২৬ মার্চ, ২০১৬
সময়: সকাল ৯-১০
শুভান বিচ হাউস
কালচা জিভানা
শ্রীবর্ধন-৪০২১১০

জেলা: রায়গড়, মহারাষ্ট্র


আরব সাগরের লোনা ঢেউ ও লোনা বাতাসের প্রতিশ্রুতিখেলা চলে সমগ্র দিনমান জুড়ে। শ্রীবর্ধন সাগরপাড়ের এক নিজস্ব অহংপ্রস্তাব আছে। প্রসারিত দৃষ্টির সামনে অবিরাম ঢেউ ছলকানো সফেদ বালিয়াড়িতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি কিছু সময়। লোনা হাওয়ার কানাকানিতে একটু উষ্ণতার পরশ লাগে প্রাণে। সফর-ফেরতাই বৃত্তান্তে আমি নির্বাক পর্যটক শুধু।

কোঙ্কণ উপকূলের কোল ঘেঁষে শ্রীবর্ধন সৈকত—যেন প্রকৃতির হাতে গড়া মায়াসৈকত। এক ধারে নারকেল, সুপুরি, আমগাছের ভিড় নিয়ে ঐতিহাসিক তালুক। অন্য দিকে বহু দূর পর্যন্ত চলে গেছে সূর্যস্নাত সফেদ বালুতট ও সাগরের চমকপ্রদ নিসর্গ পাণ্ডুলিপি। হরিহরেশ্বর থেকে মাত্র ১৮ কিমি দূরত্বে শ্রীবর্ধন। হরিহরেশ্বর ও শ্রীবর্ধনকে ‘টুইন সিটি’ও বলা হয়ে থাকে। আসলে মহারাষ্ট্রের হরিহরেশ্বর শ্রীবর্ধন দিবেগড় কোনডিভালি সৈকত রায়গড় জেলাকে যেন এক অপরূপ সৈকতমালার বিশিষ্টতা দিয়েছে। এদের মধ্যে কোনডিভালি আদপে একটি মৎস্যবন্দর। ছোটখাটো ছুটিতে এই সৈকতগুলির আওতায় কাটিয়ে দেওয়া যায় আলোছায়া মাখা অবসর। মায়াবী ভিজে থাকা সৈকতপথ— যেখানে ভ্রমণের নির্যাসও ধরা থাকে।

সাতসকালেই আজ হরিহরেশ্বরকে আপাতবিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়েছি কাছেপঠে অন্যান্য কয়েকটি সৈকতকে বুড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে কোঙ্কণ উপকূলের ক্যানভাসে তুলির রং মাখানোর অভিলাষে। দূরত্ব তেমন কিছু নয়, মাত্র ২০.৬ কিলোমিটার। হরিহরেশ্বর পেরিয়ে কাঁকিজে নামের এক ছোট্ট জনপদ। এর পর রাজ্য সড়ক-১০০ ধরে যশলভি নিগডি হরিহরেশ্বর মন্দির রোড প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এ বার মায়েগাঁওয়ের কাছে রাজ্য সড়ক-৯৯-এর পথে ৩ কিলোমিটার পেরোতেই শ্রীবর্ধন তালুক। নারকেল-সুপুরির খ্যাতির জন্য ‘শ্রীবর্ধন রোঠা’ বলা হয় এই সবুজে ছাওয়া প্রাচীন জনপদকে।

     সময় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে অবিরত। সমুদ্রশরীরের একান্ত স্পর্শটুকু নিয়ে কেবল প্রশ্রয় দিয়ে যাওয়া চলমান ঢেউ-ভাঙার গল্পকথা। সৈকতে ঢোকার মুখেই সাইনবোর্ড ‘‘শ্রীবর্ধন নগরপালিকা পর্যটকাচে স্বাগত করত আহে।’’ সমগ্র সৈকত এলাকাটিই যে সিসিটিভির নেকনজরে আছে, তাও জানাচ্ছে নগরপালিকা। বিচ রোডের শেষে বাঁ পাশে শ্রীশ্রী নানাসাহেব ধর্মাধিকারীর স্মারক বেদি। বোল্ডারের সীমানা বরাবর সিমেন্টের বাঁধানো বসার জায়গা। পেছনেই সারি দিয়ে রয়েছে ক্যাসুরিনা গাছের সযত্ন প্রলেপ। হালকা ঢেউ খেলানো সফেদ বালুতট পেরিয়েই সমুদ্রের কোলাহল। আরও একটু কাছে যেতেই চটুল ঢেউ এসে পা জড়িয়ে নেয়। সকালবেলায়ই সৈকতে ঢেউখেলায় মত্ত তামাম পর্যটক। যেমন ইদানীং প্রায় প্রতিটি সৈকতেই থাকে, তেমনই নানা রাইডের ব্যবস্থা। এ দিকে ঢেউয়ের হাতছানি উপেক্ষা করা দায়। দৃশ্যত আমিও এক-পা এক-পা করে সেঁধিয়ে যাচ্ছি ঝেউয়ের খুনসুটিপনার মাঝে।

ইতিহাসলিপিতে লেখা আছে ‘শ্রীবর্ধন’ স্থানের নাম প্রখরভাবেই। ১৬টি দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত ছিল অতীতের বাণিজ্যশহর হিসাবে খ্যাত শ্রীবর্ধন। পৌরাণিক পৃষ্ঠা জানায়, মহাভারতের তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন তীর্থযাত্রাকালে এ স্থানে এসেছিলেন। ১৬০০ ও ১৭০০ শতকে প্রথমে আহমেদনগরের অধীনে ও পরে বীজাপুরের অধীনে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী বন্দর ছিল শ্রীবর্ধন। সেই কত কাল আগে ইওরোপীয় ভ্রামণিক জিফরদনের রচনায় এই স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার ১৫৩৮ সালে ডম জোয়া দে ক্যাস্ট্রো শ্রীবর্ধন বন্দরের বর্ণনায় লিখেছেন, ‘‘এটি ছিল অল্প জলের জেটি। তা হলেও জোয়ারের সময়ে প্রশস্ত এলাকাটিই হয়ে যেত বৃহৎ একটি উপদ্বীপ।’’

এক সময় পেশোয়াদের রাজ্যপাট ছিল শ্রীবর্ধন। পেশোয়াদের আদি পদবি ছিল ভট। শ্রীবর্ধন অঞ্চলের পুরোধা ছিলেন ‘দেশমুখ’ উপাধিপ্রাপ্ত ভটবংশীয়রাই। ১৭১৩-১৭২০ প্রথম পেশোয়া বালাজী বিশ্বনাথ ভট ছিলেন সমাজের প্রথম দেশমুখ। তিনি নিজের স্বকীয়তা ও কঠোর পরিশ্রমে পুণের সুবেদার নির্বাচিত হন। শিবাজি-পৌত্র শাহুজি তাঁকে প্রথম মরাঠা পেশোয়া রূপে মনোনীত করেন। পুণে ছিল তৎকালীন ‘হিন্দুভি স্বরাজ’ পেশোয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেখানে প্রথম পেশোয়া হন বালাজি বিশ্বনাথ এবং তার পর টানা ১০০ বছর এ পেশোয়া রাজ ১৮১৮ পর্যন্ত মরাঠা মুলুকে কায়েম ছিল। ১৭১১ সালে বালাজি বিশ্বনাথ ‘সেনাকার্তে’ সম্মানে ভূষিত হন। ১৭২০ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথের জীবনাবসান হয়। পরবর্তী কালে তৃতীয় পেশোয়া হন বালাজি বাজিরাও। ১৭৫০ সালে শ্রীবর্ধন শহরে তিনি এক বৃহৎ অট্টালিকা নির্মাণ করেন। বহু পরে ১৯৮৮ সালে নির্মিত বালাজি বিশ্বনাথের একটি  স্মারক মূর্তিও আছে এখানে। স্বীয় অতীত গৌরবে আজও আবদ্ধ শ্রীবর্ধন। ইতিহাস না জানলে বিগত কালের কত গৌরবগাথা জানা বাকি রয়ে যায়!

শ্রীবর্ধন তালুকে কিছু প্রাচীন মন্দিরও আছে। এখানকার শ্রীলক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দিরটি ছিল পেশোয়াদের মূল উপাসনাস্থল। এখানকার মূর্তিটি প্রাচীন ‘হয়সালা’ স্থাপত্যে নির্মিত। রয়েছে কুসুমদেবী মন্দির, সোমজাই মন্দির, জীবনেশ্বর মন্দির ও ভৈরবনাথ মন্দির। অবসরের ঠেক রয়েছে প্রচুর। প্রতিটি হোটেল ও রিসর্টে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভালই। কোনও কোনও রিসর্টে প্যাকেজ প্রথাও চালু। হোটেল সি উইন্ড, তেন্ডুলকর বিচ রিসর্ট, কোকো হাট বিচ রিসর্ট, রেনবো কটেজ, দ্য লিটল প্যারাডাইস ছাড়াও রিলাস হোম স্টে, হোটেল পিনকিন, শুভান বিচ হাউস ইত্যাদি আরও কিছু বিভিন্ন মান ও দামের থাকার আস্তানা। শ্রীবর্ধন সৈকতে বেড়াতে আসার সেরা সময় জানুয়ারি থেকে মার্চ। তার পর প্রখর গ্রীষ্ম ও বর্ষার মরসুম পেরিয়ে আবার সেই অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর।

এই মুহূর্তে শ্রীবর্ধনের কালচা জিভানা অঞ্চলে শুভান বিচ হাউসের সুসজ্জিত খাওয়ার ঘরে প্রাতরাশ ফরমায়েশ করে অপেক্ষা করছি। সেই অপেক্ষার মুহূর্তে অন্য একটি ফাঁকা টেবিলে বসে ডায়েরির পাতায় বসে লিখে নিচ্ছি আজ সকালের কথাটুকু। আজ রাতেই মুম্বই ফিরে যাব। বাড়ি ফিরেই হয়তো দিন কয়েক লেখালিখির মকশো করা হবে না। এতগুলো সৈকত একের পর এক ঘুরে বেড়াচ্ছি, আপাতদৃষ্টিতে সব সমুদ্রসৈকতই প্রায় একই রকম মনে হলেও, কোঙ্কণ উপকূলের প্রতিটি  এই প্রতিটি তটেরই কিছু নিজস্বতা আছে। সেই সবই লিখে রাখা আর কী। এই বিচ হাউসে আমরা থাকব না। স্রেফ প্রাতরাশ শেষ করেই চলে যাব অন্য আর এক সৈকত। এখানে এই বিচ হাউসে থাকার জন্য চমৎকার কয়েকটি ‘ট্রি হাউস’ বা ‘গাছবাড়ি’ রয়েছে। যদিও এ বার তো থাকছি না। না থাকার অভাববোধ নিয়েই—হলফ করে বলতে পারি—এই গাছবাড়ির মাচানে দিনরাত কাটাতে পারলে রোজনামচা-মার্কা মনের আয়নায় সাময়িক পালাবদল হতে বাধ্য।  

 

২৬ মার্চ, ২০১৬

সময়: সকাল ১১-০০

শুভান বিচ হাউস

কালচা জিভানা

শ্রীবর্ধন-৪০২১১০

জেলা: রায়গড়, মহারাষ্ট্র

 

এই সৈকতেও সেই তরতাজা লোনা হাওয়াটা বয়ে চলেছে একই লয়ে। এ ভাবেই কত না সমুদ্রসৈকতকে ধাওয়া করতে করতে একেক জায়গায় থিতু হয়ে পরস্পরকে চিনে চিনে নিই। সমুদ্র আর আমি। এমনই টুকিটাকি কত যে সঞ্চয়। এমনতর সৈকতে বেড়াতে এলেই সব কথা ফেলে রেখে শুধু তার সঙ্গেই অনন্ত কথোপকথন। দিবেগড় সৈকতটির এমনই এক অবশ্যম্ভাবী মায়া মাখামাখি।

