার এনডিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পার্থক্যও যে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, তা-ও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

আরও পড়ুন: বৈশাখীকে কলেজ থেকে ছেঁটে ফেলার তোড়জোড় শুরু?

 

সবুজসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, খাদ্যসাথী, স্বাস্থ্যসাথী-সহ যে সব সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালাচ্ছে সরকার, সে সবের প্রচারও কার্টুনের মাধ্যমে হচ্ছে। খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে বা বুঝতে হবে, এমন কোনও কার্টুন নয়। ২০১১-র আগে বাংলার মানুষ কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তেন, ২০১১-র পর থেকে কী ভাবে সে সব সমস্যার সমাধান হয়েছে— পাশাপাশি রাখা দুটো ছবি আর খুব ছোট ছোট সংলাপের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পগুলোর সুফল তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে।

‘আমার গর্ব মমতা’ ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে এই কার্টুন।

কেমন সাড়া মিলছে এই নয়া ধাঁচের প্রচারে? তৃণমূল নেতাদের অনেকেই বেশ উচ্ছ্বসিত। এক রাজ্যসভা সদস্যের কথায়, ‘‘একদম নতুন ধরনের স্ট্র্যাটেজি এই কার্টুন-প্রচারটা। আমাদের আইটি সেল বরাবরই জোরদার কাজ করেছে। কিন্তু ‘আমার গর্ব মমতা’য় যে কার্টুনগুলো শেয়ার হচ্ছে, সেগুলো খুব নজরকাড়া। খুব সহজে মন ছুঁয়ে যায়।’’

টিম পিকে-র সদস্যরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা কিছুটা এড়িয়েই চলছেন। তবে এই নতুন ফেসবুক পেজটিকে নিয়ে আগ্রহ যে ভাবে বেড়েছে, তাতে টিম পিকে-ও আশান্বিত বলেই তৃণমূল সূত্রের খবর।

কিন্তু নতুন ফেসবুক পেজের প্রতি আগ্রহের জন্ম দিয়ে কি ভোট সমীকরণে খুব বেশি বদল আনা যাবে? টিম পিকে মনে করছে, প্রত্যক্ষ ভাবে বদল আনা না গেলেও পরোক্ষ ভাবে তা সম্ভব। তৃণমূলের বার্তা এবং সরকারের ‘সাফল্য’ তুলে ধরার পাশাপাশি বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণও করা হচ্ছে এই ফেসবুক পেজ থেকে। কিন্তু সে আক্রমণের ধর‌নটা আলাদা। চড়া কণ্ঠস্বর নয়, কটাক্ষের সুর থাকছে সেখানে। উত্তাপ কম রেখে খোঁচাটা তীক্ষ্ণ ভাবে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

‘আমার গর্ব মমতা’ ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে এই কার্টুন।

এই নীতি কিছুটা ফল দিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। লোকসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত বিজেপি বিরোধী সুর ক্রমশ তুঙ্গে তুলছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শাসক-বিরোধীর টানাপড়েনে রাজনৈতিক উত্তাপ আকাশ ছুঁয়ে ফেলছিল। তৃণমূলের এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলিতেও তারই হুবহু প্রতিফলন ঘটছিল। তাতে যে তৃণমূলের সমূহ ক্ষতি হয়েছে, লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলেই সেটা স্পষ্ট। তাই উত্তাপ ক্রমশ কমানোর নীতি নিয়েছে টিম পিকে। মোদী সরকারের সমালোচনা এবং বিজেপি-কে কটাক্ষ করা বহাল থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক উত্তাপটা কমিয়ে রাখতে হবে— এই কৌশলেই দলনেত্রীর এবং দলের ভাবমূর্তি পালিশ করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া পেজেও সেই কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

সাড়া কেমন? টিম পিকে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও মন্তব্য করতে নারাজ। কিন্তু এই নতুন ধারার সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজির কারিগররা বলছেন, খুব গুরুতর বিষয়কেও সোশ্যাল মিডিয়া পেজটার মাধ্যমে খুব সহজে বুঝিয়ে দেওয়াটাই আসল লক্ষ্য এবং কার্টুনগুলো সে লক্ষ্যে ১০০ শতাংশ সফল।