পরিচিতি: মৃদুল (২৮) 

পেশা: বেসরকারি সংস্থার কর্মী। ৪০ বছরের পর কাজ কতটা থাকবে নিশ্চিত নন। স্ত্রী সরকারি কর্মী 

পরিবার: সদ্য বিবাহিত। স্ত্রীর সঙ্গে কলকাতায় নিজের এক কামরার ফ্ল্যাটে থাকেন। মা-বাবা থাকেন জেলা শহরে 

জিজ্ঞাসা: নতুন একটি ফ্ল্যাট বুক করেছেন। পাবেন দু’বছর পরে। ইএমআই গুনতে হবে ৩০ বছর। সেই চাপ হাল্কা করার জন্য কী করা উচিত? ফ্ল্যাটটি কি বিক্রি করে দেওয়া যেতে পারে? ভবিষ্যৎ ও সন্তানের কথা ভেবে কী ভাবে সঞ্চয় করা উচিত? 

 

বিস্তারিত আলোচনার আগে বলা দরকার, মৃদুলের আয়-ব্যয়ে সঙ্গতি নেই। মাসে পরিবারের আয় ৬৫,০০০ টাকা। আর খরচ প্রায় ৫৩,০০০ টাকা। এর বাইরেও চিকিৎসা ও অন্য খরচ রয়েছে। তা হলে আগামীর কথা ভেবে সঞ্চয় করবেন কী ভাবে? 

মৃদুলের সমস্যা নজিরবিহীন নয়। আবার সহজও নয়। বয়স অল্প। জেলা শহরে বাড়ি। কলকাতায় এসে চাকরি করছেন। স্ত্রী সরকারি চাকুরে। এক কামরার ফ্ল্যাট রয়েছে। সেই ফ্ল্যাটের জন্য আলাদা কোনও খরচ নেই। এই পর্যন্ত ঠিকই আছে। কারণ, বেসরকারি চাকরিতে অনিশ্চয়তা নতুন কিছু নয়। তার মধ্যেই উন্নতির চেষ্টা করতে হয়। যেটা করছেন উনি নিজেও। 

কিন্তু সমস্যা শুরু তার পর থেকে। ৪০ লক্ষ টাকা দামের ফ্ল্যাট বুক করে। সে জন্য ৩০ বছরের ঋণ তো নিয়েছেনই, ডাউনপেমেন্টের পাঁচ লক্ষও ধার করেছেন। 

এই অবস্থায় কিন্তু মৃদুলের আর্থিক পরিকল্পনা ঢেলে সাজার প্রয়োজন। তবে আগে নতুন ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলব। কারণ, ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এর ঋণের কিস্তিই সব চেয়ে বড় বাধা। তা মৃদুলও জানেন। 

কেরিয়ারের শুরুতে বাড়ি কেনা। সে জন্য বিপুল ঋণ। আর দীর্ঘ সময় ধরে কিস্তি— এই সমস্যায় অনেকেই পড়েন। এটা ঠিক যে, জীবনযাপনের মানকে উঁচুতে তোলার ইচ্ছে প্রত্যেকেরই থাকে। কিন্তু স্বপ্ন ও সামর্থের মধ্যে তো কখনও সখনও বড় ব্যবধান থেকে যায়! সেটা তো যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে! যেমন, মৃদুল যদি আগেভাগে ঋণ না-মেটান বা ফ্ল্যাট বিক্রি না করেন, তা হলে তাঁকে ৫৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিস্তি শোধ করতে হবে। অথচ মৃদুল নিজেও জানেন চাকরিতে অনিশ্চয়তা রয়েছে। 

আরও একটি হিসেব খতিয়ে দেখা দরকার। পুরো ৩০ বছর কিস্তি শোধ করলে মৃদুলকে চোকাতে হবে প্রায় ৮৬.৪০ লক্ষ (২৪,০০০ x ১২ x ৩০)। যা ফ্ল্যাটের দামের দ্বিগুণেরও বেশি। 

আমরা অনেকেই কেরিয়ারের শুরুতে যখন ব্যাট চালিয়ে লগ্নি ও সঞ্চয় করা দরকার, তখনই বড় আর্থিক বোঝা মাথায় তুলে নিই। এক কামরার হলেও মৃদুলের কিন্তু নিজের ফ্ল্যাট রয়েছে। তা হলে কী ভেবে এত বড় খরচের প্রকল্পে তিনি হাত দিলেন? বাধ্যবাধকতা ছিল কি? যদিও বা কিনলেন, তা হলে আগে ডাউনপেমেন্টের টাকা জমিয়ে এগোলেন না কেন? তা হলেও তো কিস্তি কিছুটা কমতে পারত। 

যা-ই হোক, এই সমস্যার সমাধানের রাস্তা মৃদুলই মাথা খাটিয়ে বার করেছেন। জানতে চেয়েছেন, বুক করা ফ্ল্যাট বিক্রি করে কি অপেক্ষাকৃত কম দামের ফ্ল্যাট কেনা উচিত? আমিও মনে করি সেটা একটা রাস্তা হতে পারে। যদিও ফ্ল্যাট বিক্রি করা এবং ইতিমধ্যেই লগ্নি করে ফেলা টাকা তোলা খুব সহজ নয়। তবে চেষ্টা করা যেতেই পারে। 

দ্বিতীয় একটি রাস্তাও আছে। প্রতি পাঁচ বছরে কিছু কিছু করে টাকা জমিয়ে প্রিপেমেন্টের মাধ্যমে ঋণের আসল কমানো। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগে ঋণ শোধ করে দিতে পারবেন। 

কী ভাবে তা করবেন? ধরা যাক প্রত্যেক মাসে ৫,০০০ টাকা করে বিভিন্ন ধরনের এসআইপিতে লগ্নি করলেন। বছরে গড়ে ১০% রিটার্ন মিললে পাঁচ বছরে হাতে আসবে ৩.৯০ লক্ষ টাকা। খারাপ অঙ্ক তো নয়! 

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি জমি বা বাড়ি কেনার সময়ে তার দামের ২৫-৩০% টাকা ডাউনপেমেন্টের জন্য হাতে থাকা উচিত। আর ইএমআই কখনওই নিট বেতনের ৪০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। এই ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে ভবিষ্যতে নতুন ফ্ল্যাট কিনতে পারলে এই বিষয়গুলি মাথায় রাখতে বলব মৃদুলকে। 

এ বার আসছি সঞ্চয়ের কথায়। মৃদুলের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান খুবই কম। তাই ঢেলে লগ্নি করার সুযোগও কম। কিন্তু কষ্ট করে হলেও কয়েকটি পদক্ষেপ মৃদুলকে করতে হবে। 

• মৃদুল জীবন বিমার সম্পর্কে বিস্তারিত বলেননি। কিন্তু ১৫ লক্ষ টাকার পলিসির জন্য যখন মাসে ৮,০০০ টাকা দিতে হচ্ছে তখন ধরে নেওয়া যেতে পারে সেটি এডাওমেন্ট। যে আর্থিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাতে মৃদুলের এখনই ৫০ লক্ষ টাকার টার্ম পলিসি শুরু করা উচিত। যে পলিসিটা চলছে সেটাকে বরং পেড-আপ করে দিতে পারেন। এর ফলে মাসে যে খরচ আপনার বাঁচবে তা দিয়ে এসআইপি চালু করতে পারেন। যা ফ্ল্যাটের প্রিপেমেন্টের কাজে লাগতে পারে। 

• ৩ লক্ষের স্বাস্থ্য বিমা মোটেও যথেষ্ট নয়। এখন না পারলেও ধীরে ধীরে এই কভারেজ ১০ লক্ষে নিয়ে যেতে হবে। 

• সন্তানের পড়াশোনা, অবসরের মতো পরিকল্পনা এখন থেকেই করা উচিত মৃদুলের। কিন্তু তার জন্য লগ্নি শুরু করার মতো টাকা এখন হাতে নেই। লগ্নির মেওয়া সবুরে ফলে। কিন্তু লগ্নি করতে দেরি করলে বেশি টাকা জমানো কিন্তু কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, এখন যদি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েশনের খরচ ১২ লক্ষ টাকা হয়, তা হলে ১৮ বছর পরে সেই অঙ্ক হবে প্রায় ৩৪ লক্ষ (৬% মূল্যবৃদ্ধি ধরে)। হিসেব করে দেখুন, ১৮ বছরে ৩৪ লক্ষে পৌঁছতে গেলে এখন থেকেই মাসে ৫,৬০০ টাকা ইকুইটি ফান্ডে (১০% রিটার্ন ধরে) লগ্নি করা উচিত। কিন্তু পাঁচ বছর পরে লগ্নি শুরু করলে ওই অঙ্কে পৌঁছতে ঢালতে হবে ১০,৬০০ টাকা। 

• অবসর জীবনের জন্য ইকুইটি ফান্ডের পাশাপাশি কিছু টাকা পিপিএফেও রাখতে শুরু করা উচিত। কন্যা সন্তান হলে চালু করতে হবে সুকন্যা সমৃদ্ধি অ্যাকাউন্ট। মৃদুল এখনই এত লগ্নি করতে পারবেন না। তবে বলব সাধ্য মতো শুরু করতে।

 

(অনুরোধ মেনে নাম পরিবর্তিত)

লেখক বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ

(মতামত ব্যক্তিগত)