গল্পের এক চরিত্রই লিখছে গল্পের অন্য চরিত্রকে। নতুন নয়। মহাভারত থেকে হয়ে আসছে। চলচ্চিত্রের পরিসরে সচেতন ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে নাটকের নানা মুদ্রা। সে-ও হয়ে গিয়েছে আগেই। এক সেটে আবদ্ধ ছবি, মাঝেমধ্যেই গ্রাফিক, ম্যানিকুইন, অস্থিরতার কোরিয়োগ্রাফ, সোশ্যাল কমেন্টারি... চমক লাগলেও আনকোরা নয়।

যেটা সত্যি করে নতুন হতে পারত, তা হল একটা স্বচ্ছ চিন্তা। ‘মুখোমুখি’তে বহু কিছু করলেন পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, শুধু চিন্তাটুকু ছাড়া। বস্তাপচা মধ্যবিত্ত কারুবাসনা আর আলগোছে ভাসানো ভুবনডাঙার জীবনবীক্ষার মধ্যে পাক্কা দু’ঘণ্টা পাক খেয়ে মরল ছবি। 

গল্পের নিয়ন্তা এক দম্পতি (গার্গী রায়চৌধুরী ও রজতাভ দত্ত), যারা কল্পনা করছে শৌনক (যিশু সেনগুপ্ত/ সাহেব ভট্টাচার্য) ও অনসূয়া (পায়েল সরকার/ দর্শনা বণিক) নামে দুই তরুণ-তরুণীকে যারা একে অন্যের প্রতি অনুরক্ত, পরে বিবাহিত ও তার পরে বিচ্ছিন্ন। বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করা শৌনক চায় গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা, অনসূয়া তৈরি হচ্ছে আমলা হওয়ার জন্য। একটা জায়গার পরে দু’জনের চাওয়া-পাওয়া মিলছে না। 

 

মুখোমুখি
  পরিচালনা: 
কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
অভিনয়: রজতাভ, গার্গী, যিশু
৫/১০

গার্গী এই পর্যন্ত গল্পটা তৈরি করার পরে রজতাভ তাতে নিয়ে আসেন এক আগন্তুককে (অঞ্জন দত্ত), যে মহাবিশ্ব থেকে আসা এক ভবঘুরে। ভুবনডাঙা চষে যার অপার্থিব বৈরাগ্য এসেছে, অলৌকিক ক্ষমতা হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও। যে ক্রমাগত শৌনকের শিল্পীর শ্লাঘাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং দুনিয়া যে কত বড় ও বিচিত্র, আদিম জনজাতিও যে কী অসাধারণ শিল্পকাজ করে, তা মনে করিয়ে দিতে থাকে (যা দেখতে দেখতে সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ মনে পড়তে বাধ্য)। 

এমন নয় যে মূল ভাবনা খারাপ ছিল। কিন্তু তার প্রয়োগ বালখিল্য। সেটকে কী ভাবে আলো-আঁধারিতে বহুমাত্রিকতা দেওয়া যায় তা চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে একমেটে ঝকঝকে আলো বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, চরিত্রের নির্মাণে যে যুক্তির প্রতিষ্ঠা লাগে, তা প্রায় অনুপস্থিত। সবচেয়ে বড় উদাহরণ অনসূয়া। আমলা হওয়ার প্রস্তুতি যে নিচ্ছে, সে বইখাতার বদলে হয় ফর্দের খাতা নিয়ে ব্যস্ত বা স্বামীপ্রেমে গদগদ বা গার্হস্থ্য যৌনতায় উচ্ছল। তৃতীয়ত, দু’জোড়া শৌনক-অনসূয়ার কী প্রয়োজন ছিল তা বোধগম্য নয়। 

স্বাভাবিক ভাবেই, আলগা চিত্রনাট্য ও ছেঁদো সংলাপে ম্যাড়মেড়ে হয়ে গিয়েছে আয়োজন। কুশলী সম্পাদনা বা সঙ্গীত তার গতি করতে পারেনি। রজতাভ-গার্গীর কিছু মুহূর্ত অবশ্য মন ছুঁয়ে যায়, অভিনয়ের জোরেই।