যত্নে নজর? জবাব খুঁজছে লালমাটি
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসায় গমগম করতে থাকা পুরুলিয়া শহর থেকে আট-দশ কিলোমিটারের মধ্যেই এ ভাবেই লড়াই করছে আদিবাসী গ্রাম। কোথাও কম হলেও বেশির ভাগ অংশেই সেই লড়াই কঠিন। কোথাও কোথাও খুব কঠিন।
Dipak

আড়শার ধাদাকিড়ি গ্রামে সাইকেল সারাচ্ছেন দীপক বাস্কে। ছবি: সুজিত মাহাতো

দুই সন্তানের জন্য রান্না করেন রজবালা মাহাত। এক বেলা বাড়িতে। আর এক বেলা স্কুলে, মিড-ডে মিলে। সরকারের মিড-ডে মিল আর স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে মহিলাদের স্বাবলম্বী করার দুই প্রকল্পে এ ভাবেই জুড়ে গিয়েছে একটি আদিবাসী পরিবার।

এই বন্ধনীতে কেন এলেন না দীপক বাস্কে? আড়শার স্কুলে রজবালা যে সরকারকে পাশে পেয়েছেন, ধাদাকিড়ির দীপক তা পাননি। বছর কুড়ির দীপক বাড়ির সামনে সাইকেল আর ভ্যান মেরামত করে দিনে গড়ে ৫০ টাকার কমই রোজগার করেন। সংসারে এই তাঁর অবদান। দীপকের ছোট দোকানের কোল ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়া ভেড়ার দলকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিলেন সম্পর্কিত দাদা। চড়া রোদের ক্লান্তি তাঁর চোখমুখে স্পষ্ট। হাতে লম্বা পর্দার অ্যান্ড্রয়েড ফোন আছে। কিন্তু সে-ভাবে কোনও কাজ নেই।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসায় গমগম করতে থাকা পুরুলিয়া শহর থেকে আট-দশ কিলোমিটারের মধ্যেই এ ভাবেই লড়াই করছে আদিবাসী গ্রাম। কোথাও কম হলেও বেশির ভাগ অংশেই সেই লড়াই কঠিন। কোথাও কোথাও খুব কঠিন। মোরামের সরু রাস্তায় হঠাৎ মুরগির লাফালাফিতে উড়তে থাকা ধুলো থিতিয়ে গেলে বসতে বললেন দীপক। সরকারি আধিকারিক ভেবে নিজে জায়গা ছেড়ে দীপকের দাদা পরিষ্কার করে দিলেন সিমেন্টে বাঁধানো বেঞ্চ। এই পাড়ার ভিতরে তাঁর খদ্দের হয়? ফুটো টিউবে আঠা লাগাতে লাগাতে দীপক যে-ভাবে মাথা নাড়লেন, তাতে তাঁর আগের হিসেবও গুলিয়ে গেল। সরকারি ঋণের চেষ্টা করেছেন কখনও? চোখমুখের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হল, এ-সব তিনি শোনেননি। হাতের তালুতে হাওয়া ভরা টিউব ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘‘না। আমি ও-সব পাইনি।’’ 

বাইরের লোক দেখে উল্টো দিকের ঘর থেকে এলেন দীপকের ভাইয়ের বৌ। কোলে দুগ্ধপোষ্য সন্তান। তবে দেখে-শুনে দ্রুত ফিরে গেলেন তরুণী মা। দু’ টাকার চাল? দাদা বললেন, ‘‘ওর তো কোনওটা ভাল, কোনওটা খারাপ।’’ এখানেই মস্ত ফাঁক। শুধু চাল নয়, সব কিছুতেই বারো মাস নজর রাখে কে? কাগজকলমে তার উত্তর থাকলেও লালমাটিতে নেই। ব্লক, জেলা বা কলকাতা— এই নজরদারির প্রয়োজন মানেন সবাই। 

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

দুপুরের আলস্য আর অজ্ঞতার পরিণতি কিন্তু এক দশকের মধ্যেই দেখেছেন এখানকার মানুষ। বাইরে থেকে ‘বন্ধু’ এসেছে। আদিবাসীদের প্রতি বঞ্চনা নিয়ে হয়েছে স্লোগান, মিছিল, মিটিং। আর সেই ‘বন্ধুত্বে’র প্রকাশ ঘিরেই অস্থিরতা তৈরি হয় দীপকদের গ্রামে। এখনও কংক্রিটের রাস্তার পাশের জমিতে পাকা তাল পড়ে থাকে। পড়ে থেকে থেকে তা পচে যায়। নজর করেন না কেউ। ওঁদের গ্রামেরও কি তেমনই নজর না-পড়া অবস্থা? দীপকরা কি ভাবেন তা? 