দিবে এবং আগর থেকে এসেছে দিবেগড় নামখানা। শান্ত সমাহিত গাছগাছালি ঘেরা এক নিশুতি গ্রাম। এখানে মাছের ব্যবসাজাত বন্দর, সৈকত ও মন্দির নিয়ে পুরো অঞ্চলের বিস্তার। আছে কিছু হোটেল রিসর্ট হোমস্টে। স্থানীয়দের রুজিরুটি বলতে চাষ-আবাদ, নারকেল-সুপুরির ফলন ও হোটেল ব্যবসা। সৈকতের ভেতরে রমরম করে চলে প্রচুর ফাস্ট ফুডের স্টল। জলকেলির হরেক রকম রাইড তো আছেই। উত্তর থেকে দক্ষিণে যথাক্রমে ভেলাস, মুসলমণ্ডি, আগর পঞ্চৈতন, দিভেগড় আর বোরলাই পঞ্চৈতন—এই ৬টি এলাকা নিয়ে প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন জনপদ দিবেগড়। ইতিহাস জানায়, কখনও পাঠান, কখনও মুঘল কি পর্তুগিজদের হাতে বারবার নস্যাৎ হয়েছিল এই জনপদটি।

দিবেগড় সৈকতটি টানা চার কিলোমিটার লম্বা। উত্তরের শেষ প্রান্তে একটি জলধারা এসে সাগরে মিশেছে। সেই স্থানটির নাম ভেলাস সাগর। এটি একটি মাছের ভেড়ি। ও দিকে দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে একটি ছোট স্যাংচুয়ারি, যেখানে দিনভর পরিযায়ী পাখিদের মৌরসিপাট্টা। কাছেই আরও একটি ধীবরগ্রাম রয়েছে ভারাদখোল। এখানে বিক্রেতারা আসেন তাজা জলজ্যান্ত সামুদ্রিক মাছ বিক্রিবাট্টা করতে। সৈকতের ধার বরাবর শুরু গাছের জঙ্গল।  তবে দিবেগড় মূল সৈকতটি খুবই অপরিষ্কার ও যত্নের অভাব সুস্পষ্ট। সাগরের একদম গোড়ায় পর্যটকদের জন্য সার দিয়ে ফাস্ট ফুডের অস্থায়ী স্টল। জোয়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাগরের ঢেউ যতই বালুতটে এগিয়ে আসতে থাকে, স্টল মালিকরাও ততই স্টলগুলি ও স্টলের পাশে পেতে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিল, টুল, গ্যাস সিলিন্ডার, বাসন ধোওয়ার জলের ড্রাম, প্লাস্টিকের ময়লা ফেলার বাক্স—সব কিছু নিয়ে ক্রমশ পিছোতে থাকে। কী না বিক্রি হচ্ছে সেখানে! পাওভাজি, কান্দাভাজি, মিশেলপাও, বড়াপাও, পোহা, নুডলস, চা, কফি, ফ্রুট জুস,  পানিপুরি, ভেল, ইডলি, ধোসা, মেদুবড়া, সস্তার আইসক্রিম, আখের রস, কাটা ফল, মকইদানা ইত্যাদি। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। সৈকত জুড়ে নোংরা জঞ্জাল, ডাবের খোলা, চিপসের প্যাকেট। প্রশাসন নীরব।

ইতিমধ্যে এক কাণ্ড হল। সৈকতে রয়েছে বহু অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটি। তার কোনও একটিতে বিনা প্রশিক্ষণে সওয়ার হওয়া উচিত হবে কি না ভেবে দোনামনা করছি। হঠাৎই হইচই। সৈকতে ভেন্ডারদের এলাকা দখলের লড়াই শুরু হয়ে গেল। অচিরেই ভেন্ডার ও স্থানীয় মানুষেরা দু’পক্ষ নিয়ে নিল। কোথা থেকে জুটে গেল আরও কিছু স্থানীয় ছেলে-ছোকরা। প্রায় সবারই নানা ছাঁটে উগ্র রং করা চুলের বাহার। ধ্বস্তাধ্বস্তি থেকে শুরু করে ক্রিকেট ব্যাট, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে একে অন্যকে বেধড়ক পেটানো! ওখানে থাকাটা তখন একেবারেই নিরাপদ নয়। মারপিট দেখে পা কাঁপছে ভয়ে। দ্রুত পালিয়ে এলাম গাড়িতে।

দিবেগড় বিখ্যাত এখানকার সুবর্ণ গণেশ মন্দিরটির জন্য। গত ১৯৯৮ সালের ১৭ নভেম্বর, চতুর্থীর দিনে এক নারকেল বাগানেন কাজ করতে করতে শ্রীমতী ডি ডি পাতিল নামের স্থানীয় এক মরাঠি মহিলা মাটির নীচ থেকে একটি তামার বাক্স আবিষ্কার করেন। বাক্সটি ২৭ ইঞ্চি লম্বা এবং ১৮ ইঞ্চি চওড়া, উচ্চতা ৭ ইঞ্চি। সংস্কৃতে লেখা সেটি ১০৬০ শতকের। বাক্সের ভিতরে ১ কিলো ৩০০ গ্রাম ওজনের ২৪ ক্যারাট সোনায় গড়া ও ২৪ ইঞ্চি লম্বা সোনার গণেশমূর্তি! এটি ‘সুবর্ণগণেশ মূর্তি’ নামে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে এখানেও একটি বেদনার জায়গা তৈরি হয়। ২০১২ সালে ডাকাতরা এটি চুরি করে নেয়। শুধু তা-ই নয়, মন্দিরের দু’জন নিরাপত্তারক্ষীকে হত্যাও করে। আজও সেই মূর্তির খোঁজ অধরাই থেকে গেছে। এখন অবশ্য এই সুবর্ণ গণেশ মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন রুপোয় গড়া একটি গণেশমূর্তি। দিবাগড় গ্রামের ভিতরে একটি সুন্দর মন্দিরের বাইরের স্থাপত্য দেখেই গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম। এটি দশম শতকে রাজা শীলাহার নির্মিত সুন্দরনারায়ণ মন্দির। স্থানীয়রা এটিকে রূপনারায়ণ মন্দিরও বলেন। ইটরঙা মন্দির। মন্দিরে শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী চতুর্ভুজ বিষ্ণুনারায়ণ মূর্তি। ঘড়ির কাঁটা যে দিকে চলে, সেই দক্ষিণাবর্ত থেকে দেখলে বিষ্ণুনারায়ণের ২৪ রকম ভিন্ন অবতাররূপ দেখা যায়। দিবেগড় ছেড়ে আরও ১৪ কিলোমিটার দূরে এসে ফেরি সার্ভিস। আগরদণ্ডা থেকে রোহিণী। গাড়িসুদ্ধ বার্জ-এ উঠে পড়লাম। প্রচুর যাত্রী ও গাড়ি-সহ সেই জলযান বিকট একটা ভোঁ বাজিয়ে ছেড়ে দিল। কোঙ্কণ সাগরতট ধরে যাত্রায় এই নিয়ে মোট পাঁচ বার জলযানে চড়া হল। রোহিণী থেকে মুরুদ আর পাঁচ কিলোমিটার। ছুঁয়ে যাচ্ছি নদী সাগর খাঁড়ি। কখনও গা এলিয়ে রাখছি অনাবিল নির্জনতায়। ভাল লাগা নানা মুহূর্ত যেন পাকদণ্ডী পথের মতোই জড়িয়ে যাচ্ছে মনে।

 

২৬ মার্চ, ২০১৬

সময়: বিকেল ৫-৪০

আলিবাগ-৪০২২০১

মহারাষ্ট্র

 

সুন্দর এক ভ্রমণগল্প হতে পারে ইতিহাসের পাতায় মোড়া মুরুদ-জঞ্জিরা। আরব সাগরের তটরেখায় মুরুদ নামে এক নিরিবিলি গঞ্জ শহর। ভেতরপানে জেলেদের গাঁ। প্রশান্ত নীল সাগরকুলে ছবির মতো গঞ্জ শহরখানা। সেখান থেকেই দৃষ্টির আঙিনায় সাগরমাঝে ডিম্বাকৃতি এক প্রাচীন দুর্গ। ১৪৯০ সালে নির্মিত এই দুর্গকে স্থানীয়রা বলেন ‘অজিনক্যা’। যার বাংলা তর্জমা হল ‘অজেয়’। এটিই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ‘জঞ্জিরা দুর্গ’। আরবি শব্দ ‘জঞ্জিরা’ মানে হল দ্বীপ।

সাগরের জলের মাঝে পাথুরে একখণ্ড জমির দ্বীপ নিয়েই গড়ে উঠেছিল জঞ্জিরা ফোর্ট। সে যুগে নৌ-সেনাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল এই দুর্গ। মুরুদের রাজাপুরী ফেরিঘাট থেকে নৌকোয় পৌঁছতে হয় দুর্গে। ক্ষয়িষ্ণু প্রাসাদ, অট্টালিকা, ঝরোকা, পুষ্করিণী ও রাজসিক এক খানদানি চিহ্ন নিয়ে উদোম হয়ে পড়ে আছে জঞ্জিরা। নৌকোয় যেতে যেতেই নৌকো পারাপারের বৃদ্ধ মুসলমান গাইড পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে যাচ্ছেন অতীতকথা। এই সময়টায় সাগরের জলে জোয়ার খেলছে। নৌকোও যাত্রী সমেত মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বটুকু পার করল মোচার খোলের মতো চূড়ান্ত দুলে দুলে।

সড়কপথে যেতে যেতেই চোখে পড়ল জঞ্জিরা দুর্গের নবাবদের স্মৃতিধন্য অনন্য এক রাজপ্রাসাদ। ভারত সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছে রাজপ্রাসাদটি। খানিক দূরেই রয়েছে দত্তা মন্দির ও কোটেশ্বভরী মন্দির নামে জাগ্রত দুই মন্দির। স্কুল কলেজ শপিং মল ডাকঘর ব্যাঙ্ক অফিস পুলিশ চৌকি—এ সব নিয়ে জমজমাট শহর মুরুদ! ও দিকে সাগরে খাঁড়ি লাগোয়া মাছের ভেড়ি। জেলে জাল নৌকা ফিশিং ট্রলার নিয়ে অতি ব্যস্ত। তারই মাঝে জলজ ভিড় ও ইতিহাসকথা নিয়ে কেটে যায় মুরুদ-জঞ্জিরার ঝাঁকিদর্শন! আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে সাগরতীরে আরও এক জনপ্রিয় সৈকত কাশিদ। অর্কদেব মধ্যগগনে তখন। বিস্তৃত সোনালি বালুতট রোদে পুড়ে খাঁ-খাঁ করছে। তেতে যাওয়া বালিতে পা ফেলে সমুদ্রের কাছে যেতে আর ইচ্ছে করল না। রাস্তার ধারে প্রচুর খাবারের স্টল। তেমনই এক ছাউনিঘেরা দোকানের দড়ির দোলনায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে রইলাম। দুটি নারকেল গাছের কাণ্ডর সঙ্গে দোলনার দুটি খুঁটি টানটান করে বাঁধা। দুলকি চালে দুলছি। হাতে চিপসের প্যাকেট। ভাবছি এমন কিছু সময়ের জন্যই তো মুখিয়ে থাকা যেখানে ভ্রমণপিপাসু মনে ভাল লাগা জন্ম নেয় একটু একটু করে।

আলিবাগের সি ভিউ হোটেলে যখন পৌঁছলাম, তখন দুপুর প্রায় তিনটে। এখানেও সেই দিবাভোজনের ফরমায়েশ করে ডায়েরি খুলেছি। মরাঠি শব্দ ‘আলিচি বাগ’ মানে ‘আলি সাহেবের বাগান’। এক সময়ে যা এখানেই ছিল। সেই থেকেই আলিবাগ। এলাকাটি ‘শ্রীবাগ’ নামেও স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। অন্যতম আকর্ষণ, সাগরের মাঝে শিবাজি নির্মিত কোলাবা দুর্গ। পর্তুগিজ, ব্রিটিশ নৌসেনাদের উপর নজরদারি ও জলদস্যুর আক্রমণ প্রতিহত করতে এই দুর্গটি নির্মিত হয়, কেননা এর  তিন দিকই সাগর ঘেরা। আলিবাগকে পর্যটকরা এ জন্যই ভালবেসে ডাকেন ‘মহারাষ্ট্রের গোয়া’ বলে!

হবে না-ই বা কেন! সমুদ্রের স্পর্শভরা অনুভূতিগুলো কড়া নাড়ে মনের দরজায় —‘জলকে চল... ওলো সখি, জলকে চল...।’