পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এক বার বলেছিলেন, দু’ঘণ্টার ছবি হলে প্রতিটি মিনিট দর্শককে বিনোদন দিতে হবে। এক মিনিটও ফাঁকি দিলে চলবে না। বিনোদনের ঘাটতি তাঁদের কোনও ছবিতেই হয়নি। তবু বয়স-লিঙ্গ-প্রজন্ম ভেদে বিরুদ্ধ মতও সামনে এসেছে। ‘কণ্ঠ’ দিয়ে পরিচালক জুটি নিন্দুকদের চুপ করিয়ে দিলেন। একেবারে ‘স্পিচলেস’ করে ছাড়লেন!

কনটেন্ট, অভিনয় আর পরিবেশন— এই তিনের মেলবন্ধনেই জয়যাত্রা অব্যাহত শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের। ‘কণ্ঠ’র কিং অবশ্যই তার চিত্রনাট্য। আগের ছবিগুলির চেয়ে নন্দিতা রায়ের লেখা এই চিত্রনাট্য অনেক বেশি পরিণত, পোক্ত, বাস্তবের কাছাকাছি। চিত্রনাট্যই প্রতিটি চরিত্রের বিকশিত হওয়ার জমি বানিয়ে দিয়েছে। যার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন শিল্পীরা। 

আমাদের প্রত্যেকের চেনা গণ্ডিতে ল্যারিঞ্জেকটোমি রোগী খুঁজে পেতে কষ্ট করতে হবে না। তবে তাঁদের মূল স্রোতে ফেরানোর পথ বোধহয় অনেকেরই অজানা। ছবির মূল চরিত্র অর্জুন (শিবপ্রসাদ) এমন এক মানুষ, কণ্ঠ যার গর্ব। কণ্ঠ যার পেশা। কণ্ঠ যার অস্তিত্বের দোসর। এমন মানুষের ধ্বনিযন্ত্র বাদ গেলে, কী ভাবে বাঁচে সে? সাবজেক্টটাই ভীষণ যুগোপযোগী। বিষয়বস্তুর মধ্যেই নিহিত, আবেগ নিয়ে কাটাছেঁড়া করার সব উপাদান। তাই এমন বিষয় নির্বাচনের জন্য অভিবাদন প্রাপ্য নির্মাতাদের।

কণ্ঠ
পরিচালনা: শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়
অভিনয়: শিবপ্রসাদ, পাওলি, জয়া
৭/১০

শিবপ্রসাদের দাবি, অর্জুনের চরিত্রে দর্শক মনে রাখবেন তাঁকে। কথা রেখেছেন তিনি। অভিনেতা শিবপ্রসাদের স্ফুরণের সুযোগ করে দিলেন পরিচালক শিবপ্রসাদ। চোখের ভাষায়, হাতের মুদ্রায় অর্জুনের রাগ, ক্ষোভ, অসহায়তার প্রকাশ দর্শককে নাড়া দেবেই। পাওলি দামের কেরিয়ারে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হয়ে থাকবে পৃথার চরিত্রটি। প্রতিটি আবেগ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এনার্জেটিক চরিত্রে পাওয়া গেল জয়া আহসানকে। তিনিও ভাল। ছোট ছোট পরিসরে চিত্রা সেন, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, পরান বন্দ্যোপাধ্যায় মনে রাখার মতো।

ছবির মেকিংও বেশ স্মার্ট। যেমন, জয়া আহসানের চরিত্রটি ঢাকার। ফলে তাঁর উচ্চারণে ওপার বাংলার টান থাকলেও প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই। চিত্রা সেনের চরিত্রটি কমিক রিলিফ। কিন্তু ন্যারেটিভে ছন্দপতন হয়নি। প্যাথোসের মধ্যেও যে হিউমরের বাস, তা বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে দেখানো হয়েছে। 

বেশ কয়েকটি দৃশ্য দাগ কাটে। অপারেশনের পরে অর্জুনের ছেলে তার কাছ থেকে ভয়ে সরে সরে যাচ্ছে। ছেলের হাত ধরে কাটা জায়গায় স্পর্শ করায় অর্জুন। আর একটি দৃশ্যে অসহায় অর্জুনের গোঙানি আর পৃথার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর নেই। অনবদ্য শট! তবে সব ছাপিয়ে ইন্ডাস্ট্রি মনে রাখবে, কালজয়ী ভূতের রাজার কণ্ঠকে ল্যারিঞ্জেকটোমি রোগীর কণ্ঠে ব্যবহারের অভিনবত্ব। অসাধারণ অ্যাডাপ্টেশন!

ছবির সঙ্গীত ন্যারেটিভে গুরুত্বপূর্ণ। গানের লিরিক মুহূর্তের ক্রাইসিসকে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ‘সবাই চুপ’ গানটির দৃশ্যায়ন ভারী সুন্দর। শিবপ্রসাদ ও পাওলির রসায়ন ভাল লেগেছে। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় ও প্রস্মিতা পালের ‘বর্ণপরিচয়’, প্রসেনের ‘অবাক জলে’ মন ছুঁয়েছে।

তবে সব ভালর শেষে খটকাও রয়ে গিয়েছে। স্পিচ থেরাপিস্ট রোমিলার (জয়া) উপরে বাগ্‌রুদ্ধ অর্জুনের অতি নির্ভরশীলতা পৃথার মনে তৈরি করে নিরাপত্তাহীনতা। জন্ম নেয় হিংসাও। পৃথার আবেগ নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে শিক্ষিত মেয়েরা কি সব সময়ে এত স্পষ্ট ভাবে নিজেদের ইনসিকিয়োরিটি প্রকাশ করে? জয়ার কাছে পৃথার দরবার তাই একটু বেমানান ঠেকে।

এই পরিচালক জুটির ছবিতে সেন্টিমেন্টের আড়ম্বর বা অতিনাটকীয়তা নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। তবে এই ছবিতে উল্লেখযোগ্য ভাবে আবেগ উঁচু তারে বাঁধা হয়নি। শেষ দৃশ্যেও দর্শকের জন্য চমক— গাল্লি বয় শুধু বলিউডে নয়, টলিউডেও আছে!