সিদো-কানহো বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের বিভাগীয় প্রধান সমর মাহাত আদিবাসীদের প্রাপ্তির কথা বললেন। বাঘমুন্ডির ছেলে সমরই পরিবারে প্রথম স্কুলে গিয়েছেন। ১৩ মাস বয়সে কৃষক বাবাকে হারিয়েছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সতর্ক এই তরুণ অধ্যাপক মনে করেন, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ‘পরিবর্তন’ হয়েছে। বললেন, ‘‘এই নজরটুকু না থাকলে কিন্তু কোনও প্রকল্পই কাজে লাগবে না। এগোবে না। সব অর্থহীন। আর তার একটা ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।’’

সরকার পাশে দাঁড়ালে যে একটা পরিবার এগোনোর শক্তি পায়, রজবালার দুই প্রজন্মের জীবনে তা স্পষ্ট। আড়শা ব্লকে তাঁদের এই বুঁজকা গ্রামে ১৯৫৬ সালে তৈরি স্কুলে সে ভাবে যাওয়ার সুযোগ পাননি চল্লিশের কাছাকাছি রজবালা। নিজের দুই সন্তান কোন ক্লাসে পড়ে তা না জানলেও তাঁদের স্কুলে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে তাঁর মুখ উজ্জ্বল। আর স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হিসাবে মাস গেলে হাতে পাওয়া সামান্য অর্থেও তিনি আত্মবিশ্বাসী। স্কুলের সঙ্গে তাঁর নাড়ি এখন এই জোড়া সুতোয় বাঁধা। স্কুলের রান্নাঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রজবালার মধ্যেই হয়তো নিজেকেই দেখছিলেন জবা মাহাত। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর আর এক সদস্য তরুণী বধূটি। 

স্কুলের বাইরে ফুচকা বিক্রি করেন পরাণ রেওয়ানি। এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু ছেড়েছেন মাধ্যমিকের আগে। এখন তাঁর তিন সন্তানই স্কুলের ছাত্র। 

দালানের দিকে তাকিয়ে আস্থা, কৃতজ্ঞতায় চোখ নামিয়ে নিলেন পরাণ। বললেন, ‘‘বড় ছেলেটা সেভেন। আর ছোট দু’টো যমজকে পাশের প্রাইমারিতে ভর্তি করেছি।’’ বিরাট স্কুলবাড়ির ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বাচ্চাদের উচ্ছ্বাস। আদিবাসী পরিবারের আগামী প্রজন্ম। 

সবুজসাথী, কন্যাশ্রী প্রকল্প ‘ড্রপ আউট’ সমস্যা কিছুটা কম করতে পারলেও হাতে পাওয়া টাকার কি সদ্ব্যবহার হচ্ছে? দেখার কে আছে? পড়া শেষে ছেলেমেয়েদের কাজের কী হবে? স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাজেশ মাহাতর চিন্তাও তাই। বললেন, ‘‘এখন প্রায় দু’হাজার ছাত্রছাত্রী আছে। ‘ড্রপ আউট’ কমেছে। তবে এই ধারাটা বজায় রাখাটাই আমাদের কাজ।’’ সেই নজরদারিই চান। কিন্তু তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনও মানেন তিনি। বাঘমুন্ডির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিবশঙ্কর মাহাত সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান স্কুলেই। শিক্ষকতা করেছেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘শিক্ষাই এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। মানুষকে নিশ্চিত জীবনের রাস্তা দেখাতে পারে।’’

আগামী প্রজন্মকে শক্ত পা আর পায়ের তলায় শক্ত জমি দিতে চান শীতলা মাহাত-ও। ২১ বছরের তরুণী প্রথম মা হবেন। ডাক্তার দিন দিয়েছেন সেপ্টেম্বরে। ২৩ বছরের নিয়তি সর্দারও ভাবেন, সন্তানকে দেবেন শক্ত জমি। পারবেন তো? আশা তো করেন। তাই ভিড়ও করেন পাঁড়রামা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ভগ্নপ্রায় টালির ঘরে সাপ্তাহিক পরিচর্যা মা আর তাঁর শিশুর। টিকা নিতে আসেন যাঁরা সদ্য মা হয়েছেন, তাঁরাও। নিয়ে যান আয়রন ট্যাবলেট। হাজার পাঁচেক মানুষের ভরসা এই কেন্দ্রে বহুদিন ধরে একটা শৌচাগার চান দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী নন্দিতা সরকার। মায়েদের প্রয়োজনেই।

পুরুলিয়া-জামশেদপুর হাইওয়ের ধারে এই কেন্দ্রে যে পথ পেরিয়ে আসতে হয় মায়েদের, তা কম নয়। পিচের রাস্তা ধরে খালি পায়েও, তবু আসেন মা। অতিসাবধানে রাস্তা পেরোন। হাতে শোয়ানো সদ্যোজাতকে আঁচলে ঢেকে নিজের মাথায় নিয়ে নেন ভরা চৈত্রের সূর্য।  

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত