ছায়া দেখলেও ভয় পাচ্ছে হরিহরপাড়া
লালনগরের এক বৃদ্ধ বলছেন, ‘‘এক সময় ভয় দেখানোর জন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হত সাদা থান কিংবা রজনীগন্ধার মালা। এখন দিন বদলেছে। ভয় দেখানোর কায়দাও বদলে গিয়েছে।
vote

প্রতীকী চিত্র।

‘আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি মাস্টারমশাই’!

‘আতঙ্ক’ সিনেমার এই বিখ্যাত সংলাপেরও বয়স বেড়েছে ঢের। সিনেমা পরিচালক তপন সিংহ মারা গিয়েছেন। নবাবের জেলায় ভাণ্ডারদহ বিল দিয়ে বহু জলও গড়িয়েছে। বদলে গিয়েছে এলাকার হাল-হকিকত, রাজনীতির মানচিত্র! কিন্তু হরিহরপাড়ার লালনগরে ভোট-মরসুমের আতঙ্ক এখনও পিছু ছাড়েনি। 

বহরমপুর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে এই প্রান্তিক জনপদের বহু বাসিন্দা পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এ বারেও ভোট দিতে পারবেন কি না তা নিয়েও সংশয়ে আছেন তাঁরা! অভিযোগ, প্রশাসনের কর্তারা এসে ভোটারদের অভয় দিচ্ছেন। গ্রামে চলছে আধাসেনার টহল। অথচ আতঙ্কও পিছু ছাড়ছে না।

কিসের আতঙ্ক?

লালনগরের এক বৃদ্ধ বলছেন, ‘‘এক সময় ভয় দেখানোর জন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হত সাদা থান কিংবা রজনীগন্ধার মালা। এখন দিন বদলেছে। ভয় দেখানোর কায়দাও বদলে গিয়েছে। কিন্তু ভয়টা তো ভয়ই। প্রশাসনের লোকজন বলছে, কেউ ভয় দেখালে ‘১৯৫০’ নম্বরে ফোন করুন। আর ওরা এসে শাসাচ্ছে, ‘ভোটের পরে ওই নম্বর তোকে বাঁচাবে তো?’ এমন অবস্থায় কী করি, বলুন তো?’’

গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ভাণ্ডারদহ। এক দিকে লালনগর, অন্য প্রান্তে বহরমপুর। বৈশাখের রোদে তেতে উঠেছে মোড়ামের রাস্তা। গ্রামের বেশিরভাগ দেওয়ালের দখল নিয়েছে তৃণমূল। ফ্লেক্স ও দলীয় পতাকাতেও মাথা দোলাচ্ছে ঘাসফুল। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এমনকি বিধায়কও তৃণমূলের। 

এর আগে প্রায় প্রতি ভোটেই গুলি, বোমা, আগ্নেয়াস্ত্রের আস্ফালন দেখেছে হরিহরপাড়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাল্টা পুলিশকেও গুলির ব্যবহার করতে হয়েছে। কিন্তু হরিহরপাড়া আছে হরিহরপাড়াতেই! 

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, বহরমপুর থেকে এই গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন ভাল নয়। তাই সন্ত্রাস আছড়ে পরার অনেক পরে পুলিশ-প্রশাসন পৌঁছয়। হরিহরপাড়া, লালনগর ভোট দেবে ২৩ এপ্রিল। নির্বাচন কমিশনের তরফে এই গ্রামে অভয় দিয়ে লিফলেটও ছড়ানো হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বাংলায় বলা হয়েছে, ‘ভীতি প্রদর্শনের কোনও ঘটনা যদি আপনার নজরে আসে তবে তৎক্ষণাৎ জেলার অভিযোগ গ্রহণকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা টোল ফ্রি ১৯৫০ নম্বরে ফোন করতে পারেন।’ 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

লালনগর গ্রামের বৃদ্ধ রমজান শেখ বলছেন, ‘‘লিফলেটে তো কত কথাই লেখা আছে। কিন্তু ওরা যে বাড়িতে এসে শাসিয়ে যাচ্ছে। বলছে, ‘ভোট চলে গেলেই ১৯৫০ নম্বর থাকবে না। আমরা থাকব। তখন কী হবে।’ আমরাও ভাবছি, সত্যিই তো, তখন কী হবে!’’ 

ভয় কাটছে না ফতেমা বেওয়ারও। তাঁর কথায়, ‘‘স্বামী মারা গিয়েছে। সে থাকলেও ভরসা পেতাম। ওদের এই হুমকি, শাসানি নিয়ে কি ভাল থাকা যায়? এখন নিজের ছায়াকে দেখলেও ভয় লাগছে।’’

ওরা কারা?

হরিহরপাড়া ব্লক কংগ্রেসের সভাপতি মির আলমগীর বলছেন, ‘‘কারা আবার, তৃণমূল! তারাই তো বাড়ি বয়ে গিয়ে দিনরাত হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। অভয় দেওয়ার জন্য প্রশাসন টোল ফ্রি নম্বর ১৯৫০-এর কথা বলছে। আর ওরাই সেই নম্বর নিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। এই অবস্থায় ভোট কতটা নিরপেক্ষ ভাবে হবে তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’’

হুমায়পুরের তৃণমূলের পর্যবেক্ষক সফিউল হাসানের দাবি, ‘‘গ্রামে আতঙ্ক নেই। কংগ্রেসের কোনও লোক নেই। তাই তারা এ সব রটিয়ে বেড়াচ্ছে।’’

হরিহরপাড়ার বিডিও পূর্ণেন্দু সান্যাল বলছেন, ‘‘প্রশাসনের তরফে সব সময় ওই গ্রামে নজর রাখা হচ্ছে। শুধু ভোটের দিন নয়, ১৯৫০ নম্বরে অভিযোগ জানানো যাবে ২৩ মে পর্যন্ত। তার পরেও পুলিশ-প্রশাসন থাকবে। ভয় কিসের!’’

কিন্তু সেই অভয়েও ভয় কাটছে না হরিহরপাড়ার।

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত